বোরো মৌসুম চলছে। দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। বোরোর উৎপাদন অতিমাত্রায় সেচনির্ভর। আর শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি সেচ পাম্প ডিজেলচালিত। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু সেচই নয়, কৃষির যন্ত্রপাতি যেমন ট্রাক্টর, ধান কাটার মেশিন প্রভৃতি ডিজেলচালিত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষির উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বাড়তি খরচ করে উৎপাদনের পর ন্যায্য দামে বিক্রি করা যাবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। আবার ফসলের দাম বাড়লে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে কৃষকদের উদ্বেগ দূরীকরণ ও ফসলের দাম বৃদ্ধি রোধে কৃষিতে ব্যবহূত ডিজেলে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলছে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ। আর কিছুদিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের জমিতে সেচ দেয়া শুরু হবে। এ সেচ দেয়ার যন্ত্রের (পাওয়ার টিলার) প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে। দেশের বেশির ভাগ কৃষক শুষ্ক মৌসুমে ফসল ফলাতে পুরোপুরি সেচের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে দেশে সব কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে। বাড়তি খরচ দিয়ে ফসল উৎপাদনের পর কৃষক পণ্যের দাম না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। খরচ বৃদ্ধি ও দাম না পাওয়ার শঙ্কায় কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন, এতে আমাদের উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। এমনিতেই সেচ মৌসুমের শুরুতে কৃষি যন্ত্রপাতি ওভারহোলিং করতে বড় অংকের টাকা খরচ হয়। সেখানে সেচ খরচ বেড়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। দেশে ধান ছাড়াও কৃষির অন্য খাতেও সেচযন্ত্রের বহুল ব্যবহার হয়। যেমন শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার হয়। এসব যন্ত্র ডিজেলনির্ভর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, শুধু ধান রোপণ বা চাষাবাদে নয়, মাড়াই, পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার হয়। ধান ছাড়াও নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে শীতকালীন সবজি, গম, সরিষা, ভুট্টাসহ প্রধান ফসলগুলো উৎপাদন হয়। বৃষ্টিহীন এ মৌসুমে সেচ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ওপরে ডিজেলের এ মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভারতে কৃষকরা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকরা সংগঠিত নন, তাদের পক্ষে কথা বলারও কেউ নেই। অসহায় কৃষক হয় মুখ বুজে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন, অন্যথায় সেচের ব্যবহার কমিয়ে দেবেন। সেক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আর সেচে ডিজেল কম ব্যবহার করলে জমিতে শস্য উৎপাদনও কমে যাবে। এই দ্বিমুখী বিপদ থেকে কৃষককে রক্ষার একটা উপায় হলো ডিজেলে ভর্তুকি দেয়া। অন্যথায় কৃষিতে বাংলাদেশ যে ধারাবাহিক উন্নতি করে এসেছে, তা হোঁচট খাবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, এই করোনাকালেও যেসব খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে, তার মধ্যে কৃষিই প্রধান। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও ১৭ কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করেছে এই কৃষিই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সরকার কৃষি সেচের জ্বালানিতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এবারো তার ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে না। দেশটিতে ডিজেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি থাকলেও সেচসহ কৃষির জ্বালানিতে ভর্তুকি থাকায় ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে না। বাংলাদেশও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কৃষিতে ব্যবহূত ডিজেলে ভর্তুকি দিতে পারে।
একসময় কৃষকের সেচ সুবিধার জন্য সরকার ডিজেলে ভর্তুকি দিত। পরে নানা অনিয়মের অভিযোগ আসায় সেই ভর্তুকি তুলে নেয়া হয়; যদিও তারা ভর্তুকি দামে সার পাচ্ছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়তির দিকে। এ অবস্থায় প্রথমত সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে সারের দাম যাতে না বাড়ে। দ্বিতীয়ত, সারের মতো কৃষিকাজে ব্যবহূত ডিজেলেও ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিদ্যুতে চালিত সেচ পাম্পের বিলে ২০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে বঞ্চিত হচ্ছেন ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের কৃষকরা। সর্বশেষ ২০০৯ সালে ডিজেল ব্যবহারে কৃষকদের ৭৪৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। ৮৩ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে জনপ্রতি ৮০০ টাকা এবং ৭ লাখ ৮৯ হাজার মাঝারি পর্যায়ের কৃষককে জনপ্রতি ১ হাজার টাকা হারে ভর্তুকি দেয়া হয়। এর আগে ২০০৭ সালে ৬৭ লাখ ক্ষুদ্র চাষীকে নগদে ডিজেলের ভর্তুকির টাকা দেয়া হয়েছিল। বোরো ধান চাষে পুরোটাই সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে যাতে কৃষি, বিশেষ করে বোরোর উৎপাদন কমে না যায়, সে বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে। অন্তত লিটারপ্রতি ডিজেলের যে দাম বাড়ানো হয়েছে, কৃষককে সেই পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হোক।
ডিজেলে ভর্তুকি অপচয়ের অভিযোগ এখন আর তেমন শক্তিশালী যুক্তি নয়। কারণ কৃষকদের এখন ১০ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। কৃষকদের অল্প বিস্তর ডাটাবেজও রয়েছে। সরকার চাইলে কৃষকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ডিজেলের জন্য নগদ অর্থ পাঠাতে পারে। পণ্যে সরাসরি ভর্তুকি না দিয়ে কৃষকদের নগদ অর্থ প্রদান অধিক কার্যকর বলে প্রমাণিত। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে সরকার একাধিকবার সারের দাম কমিয়েছে। এখন দেশে সারের সংকট নেই। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখাতে হলে দেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের সেচকাজে প্রণোদনা দিতে হবে। সেচের ব্যয়, সার-বীজের দাম কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে কৃষিপণ্যের দাম রাখতে হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় কৃষিতে ব্যবহূত ডিজেলে ভর্তুকি দেয়ার একটি প্রক্রিয়া সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে দ্রুত। নইলে কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।










