লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করতে শিল্প-কারখানাগুলোয় সাপ্তাহিক ছুটির দিন সমন্বয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। একে বলা হচ্ছে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হলিডে’। বর্তমানে সব কারখানা নির্দিষ্ট দিনে বন্ধ থাকে। নতুন নিয়মে সব শিল্প-কারখানা একই দিনে বন্ধ থাকবে না, সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে সাপ্তাহিক ছুটি বা বন্ধ থাকবে, অনেকটা ঢাকা শহরের বিপণিবিতানগুলো বন্ধ থাকার মতো। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে সাময়িক সমাধান হিসেবে ব্যবসায়ীরা এটি মেনেও নিয়েছেন। তবে শিল্প-কারখানা খোলার দিনগুলোয় যেন নিরবচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে, জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে যাতে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে না যায়। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়া না গেলে শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বিদ্যুিবভ্রাট বা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বলেছিলেন, তাদের একটি কারখানায় একবার বিদ্যুিবভ্রাট ঘটলে ৫২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এ হিসাবে তাদের পাঁচটি কারখানায় ন্যূনতম একবার বিদ্যুিবভ্রাট হলেও তারা কমপক্ষে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এছাড়া কম্পিউটারাইজড মেশিনগুলো চালু অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুিবভ্রাটের কারণে বন্ধ হলে সফটওয়্যার সিস্টেমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। এ অবস্থায় শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। সরকারের বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ দিতে না পারায় শিল্প মালিকরা কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ঝুঁকছে। যদিও গ্রিড বিদ্যুতের চেয়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুতে খরচ বেশি। এখনো শিল্প-কারখানায় গ্রিড বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া যায় না। তার ওপর প্রায় সময়ই ভোল্টেজ ওঠানামা করে। তাতে উৎপাদন ব্যাহত ও পণ্যের ক্ষতি হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ লোকসানও গুনতে হয়। তাছাড়া ভোল্টেজ ওঠানামায় কারখানার যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় এবং জীবত্কাল কমে যায়। ফলে এককালীন ক্ষতিও কম নয়। শিল্প-কারখানার উৎপাদনে এ বাধা ও ক্ষতির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। যার প্রভাব খুচরা ভোক্তা পর্যায়েও পড়ে। আর রফতানিমুখী শিল্পে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পণ্য। শিল্প মালিকরা সঠিক লোড ও ভোল্টেজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন দেনদরবার করে চলেছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে বড় শিল্প-কারখানাগুলো ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই চলছে। ১-৫ মেগাওয়াটের ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র শিল্প উৎপাদনে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করলেও বহুমাত্রিক খরচ বাড়িয়েছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ছে। তাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সক্ষমতা কমছে। বিদ্যুতের সার্বিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় প্রতি বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় এ সেবাপণ্যের দাম বাড়ছে। তাতে জনগণেরও খরচ বাড়ছে। আর সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি বাবদ বেরিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় দেশের রফতানিমুখী পণ্যগুলোর সক্ষমতা কমছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিল্প খাতকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। শিল্প খাত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়াই সরকারের লক্ষ্য। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সরকার জ্বালানি তেলসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা ধরনের পরিকল্পনা করেছে। কারণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অন্যতম বড় উৎস তৈরি পোশাক খাত। আর সরকারের নীতিনির্ধারণের ওপরই ওই শিল্পের জ্বালানি পরিকল্পনা নির্ভর করছে। বিদ্যুতে নিজস্ব উৎপাদনের জন্য উদ্যোক্তাদের সরকারের গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করতে হয়। আর জ্বালানি তেলে চালাতে গেলে লাভ-লোকসানের বিষয় চলে আসে। আবার এলএনজি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। সেটি আমদানি করতে হয়। আর তার জন্য ব্যবহার হয় রিজার্ভ। রিজার্ভ সমুন্নত রাখতে রফতানি বাড়াতে হবে। তা করতে হলে কল-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। সামগ্রিকভাবে এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের কিছু করার নেই। ফলে উদ্যোক্তাদের সরকারের নীতিনির্ধারণের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সাধারণত সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই সপ্তাহে একদিন বন্ধ থাকে। সে দিনকেই প্রাধান্য দিয়ে শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহ বন্ধের মাধ্যমে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হলিডে’ করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে একদিকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সাশ্রয় হবে। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বাড়লে অন্যান্য এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, শিল্প-কারখানায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন সমন্বয় হলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা প্রশমিত হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, এক মাস পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে নীতিটি পর্যালোচনা করা হবে। যে ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন শিল্প-কারখানার উৎপাদন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় সাশ্রয়ী হওয়া এবং কৃচ্ছ্রসাধনের বিকল্প নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে খুঁজে বের করতে হবে, কোথায় কোথায় বিদ্যুতের অপচয় হয় এবং কোথায় বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়—এসব বিষয় খতিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেখানে যেখানে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যেতে পারে সেখানেই তা করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা রয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। রাজধানীসহ বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে বিদ্যুচ্চালিত বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড রয়েছে, সেগুলো সময় নির্দিষ্ট করে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। ঈদের সময় মার্কেট ও শপিং মলগুলোয় ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ ব্যবহূত হয়। সেখানে কীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়, এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এসব অপ্রয়োজনীয় স্থান চিহ্নিত করতে হবে। যেসব অবৈধ সংযোগ রয়েছে, সেগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে। বছরের পর বছর ধরে চলা সিস্টেম লস নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকেরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন আশা করি। তাদের স্বীকার করতে হবে যে পরনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণেই এ সংকট ঘনীভূত হয়েছে। ফলে লোডশেডিং বা কৃচ্ছ্রসাধন সাময়িক সুবিধা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় সাশ্রয়ী উৎসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিতে হবে।
চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম থাকলে বিশৃঙ্খল অবস্থা এড়ানো কঠিন। পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেড়েছে, এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু জ্বালানি খাতকে স্বাবলম্বী না করে আমদানি বাড়িয়ে সংকট উত্তরণের যে ভুল পথ বেছে নিয়েছে সরকার, তারই খেসারত এখন দেশবাসীকে দিতে হচ্ছে। শুরু থেকেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের বড় অংশ তেলনির্ভর। অথচ এখন বিশ্বে জ্বালানি তেল দুর্মূল্য। অন্যদিকে দেশে চাহিদার তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনও পর্যাপ্ত নয়। একদিকে গ্যাস সংকট, তার ওপর সারের জন্য ইউরিয়া সার কারখানায় জরুরি গ্যাস সরবরাহ দিতে গিয়ে গ্যাসভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র মৌসুমে বন্ধ রাখতে হয়। অর্থাৎ চাহিদানুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোও সার্বক্ষণিক সর্বোচ্চ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে না। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে আমদানিসহ নানামুখী প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে জরুরি ভিত্তিতে চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকারের নেয়া কিছু ব্যবস্থা বিরূপ সমালোচনারও খোরাক হয়েছে। একদিকে করোনার একটা অভিঘাত, তার ওপর এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যার ফলে আজ পুরো বিশ্বেই যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি অনেক দেশেই এখন বিদ্যুতের জন্য চলছে হাহাকার। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে উপকরণগুলো সেগুলোর দাম অত্যধিক বেড়েছে। এ অবস্থায় আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা আমদানি—সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার প্রতিফলন দরকার। সব ক্ষেত্রে যাতে জাতীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায় সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।










