ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে অবস্থানের জন্য আটক হয়েছেন বহু বাংলাদেশী। তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন বন্দি অবস্থায়। ইউরোপের দেশগুলো অবৈধ এ অভিবাসীদের ফেরত নিতে বাংলাদেশকে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে। গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের কাছে প্রায় এক হাজার অবৈধ বাংলাদেশীর তালিকা পাঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর আগে অবৈধভাবে গিয়ে আটকা পড়া ৫০০ জনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে জার্মানি। পরে বিভিন্ন সময় যাচাই-বাছাই করে তাদের মধ্য থেকে অনেককেই ফিরিয়ে আনা হলেও এদের বড় একটি অংশ আটক রয়েছে জার্মানিতে। এসব বাংলাদেশীকে ফেরত নিতে অসহযোগিতার কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশীদের ভিসা দেয়া সাময়িক বন্ধের প্রস্তাব করেছে ইউরোপিয়ান কমিশন। বিষয়টি নিয়ে দৈনিক বণিক বার্তায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশী আবেদনকারীরা ভিসা পাওয়ার বিদ্যমান সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এছাড়া নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ইউরোপের বাজারগুলোতে রফতানি সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও। তাছাড়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করা না হলে তা কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে।

কয়েক বছর আগে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অজুহাত তুলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা স্থগিত ঘোষণা করে। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কার্যত ইউরোপের বাজারনির্ভর। বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে ইউরোপের বাজর থেকে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে। তাছাড়া ২০২৬ সালে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে বর্তমান জিএসপি আইন অনুযায়ী তিন বছর ট্রানজিশন টাইম পাওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া ব্রেক্সিটের পর ইইউ জোটের শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে কাজ শুরু করেছে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইউরোপের প্রভাবশালী তিন দেশ জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। তবে  বিভিন্ন সময়ে ইইউতে যাদের বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশী নন। অনেকেই রোহিঙ্গা কিংবা অন্য দেশের নাগরিক, যারা আটক হওয়ার পর নিজেদের বাংলাদেশী বলে দাবি করেন। তাই পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু বাংলাদেশে নয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য অবৈধ অভিবাসন বড় ধরনের সমস্যা। যেমন শুধু ইংল্যান্ডেই এক লাখের বেশি অবৈধ ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। তবে কয়েক মাস আগে ভারত ও ইংল্যান্ড সরকারের মধ্যে নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর অধীনে ভারত তাদের অবৈধ অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনবে। তবে শর্ত হচ্ছে, ইংল্যান্ড তিন হাজার দক্ষ ভারতীয় কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেবে। এছাড়া ইংল্যান্ডের মত্স্য খাতের পাশাপাশি নার্সিং পেশায় ভারতীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মাধ্যমে সরাসরি ২০-২৫ হাজার ভারতীয় নাগরিকের জন্য ইংল্যান্ডে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রীলংকা যেমন অবৈধ অভিবাসন রুখতে ২০০৬ সালের অভিবাসন আইনে সংস্কার এনেছে। তাছাড়া কভিড পরিস্থিতিতে নতুন করে সক্রিয় হওয়া মানব পাচারকারীদের কার্যক্রম রুখতে শ্রীলংকার নৌবাহিনীকেও আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তত্পর থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অবৈধ অভিবাসন রোধে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং শক্তিশালী অভিবাসন প্রক্রিয়া গড়ে তুলেছে।

ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম আসায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশসহ বিভিন্নভাবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করা হলেও যুদ্ধ চলমান দেশগুলোর মানুষের অবৈধভাবে প্রবেশের সঙ্গে বাংলাদেশীরা কেন প্রবেশ করছে, বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে তার উত্তর দিতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে। যদিও ইউরোপ অভিমুখে শরণার্থীদের যে স্রোত, তাতে অসংখ্য বাংলাদেশী রয়েছেন। বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি (সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট) যাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এভাবে যেতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে অনেকে মারাও যাচ্ছেন। তবে বৈধ পথে ইউরোপ, আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ বাড়লে পরিস্থিতি এমন হতো না। বৈধ পথে যেতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এ জায়গায় বাংলাদেশের ঘাটতি দৃশ্যমান।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপ বলছে, আরো ভালো জীবনযাপন ও পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। তাই দেশে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করা, মেধা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের ওপর জোর দিতে হবে। অবৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বন্ধে সবার আগে জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে অভিবাসী আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, দালাল চক্রকে আইনের আওতায় আনা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিবাসনবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া অনেক দিন ধরেই দালালরা সাগরপথে লোকজনকে ইউরোপে পাচার করতে সক্রিয় রয়েছে। দালালরা নানা কৌশল ও প্রলোভনে অনেককে ফাঁদে ফেলছে। ভয়ংকর পথে কেন বাংলাদেশীরা অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাত্রা করছেন, এ প্রশ্নের সমাধান জরুরি।

প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের তরফ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যেসব দেশ তাদের অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত নেবে না, তাদের ভিসা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হবে। এ ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালেই ইইউর সঙ্গে এসওপি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এতে নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিজ নাগরিককে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশনসহ দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা ও যোগাযোগ চালিয়ে যেতে হবে, যাতে ইইউর অভ্যন্তরে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জোরালো হয় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অটুট থাকে।