দেশের আমদানি ব্যয় এরই মধ্যে রেকর্ড ছুঁয়েছে। তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই দেশের আমদানি ব্যয় ৬১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আবার বৈদেশিক মুদ্রাবাজারও অস্থিতিশীল। ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান। এ প্রেক্ষাপটে বিলাসপণ্য আমদানির পথ আরো কঠোর করে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে মোটরকার (সেডান কার, এসইউভি), হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহূত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর আমদানি ঋণপত্রের ন্যূনতম নগদ মার্জিন হবে ৭৫ শতাংশ। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের নগদ মার্জিন নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ। এটা ভালো উদ্যোগ। শুধু নির্দেশনা দিয়ে দায়িত্ব শেষ নয়, এর যথাযথ পরিপালন নিশ্চিতে তদারকিও বাড়াতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।
দুই দশক ধরে দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকাটাই অনেকটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ফলে ২০০১ সালে রিজার্ভ যেখানে ১ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল, সেখান থেকে তা ক্রমে বেড়ে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু এর পর থেকে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এর মূল কারণ আমদানির লাগামহীন বৃদ্ধি। স্বভাবতই আমদানির কারণে বিলও বেশি মেটাতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, বছরখানেক আগেও দেশের আমদানি ব্যয় ছিল মাসে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অথচ চলতি অর্থবছরে প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। আমদানির এ ব্যয় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতিতেও নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই (জুলাই-মার্চ) সরকারের চলতি হিসাবে ১৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতির খবর মিলছে। বাড়তি চাপ ফেলছে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি। এরই মধ্যে রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যা কেবল সাত-আট মাসের আমদানি বিল মেটানোর সমপরিমাণ। এটা অশনিসংকেত।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে মোটামুটি সব দেশই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি যথাসম্ভব শক্তিশালী রাখতে বাণিজ্য ঘাটতির ব্যবধান বাড়তে না দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। এর অন্যতম মাধ্যম আমদানি নিয়ন্ত্রণ। এরই মধ্যে নেপাল কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে। আরো কয়েকটি দেশ ওই পথে হেঁটেছে। এটা আমাদের জন্যও অনুসরণীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বিলাসপণ্যের আমদানি কমাতে এপ্রিলেই সক্রিয় হয়। গত ১১ এপ্রিল বিলাসপণ্য আমদানিতে ন্যূনতম নগদ মার্জিন ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। এর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আগের অবস্থান থেকে সরে এসে আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে এখন। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। আগে বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা জারি করলেও সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে পরিপালন নিশ্চিত করা যায়নি কিংবা ব্যবসায়ীদের চাপে ব্যাংকগুলোও কঠোর থাকতে পারেনি। এবার এর ব্যত্যয় আশা করব। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
আমরা দেখছি রফতানি আয়ের যে প্রবৃদ্ধি তা আমদানি ব্যয়ের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। নভেল করোনাভাইরাস-সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে জ্বালানি তেল-গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে এমন কোনো অবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরকারের চলতি হিসাব ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের বিদ্যমান ঘাটতি বছর শেষে আরো বড় হবে। আগামী দুই বছর একই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকলে দেশের অর্থনীতি দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে। সাধারণত রেমিট্যান্সের অর্থে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণ হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে। আবার রফতানি বাড়লেও সব অর্থ যথাযথভাবে প্রত্যাবাসন হচ্ছে না। বাণিজ্যবিরোধজনিত জটিলতায় অনেক ক্ষেত্রে তা বিলম্বিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে। কাজেই এখনই সতর্ক হতে হবে।
বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে আমদানির ক্ষেত্রে ক্যাশ মার্জিনের পরিমাণ যে বাড়ানো হয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। পুরো আমদানি তালিকাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ বাজারে গেলে বোঝা যায় এমন সব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজারজাত করা হচ্ছে, যার কোনো প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোকে দেখতে হবে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ হচ্ছে কিনা। আমদানি ব্যাংকের সব শাখার মাধ্যমে হয় না। বৈদেশিক শাখার মাধ্যমে আমদানি ‘এলসি’ খোলা হয়। এর সংখ্যা খুব বেশি নয়। এসব শাখার এলসিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দরকার, যাতে ‘ওভার ইনভয়েসিং’য়ের ঘটনা চিহ্নিত করা যায়। কেননা দেশ থেকে অর্থ পাচারের অন্যতম মাধ্যম ওভার ইনভয়েসিং। তবে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি যেন বন্ধ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নইলে রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী গতকাল সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করার কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিলাসপণ্যে এলসি মার্জিন আরো বাড়ানোর নির্দেশনা জারি করেছে। এগুলো সময়োচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এবং ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীলতায় বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা।










