করোনার ধকল সামলে এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ পাচ্ছে কারখানাগুলো। তথ্য বলছে, গত জানুয়ারিতেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমনকি চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া থেকে সরিয়ে দেশটির ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করছে। ইউরোপীয় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমরূপ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অন্য দেশ থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের এ প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর। এতে রফতানি আয়ে উল্লম্ফন ঘটবে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বেগবান হবে। কাজেই সুযোগ কাজে লাগাতে কারখানাগুলোর যথাযথ প্রস্তুতি ও সরকারের সার্বিক সহযোগিতা জরুরি।
করোনা ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়লে ২০২০ সালের মার্চে ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউন জারি করা হয়। তাতে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। বিক্রি না থাকায় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডগুলো একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করা শুরু করে। দিন দিন সেটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সেইসঙ্গে নতুন ক্রয়াদেশ আসাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান উদ্যোক্তারা। তবে ২০২১ সালের জুন থেকে অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। বাড়তে থাকে রফতানি। সেই ধারা এখনো চলমান। এক্ষেত্রে নতুন সংযোজন হলো অন্য দেশ থেকে স্থানান্তর হয়ে অনেক নতুন ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে যাচ্ছে। দেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট থাকলেও ক্রয়াদেশ ব্যবস্থাপনায় অনেকটা দুর্বলতা বিরাজমান। স্থানান্তরের কারণে ক্রয়াদেশ যে হারে বাড়ছে তাতে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কতটা সামাল দেয়া যাবে, সেটি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। আবার সময়ান্তরে দেশ থেকে পোশাক রফতানি বাড়লেও তুলা ও সুতার মতো কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কাটেনি। এসব উপকরণের বেশির ভাগই বাইরে থেকে আনতে হয়। এতে ব্যয়ও বেশি, আনতেও সময় লাগে। এছাড়া পরিবহন ব্যবস্থায়ও কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। একে তো অস্বাভাবিক পরিবহন খরচ, অন্যদিকে যানজটের কারণে পণ্য বন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতেও বেশ সময় লাগে। আবার পণ্য পৌঁছালেও জাহাজজট কিংবা কনটেইনার সংকটে ঠিকমতো জাহাজীকরণ অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে ক্রেতার কাছে যথাসময়ে পণ্য পৌঁছে দেয়া চ্যালেঞ্জিং।
আমরা দেখছি, বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উপস্থিতির বিকেন্দ্রীকরণ করছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে ক্রয়াদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় সরিয়ে আনছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে তারা। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক সুবিধা যেখানে পাবে, সেখানেই স্থিত হবে। সাম্প্রতিক সময়ে উল্লিখিত দেশগুলো কারখানার কর্মপরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, স্থানীয়ভাবে কাঁচামালের লভ্যতা, পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পের বিকাশ, পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় সাশ্রয় এবং বন্দরের সক্ষমতা সূচকে অনেকখানি এগিয়েছে। কোন ধরনের নীতি ও কর্মপ্রক্রিয়া অনুসরণে দেশগুলোর এ উন্নতি হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেতাদের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া এবং কভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা চাঙ্গা হওয়ার কারণে ক্রয়াদেশ বেড়েছে। এর তুলনামূলক সুবিধা বেশি পাচ্ছে বাংলাদেশ। কভিড মোকাবেলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং পোশাক খাতে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতা উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। ফলে তারা এখানে আসতে চাইছেন। এটা ইতিবাচক বিষয়। তবে অতিরিক্ত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি, সেটা সাময়িক মনে করছেন কেউ কেউ। তিন-চার মাস পর এ ধারা কমে যেতে পারে বলছেন তারা। অবস্থা যা-ই হোক না কেন, আমাদের দিক থেকে সার্বিক প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে হবে।
চলমান ক্রয়াদেশ স্থানান্তরের একটা ভূরাজনৈতিক দিকও আছে। চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র। বাণিজ্যযুদ্ধ ও করোনার কারণে বছর বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারাচ্ছেন চীনের পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। সেই ব্যবসা এখন পাচ্ছে বাংলাদেশ ও অন্য প্রতিযোগী দেশগুলো। এর মধ্যে শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সখ্যের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে চীনের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন বৈরিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আলোচ্য যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাবে পোশাকের চাহিদা সাময়িক ভাটা পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে ভূরাজনৈতিক বিভাজন আরো বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের স্নায়ুযুদ্ধ প্রলম্বিত হবে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র পোশাক রফতানির জন্য যে অনেকটা চীনবিমুখ হবে, সেটি সহজেই অনুমেয়। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। এ দূরবর্তী প্রেক্ষিতটি মাথায় রাখতে হবে। এজন্য কারখানার কর্মপরিবেশের আরো উন্নয়ন, শ্রমদক্ষতা বৃদ্ধি, ক্রয়াদেশ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই পশ্চাৎ সংযোগ শিল্প গড়ে তোলা, কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটি দূর এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি ক্রেতাদের যে আস্থা বেড়েছে, সেটি ধরে রাখতে হবে।
দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত তৈরি পোশাক শিল্প। সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের পাশাপাশি বিপুল মানুষ, বিশেষত নারীদের কর্মসংস্থানের বড় উৎস এটি। কিন্তু তিন দশকের অধিক সময় হলেও খাতটিতে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। এখনো উদ্যোক্তারা সস্তা পোশাক তৈরিতে বেশি নজর দিচ্ছেন। উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য কম উৎপাদন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হলেও তার গতি মন্থর। বেশি মূল্যের পণ্য তৈরি করা গেলে দাম আরো বেশি পাবে। রফতানি আয় আরো বাড়বে। কাজেই এক্ষেত্রে উৎসাহ ও সহযোগিতা দিতে কার্যকর উদ্যোগ দরকার। এজন্য কিছু ইনোভেশন সেন্টার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজার বহুমুখী করতে হবে। এখনো প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরশীল। পোশাক রফতানির ভিত্তি আরো সম্প্রসারণে নতুন বাজারের দিকে নজর দিতে হবে। এলসিডি বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এলে বাংলাদেশ ইইউতে জিএসপি সুবিধা পাবে না। তখন শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখতে চাইলে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিতে হবে। সেজন্য যেসব কাজ করতে হবে তা এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা-চিন্তার নিরিখে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে খাতটির টেকসই রূপান্তর করা হবে, এটিই প্রত্যাশা।










