দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে। অনেক নদীই আজ মানচিত্র থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন; অনেক নদী মৃতপ্রায়। তথ্য বলছে, ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ৭০০ নদ-নদী রয়েছে। সেগুলোর পরিস্থিতিও আশঙ্কাজনক। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে নদ-নদীকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলেছেন, দিয়েছেন নানা দিকনির্দেশনা। উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে সেগুলোকে সুরক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তাতে অগ্রগতি সামান্য। প্রয়োজনীয় তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিরাজমান নদী-নদীগুলো ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় নদ-নদীর সঠিক পরিচর্যার জন্য নতুন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব দিয়েছে নদী রক্ষা কমিশন। বিষয়টি আমলে নিক সরকার।
নদ-নদী বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও ক্রমাগতভাবে সেগুলো বিপন্ন করার আয়োজন চলমান। এর শুরুটা অনেক আগেই, ইংরেজ আমলে। দেশের নদী ব্যবস্থার ওপর প্রথম আঘাত আসে তখনকার ভুল নদী ব্যবস্থাপনায়। এরপর ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের নামে ক্ষতিকর বাঁধ, আশির দশকে বিশ্বব্যাংকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীগুলোর ভালোর বদলে মন্দই করেছে বেশি। গত দুই দশকে শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যের প্রসারের জন্য নদীর দখল ও দূষণ ঘটেছে ব্যাপক হারে। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নদীর ধারে গড়ে উঠেছে বড় বড় কলকারখানা। শিল্প-কারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য অবাধে গিয়ে পড়ছে নদীতে। নদীর ওপর শত শত অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, হচ্ছে। নদী ভরাট করে দখলের উৎসবে মেতেছে প্রভাবশালীরা। বলা চলে দখল-দূষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের প্রধান-অপ্রধান সব নদীই আজ বিপর্যস্ত।
পানি ও জলজ সম্পদের অপরিসীম গুরুত্বের জায়গা থেকে বিশ্বের প্রতিটি দেশই নদ-নদী রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভারতে জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পানিসম্পদ ও নদী উন্নয়ন বিভাগ রয়েছে। তারা নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি করছে। চীনে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন নদী ও হ্রদ ব্যবস্থাপনা বিভাগটি নদ-নদীর পরিচর্যা করছে। সমরূপভাবে শ্রীলংকায় সেচ মন্ত্রণালয় নদী অববাহিকা ও সেচ ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা, পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত। পাকিস্তানে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ই নদী রক্ষণাবেক্ষণ ও আন্তঃনদী ব্যবস্থাপনার কাজটি করছে। স্বতন্ত্র ও নিবেদিত কোনো মন্ত্রণালয় না থাকায় দেশগুলো নদ-নদীকে দূষণের কবল থেকে সর্বতোভাবে বাঁচাতে পারছে না, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণেও অনেকক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ওইসব দেশেও নদীর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাধীন কর্তৃপক্ষ করার ব্যাপারে ভাবনা-চিন্তা চলছে বৈকি।
আমাদের দেশে অবশ্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নামে দুটো মন্ত্রণালয় বিদ্যমান। তারাই মূলত নদ-নদীগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। বলা হচ্ছে, ‘অতিরিক্ত কাজের বোঝায়’ আক্রান্ত মন্ত্রণালয় দুটির পক্ষে এ দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নদ-নদীগুলোর যথাযথ দেখভালের জন্য নদী রক্ষা কমিশন নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া দরকার। কেননা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তফাত বিস্তর। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ এবং ভাটির দেশ। নদীই এ ভূখণ্ডের প্রাণ। নদী না থাকলে পুরো জনপদই হুমকি পড়বে। যেভাবে নদীগুলো বিপন্ন হচ্ছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যেভাবে ধুঁকছে, তা উদ্বেগজনক। দুটো মন্ত্রণালয় এবং একটা কমিশন থাকলেও পারস্পরিক কাজের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রচুর। সংশ্লিষ্ট কমিশনকে ‘নদীর অভিভাবক’ ঘোষণা করা হলেও কার্যত প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা তেমন দৃশ্যমান নয়। প্রতিষ্ঠানটির আইনগত কর্তৃত্বও সীমিত। কতগুলো নীতি-নির্দেশনা দেয়া ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত অর্থে তাদের হাতে তেমন ক্ষমতা নেই। ফলে নদীগুলোর সুরক্ষা ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবটি সময়োপযোগী বৈকি।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশে সরকারিভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান, নতুন নতুন মন্ত্রালনয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূলত সময়ের প্রয়োজনের নিরিখেই সেগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। বিদ্যমান মন্ত্রণালয় দুটো যেহেতু নানা কাজের চাপে ভারাক্রান্ত এবং নানাভাবে বিভাজিত; সেহেতু নতুন মন্ত্রণালয় করলে দুই দিক থেকে লাভ। একদিকে তাদের চাপ কমবে, অন্যদিকে নিবেদিতভাবে নদ-নদীগুলো সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি আরো সহজ হবে। একইসঙ্গে বিরাজমান সমন্বয়হীনতারও অবসান হবে। কাজেই সুপারিশটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়াই এখন সময়ের দাবি।
ঐতিহাসিকভাবেই দেশের প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষি, মানুষের জীবনধারণের বড় আধার নদ-নদী। আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, যোগাযোগ সবকিছু নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পরিবেশগত, অর্থনৈতিকভাবে থেকে বেঁচে থাকতে হলে নদীকে বাঁচানোর বিকল্প নেই। অথচ সেই নদীই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। বিদ্যমান নদীগুলো সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্র জোরালো পদক্ষেপ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










