আরব্য উপন্যাসে শত শত বছর ধরে কলসির ভেতরে থাকা দৈত্যটি বের হওয়ার পর সে বলল, তার পক্ষে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালের সবকিছু জয় করা সম্ভব! এখন প্রশ্ন হলো, এত বড় শক্তিশালী অতিকায় দৈত্যটি কেন এতদিন কিছু করতে পারেনি?
কেন শত শত বছর ধরে সে সামান্য কলসির ভেতর অন্ধকারে আবদ্ধ হয়েছিল? এর আসল কারণ হলো, আলো! যা কলসির ঢাকনা খোলার পর সে সূর্য থেকে পেয়েছিল। ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের মাঝে এমন কিছু শক্তি এবং সম্ভাবনা রয়েছে, যা সে বুঝতে পারে না; কিন্তু যখন সে আলোর সান্নিধ্যে আসে তখন সে বুঝতে পারে এবং সবকিছুই জয় করতে চায়, অনেক সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এ আলোর নাম হলো জ্ঞান, যা সে বই পড়ে অর্জন করতে পারে। কথাগুলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের, যিনি বিশ্বাস করেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ আর এই সুমহান বিশ্বাস প্রতিনিয়ত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটিই করছে তার স্বপ্ন দিয়ে গড়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
‘আলোকিত মানুষ চাই’—এ স্লোগান নিয়ে ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ঢাকা কলেজের পেছনে এক ছোট্ট মিলনায়তনে মাত্র ১৫ জন সভ্য নিয়ে শুরু করা সেদিনের সেই ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটি আজ বিশাল মহীরূহে রূপ নিয়েছে। ঢাকার বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নতুন ভবন। নয় তলাবিশিষ্ট এ ভবনের প্রায় ৫৭ হাজার বর্গফুটজুড়ে আছে সমৃদ্ধ পাঠাগার, চিত্রশালা, মিলনায়তন, সংগীত ও চলচ্চিত্র আর্কাইভ, অতিথি কক্ষ, বই বিক্রয়কেন্দ্র ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় ৪৩ বছর ধরে যিনি নিরন্তর কাজ করে চলছেন আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে। ২০১৮ সালের তথ্যমতে, কেন্দ্রের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রায় ২৮ লাখ সভ্য নানামুখী কার্যক্রমে অংশ নিয়ে প্রতিনিয়ত ঋদ্ধ হচ্ছে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সমৃদ্ধ সংগ্রহশালায় আছে প্রায় দুই লাখ বই। বছরে দশ হাজারের মতো পাঠক-পাঠিকা এ গ্রন্থাগার থেকে বই পড়ার সুযোগ পান। শুধু পাঠাগারেই নয়, এখান থেকে বই বাড়িতে নিয়ে পড়ারও সুযোগ আছে। বাংলাদেশে ভালো গ্রন্থাগার ব্যবস্থার অভাব বোধ থেকেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চালু করে ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ব্যবস্থা। এই ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার প্রতি সপ্তাহের নির্ধারিত সময়ে শহর ও গ্রাম মিলিয়ে ৬৪টি জেলায় গিয়ে আধঘণ্টা থেকে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সদস্যদের মধ্যে বই দেয়া-নেয়া করে। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া এ কার্যক্রম বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ৪০০টি উপজেলার তিন হাজার লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বড় মানুষ, সম্পন্ন মানুষেরাই শুধু পারে একটি বড় দেশ আর বড় জাতিকে গড়ে তুলতে। আমাদের সামনে আগামী দিনের যে মহান বাংলাদেশ অপেক্ষমাণ, তার সুযোগ্য নির্মাণের জন্য আজ আমাদের প্রয়োজন অনেক সমৃদ্ধ মানুষের। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ বইগুলো নিয়মিত পড়ানোর ভেতর দিয়ে দেশের মানুষের চেতনা জগেক বড় করে তোলার উদ্দেশ্যে নানান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ভালো বই পড়ার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের পাঠ্যাভাস বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।
শুধু নামেই নয়, এ যেন আক্ষরিক অর্থেই আলোর বিদ্যায়তন। তবে না, ইশকুুল বলে এতে নেই তথাকথিত পড়া মুখস্থ করার মানসিক যন্ত্রণা; বরং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞানার্জনের জন্য এখানে চলে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলার প্রয়াস। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন উদার ও আধুনিক মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক ভবনে চলছে ‘আলোর ইশকুল’ নামে একটি উত্কর্ষধর্মী কর্মসূচি। আলোর ইশকুল কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের যেকোনো ব্যক্তি সদস্য হয়ে বিশ্বসংগীত, সাহিত্য, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, পরিবেশসহ বিভিন্ন শাখায় জ্ঞান আহরণের সুযোগ পেয়ে থাকেন। জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব শাখার ১০০টি উত্কর্ষ চক্রের মাধ্যমে সাত পর্বের এ আলোকযাত্রা প্রতি পাঁচ বছরে একবার করে আবর্তিত হবে। আলোর ইশকুলের পড়াশোনা চলে সমবেত ও আনন্দময় চালে। একে বরং পড়ালেখা না বলে পড়াশোনা বলাই অধিক যুক্তিসংগত। বক্তব্য শোনা ও মুক্ত আলোচনা এবং একই সঙ্গে দেখা, শোনা ও ভ্রমণই হলো এর মূল পাঠ্যক্রম। সব শেষে চলে সদস্যদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক মুক্ত আলোচনা থেকে যৌক্তিক তর্ক-বির্তক। এ ধরনের পাঠচক্রে বই পড়া, বক্তৃতা শোনা, আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণ, দলীয়ভাবে প্রামাণ্যচিত্র-চলচ্চিত্র-নাটক দেখা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রকলা প্রদর্শনী উপভোগ, দলীয় ভ্রমণের মতো জ্ঞান অর্জনের বিভিন্ন শাখা রাখা হয় প্রাত্যহিক পাঠাভ্যাসে। এখানেই শেষ নয়, কী কী শেখা হলো আর জানা হলো তা লিখে জমা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। এরই মধ্যে আলোর ইশকুলের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে এ ধরনের ৩০টি চক্র আয়োজিত হয়েছে। ছোট-বড় ১০০টি উত্কর্ষ চক্রের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছরে একবার সম্পন্ন হবে এ আলোক যাত্রা। চক্রগুলো হবে দুই মাস থেকে এক বছরের। চক্রগুলো হলো চলচ্চিত্র, আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন, ভারতীয় দর্শন, পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত, শ্রেষ্ঠ বইয়ের ওপর বক্তৃতা, ভ্রমণ কর্মসূচি, প্রামাণ্যচিত্র, বিশ্বসাহিত্য, ফটোগ্রাফি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা ও মুক্ত আলোচনা, মহাকাব্য পাঠচক্র, স্থাপত্যের নান্দনিকতা, নাট্যানুষ্ঠান, আবৃত্তি অনুষ্ঠান ও কবিতা আস্বাদন। এ চক্রগুলোয় সদস্যরা বিচিত্র বিষয়ের ওপর প্রায় আড়াইশ অনবদ্য ও স্বপ্ন জাগানো বক্তৃতা শোনার সুযোগ পাবেন। যারা আলোর ইশকুল কোনো পর্বে নির্বাচিত হবেন, তারা ওই চক্রগুলো ছাড়াও আরো বিশেষ কিছু চক্রে অংশ নেয়ার সুযোগ পাবেন। ২০টি চক্র সফলভাবে শেষ করলে মিলবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মর্যাদাসম্পন্ন সনদ, সঙ্গে আলোর ইশকুলের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ। আলোর ইশকুলের ‘বিভিন্ন শাখার আনন্দময় চর্চা ও উত্কর্ষের ভেতর দিয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলার জন্য পরিচালিত হয় এ ইশকুলের কার্যক্রম।
অন্ধকার ঠেলে আলোর যাত্রা শুরু করতে হবে। একটা নতুন কিছু করতে হবে। এমন একটা কিছু, যা তৈরি করবে মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ আর সংস্কৃতি চেতনাসম্পন্ন মানুষ। আর তা সম্ভব তারুণ্য দিয়েই, যারা দ্বিধাহীন চিত্তে পুরনো আবর্জনা ঝেড়ে ফেলবে। প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে একটা নতুন কিছু সৃষ্টি করবে। আড্ডায় সতীর্থদের প্রশ্ন, কীভাবে সম্ভব? একটি আন্দোলন গড়তে হবে। আর তা হবে আলোকিত মানুষ তৈরির আন্দোলন; যা থেকে সঞ্চারিত হবে অনুপ্রেরণা, সাহায্য, সহযোগিতা। এ কেন্দ্রে থাকবে বিশ্বসাহিত্যের যাবতীয় উপকরণ। কেন্দ্রে গড়ে উঠবে বিভিন্ন শাখার ওপর পাঠচক্র; যা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। চার দশক আগে অনেকের কাছে এটি ইউটোপিয়ান চিন্তা হলেও আজ আর তা বিক্ষিপ্ত কোনো স্বপ্ন নয়, কোনো বিচ্ছিন্ন ভাবালুতা নয়। লাল ইটের পরতে পরতে আজ সেখানে ছড়িয়ে আছে সাফল্য আর সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। এমন নানা বিভ্রান্তি আর সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কাজ করে গেছেন নিরলস। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিজস্ব কোনো মতাদর্শ নেই। কেন্দ্র কাউকে কোনো মতাদর্শে দীক্ষিত করে না। কেন্দ্রের যদি কোনো মতাদর্শ থাকে তবে তা মনুষ্যত্বের সমৃদ্ধি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চার দশক ধরে এ আদর্শের জন্য লড়াই করছে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তখন ঢাকা কলেজের জনপ্রিয় শিক্ষক। বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্ররা মুখিয়ে থাকতেন সায়ীদ স্যারের বক্তৃতা শোনার জন্য। সে ক্লাসের কোনো সময় আর সীমানা ছিল না। চার দেয়ালে আবদ্ধ নয় সে ক্লাস। কবে ক্লাস নেবেন সায়ীদ স্যার, এটি ছিল আলোচনার বিষয়। সেই দীপ্তিমান আলোক ছড়ানো কথাগুলো পরে স্যার বিলিয়ে দেন কেন্দ্রের মাধ্যমে শহর, গ্রাম, জেলা, উপজেলা সবখানে। একসময় যে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ ছিল পাঠকক্ষে, আজ তা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সূচনা ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা কলেজের পাশে নায়েম সেন্টারে। নায়েম সেন্টার থেকে ১৯৮৩ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চলে যায় ইন্দিরা রোডের ভাড়া বাড়িতে। সেখান থেকে একই বছর ১৪ ময়মনসিংহ রোডে। ৩৫ টাকায় যাত্রা শুরু হওয়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে আর সেখান থেকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। চার দশকে এর কর্মসূচি ছড়িয়েছে দেশজুড়ে নানা প্রকারে। দেশভিত্তিক উত্কর্ষ কার্যক্রম, দেশভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, আলোর ইশকুল, দেশভিত্তিক পাঠচক্র, অনলাইনে বই পড়া কার্যক্রম আলোর পাঠশালা—কী নেই? আড়াইতলা ছোট ভবন থেকে বর্তমানে দশতলা ভবনে স্থায়ী রূপ পেয়েছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
নিজের ব্যক্তিগত জীবনবদলের গল্প বললে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। আমি তখন নটরডেম কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। সময়টা ১৯৯৯ সাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৈমন্তী গল্পের নায়কদের তখন বিরতি। ৫ টাকার সমুচা আর ৮ টাকার পেটিস ততক্ষণে জিভে জল এনেছে। বারান্দায় গিজগিজ, পায়ে পায়ে এগিয়ে চলছি ভিড় এড়িয়ে; বাইরে ফাগুন হাওয়া। কোলাহলের হল্লায় চোখে পড়ল একটি হাত! হলুদ লিফলেটের সুতীক্ষ দৃষ্টি। হাত বাড়াতেই হাতে আসে সেই উড়ন্ত হলুদ বার্তা; তাকিয়ে দেখি কালো হরফে লেখা—বই পড়লেই পুরস্কার! তাও আবার হাজার টাকার বই! সহপাঠীদের সঙ্গে পরামর্শ করি, চল না যাই। দলবেঁধে ছুটে যাই চোরাগলির লাল ইটের সেই বাড়িটিতে। গলিপথ পেরিয়ে উঁকি দিতেই মন আটকে যায়। সবুজ দূর্বাঘাসে ছাওয়া লনের পাশে নাগলিঙ্গম, মহুয়া, রঙ্গন, শিউলি, কামিনী। নানান সুবাসে ম-ম করছে চারদিক। মন বলছে, ওদের বন্ধুত্ব আমার চাই-ই চাই। হলুদ লিফলেটের সেই নেশায় বুঁদ হয়ে গেলাম সেই থেকেই। এভাবেই চিরায়ত, আদর্শিক জীবন বদলে যাওয়া চরিত্রগুলোর সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয়। সক্রেটিস, প্লেটো, টলস্টয়, মার্ক টোয়েন, ম্যাক্সিম গোর্কি, এডগার এলান পো, নিকোলাই গোগল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ আরো কত বুদ্ধিদীপ্ত লেখকের সঙ্গে পরিচয়। তাদের লেখায় চরিত্রগুলো নিয়ে দিনভর মশগুল থাকি। আর সেসব দিনে যে মানুষটি বইয়ের পেছনের মানুষদের গল্প বলতেন, আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরতেন, সেই আলোর ইশকুলের কারিগর ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রথম দিনের স্মৃতিতে মনে পড়ে, লাল ইটের দেয়াল পেরিয়ে ধাক্কা লাগে এক কক্ষের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে। নাম ছিল সুরঞ্জনা। সেখানেই জমা দিতে হবে হলুদ লিফলেটের শর্ত অনুযায়ী ১০ টাকার অফেরতযোগ্য ফি, ৪০ টাকার নিরাপত্তা জামানত। সেই শুরু, যার শেষ নেই। সেই ১০ টাকায় বই পড়েছি কত শত তার ইয়ত্তা নেই। বলা চলে বইয়ের রাজ্যে সেই থেকেই ঢুকে পড়া। আজও মাতাল হয়ে আছি বইয়ের নেশায়। সপ্তাহ শেষে ছুটির সকাল-বিকাল সায়ীদ স্যারের তীক্ষ শক্তি দিয়ে চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ আমাদের ভাবিয়ে রাখত দিনকে দিন। পাঠ আলোচনা শেষে ছোলা-মুড়ি আর লাল চায়ে চলত নানা দার্শনিক তথ্য আর তত্ত্বের বৈঠকি আসর। চলমান কেরানি বৃত্তান্তের বাইরে জীবনকে ভাবা সেই থেকেই শুরু। কুয়োর ব্যাঙ আর সাগরের তিমির মধ্যে তফাতটা কোথায়, তা-ও বুঝেছিলাম সক্রেটিয়ান এ স্কুল থেকেই। শুরুতে মাত্র ২৫ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে একটি পাঠচক্র শুরু হয়েছিল। গত চার দশকে এমন অগণিত পাঠচক্রে লাখ লাখ শিক্ষার্থী আজ আলো ছড়াচ্ছে ছয়টি মহাদেশে।
অনুসন্ধিত্সু এমন পথপরিক্রমায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লড়ে চলেছে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ্য কী? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কী করতে চায়? এমন প্রশ্নে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাফ জবাব, “আমাদের লক্ষ্য, ‘আরো একটু ভালো’।” দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, কেউ যদি জীবনে পুলিশের একজন দারোগাও হয় তাহলে সে যেন আরো একটু ভালো দারোগা হয়। প্রগতি বা প্রতিক্রিয়া এ দুই দলের কারো ব্যাপারেই দায় নেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের। বিশ্বসাহিত্য মানুষের গুণগত সমৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কাছ থেকে শোনা একটা গল্প: এক ছেলে একটি ছেঁডা মানচিত্র জোড়া দিয়েছে। তার কাছে জিজ্ঞেস করা হলো, মানচিত্রটি সে কীভাবে জোড়া লাগাল। ছেলেটি বলল, ‘আমি তো মানচিত্র জোড়া দিইনি। যে পৃষ্ঠায় মানচিত্র আঁকা ছিল, তার উল্টো পাশে ছিল একজন মানুষের ছবি। আমি মানুষটাকে জোড়া দিয়েছি, ছেঁড়া মানচিত্র এমনিতেই জোড়া লেগে গেছে!’ আলোর ইশকুলে যারা শিক্ষার্থী, তাদের মূলত এই বিষয়টিই শেখানো বা বোঝানোর চেষ্টা করা হয় অনাবিল কিছু আনন্দ আর উপভোগের মধ্য দিয়ে। স্যারের একটি কথা সবসময় আমার কানে বাজে। আর তা হলো ‘বিস্ময়’! তিনি বলেন, শিশুরা যেকোনো নতুন কিছু দেখলেই বিস্মিত হয়, আর বিস্মিত হয় বলেই তারা মনে রাখে, ভুলতে পারে না। আর আলোর ইশকুলে বহুমুখী বিস্ময়কর আনন্দ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এগিয়ে যাচ্ছে আলোকিত মানুষ গড়ার লক্ষ্যে।
রাকিব হাসান সেলিম
itsrakib07@gmail.com
চিফ কোঅর্ডিনেটর, স্ক্যান সোসাইটি বাংলাদেশ










