নারী-পুরুষের প্রতি
সমাজের ভ্রান্ত
দৃষ্টিভঙ্গির শুরু হয়েছে সেই নিরাপদ স্থান
পরিবার থেকে।
একটি পরিবারে
যখন কন্যাসন্তানের জন্ম হয়, তার প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি তা পুত্রসন্তানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যদিও মা-বাবার কাছে উভয় সন্তানের
গুরুত্বই অনেক, তবুও মা-বাবা অবচেতন
মনে দুই সন্তানকে দুই রকম ভাবে ট্রিট করেন।
কারণ কন্যা
ও পুত্রসন্তানকে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখাটা
হলো একটি ঐতিহ্য। ঐতিহ্য
হলো সেটাই,
যা পরম্পরাগতভাবে যুগের পর যুগ ধরে চর্চা
করা হয়। খুব সহজ একটা উদাহরণ
দিই। পুত্র
ও কন্যাসন্তান যখন একসঙ্গে খাবার
টেবিলে খেতে বসে, মা যখন খাবার
দেন, সেই খাবারেও ভিন্নতা
দেখা যায়। আর সেই খাবার টেবিল
থেকেই অবুঝ দুই শিশু শিখে যায় দুটি ট্যাগ—‘তুমি মেয়ে’ এবং ‘তুমি ছেলে’। তোমাকে
(ছেলে) বেশি করে খেতে হবে, কারণ তোমাকে শক্তিশালী
হতে হবে, তোমাকে বাইরে
যেতে হবে, বেশি বেশি পড়াশোনা করতে হবে, চাকরি
পেতে হবে, পৈতৃক বিষয় সামলাতে হবে, বোনদের বিয়ে হয়ে যাবে, সব দায়িত্ব
তোমাকেই পালন করতে হবে ইত্যাদি।
খাবার
টেবিলের পর আসি খেলার
মাঠ, খেলনাসামগ্রীর মাধ্যমে কন্যা ও পুত্রসন্তানের প্রতি
যুগের পর যুগ যে বৈষম্য চলছে তা কতটা যুক্তিসংগত? বাজারে
পুত্র ও কন্যাসন্তানের জন্য আলাদা আলাদা
খেলনাসামগ্রী সেই আদিকাল থেকে প্রচলিত। পুত্রসন্তানের জন্য ব্যাট-বল প্রভৃতি আর কন্যাসন্তানের জন্য পুতুল, রান্নাবাটি
প্রভৃতি। ভুল করেও যদি কোনো দিন কন্যাসন্তানটি ভাইয়ের
খেলনায় হাত দেয় তখনই পরিবার থেকে কোনো নারী সদস্য (মা, দাদি, চাচি, নানি, ফুফু) এসে তাকে বলেন, ‘তুমি মেয়ে, এগুলো
ছেলেদের জন্য।
এসব নিয়ে তুমি খেলতে
পারবে না। অনেক শক্তির
প্রয়োজন, যা শুধু ছেলেরাই
পারে।’ আর এভাবেই কন্যাশিশুটি নিজেকে কোমল ও দুর্বল ভাবতে
শিখে। যে ভাবনা নিয়ে আজীবন অতিবাহিত
করে।
আমাদের সমাজে শিশুকে এভাবেই ধরে ধরে পরিবারের গৃহকর্মী (স্ত্রী তথা মা) বৈষম্য সম্পর্কে জ্ঞানদান করে দিনের পর দিন এবং সেই অবুঝ শিশুরা ছোটবেলা থেকে বৈষম্যের মধ্যে বড় হয় এবং তা লালন করে জীবনের শেষ কাল পর্যন্ত। এর মূলে যে শুধু গৃহকর্মীর হাত তা কিন্তু নয়, কারণ সেই গৃহকর্মী তথা মা যখন শিশু ছিলেন তখন তার মাও তাকে সেভাবেই শিখিয়েছেন। এভাবে পরম্পরাগতভাবে বৈষম্যের শিক্ষা প্রচলিত। যে কারণে এই একুশ শতকেও একজন শিক্ষিত মাও তার শিশুকে অবচেতন মনে আদি বৈষম্য শিক্ষা দেন।
প্রশ্ন জাগে, এ বৈষম্য তথা কুশিক্ষার সঙ্গে নারীরা কীভাবে পরিচিত হলেন? মা জাতিরা কি এ কুশিক্ষাকে স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেছে নাকি বাধ্য হয়ে?
বেগম রোকেয়া, জহুরা বেগম, কাদম্বিনী, ফয়জুন্নেসার মতো নারীবাদীদের সময়কালের সামাজিক অবস্থা পরিলক্ষিত করলে বোঝা যায়, পুরুষশাসিত কর্তৃত্ববাদী সমাজে নারীদের অবস্থা কতটা নিগৃহীত ছিল। এ সমাজ নারীদের আড়ালে রাখতে বেশি পছন্দ করে। যেমন বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ অধ্যয়ন করলে বোঝা যায় খানিকটা সে সময়ের নারীদের অবস্থা।
অবরোধবাসিনীর ২৫ নং ঘটনায় এরূপ বলা আছে যে শহর দেখার স্পৃহায় রোকেয়ার নাতনি তার কাছে ইচ্ছা পোষণ করে বলেন, ‘আমরা সাত বৎসর হইতে এখানে আছি, কিন্তু শহরের কিছুই দেখি নাই।’
কারণ সে সময় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্যই এরূপ যে গৃহে পর্দা মেনে থাকবেন নারী, বাইরে থাকবেন পুরুষ। যাবতীয় সব সামলাবেন পুরুষ, নারী শুধু আদেশ-উপদেশ মেনে চলবেন। এক কথায় এ সমাজে নারী পুরুষের দাস হিসেবে বেঁচে থাকবেন।
অন্যদিকে অবরোধবাসিনীর ২৩ নং ঘটনায় নারীদের দ্বারা নারী নিগৃহীতের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন পাঁচ বছর বয়সকাল থেকে রোকেয়াকে নারীদের নির্দেশ মতো পর্দা করতে হতো। যখন তিনি পর্দা কী এটি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। পর্দার কারণ ছিল পুরুষ—নারী দেখামাত্রই নিজেকে আড়ালে রাখা। আর যদি নিজেকে আড়াল করতে ব্যর্থ হয়, তবে সর্বপ্রথম ওই পরিবারের হিতৈষী মুরুব্বিরা বলেন, ‘কলিকালের মেয়েরা কি বেহায়া, কেমন বেগয়রৎ’ ইত্যাদি। অর্থাৎ নারীদের আড়ালে থাকার নিয়ম, কটু শব্দ ব্যবহার করে থামিয়ে রাখার রীতি প্রভৃতি নারীরাই নারীদের সঙ্গে করে আসছেন দিনের পর দিন। কালের বিবর্তনে সবকিছুর পরিবর্তন ঘটলেও নারীদের কাছে নারী নিগৃহীত প্রথাটির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এসব হলো সেই উনিশ শতকের বাংলার নারীদের অবস্থা। যে সময় নারীশিক্ষার সুযোগ ছিল না, শিক্ষার সুযোগ পেতেন শুধু পুরুষরা। যে কারণে চিন্তাভাবনার বিষয়ে পুরুষরা পেয়েছেন গুরুত্ব আর নারীরা সমাজের (নারী-পুরুষ উভয়ের) কাছে হয়েছেন নিগৃহীত। এত তাচ্ছিল্যতার অভ্যন্তরে থেকেও রোকেয়া, ফয়েজুন্নেসা, সুফিয়া কামালরা সে সময়ই নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং পরনির্ভরশীলতা থেকে বের হতে যে প্রয়োজন অর্থনৈতিক মুক্তি, তা চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি নারীশিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যেন নারীরা তাদের চিন্তা-চেতনার মুক্তি ঘটায়।
এখন আসি একুশ শতকে বাংলাদেশের
নারীদের অবস্থা
বিষয়ে। এ দুই শতকের
মধ্যে কতটা উন্নত হয়েছে
নারীসমাজ তা ভাবনার বিষয়।
একুশ শতকে বাংলাদেশ এখন ‘ডিজিটাল’ দেশ। যেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে,
যার ১ শতাংশও উনিশ শতকে ছিল না। তাহলে
সেই তুলনায়
খুব স্বাভাবিক
নারীসমাজের পরিবর্তন
হওয়া এবং সত্যিকার অর্থে
নারীসমাজের পরিবর্তন
ঘটেছেও। নারীরা
এখন স্বাধীনভাবে চলাফেরার ইচ্ছা পোষণ, নিজের মতো পোশাক পরিধান
করার ইচ্ছা
পোষণ, মুক্তভাবে
ঘোরাফেরা ও সিগারেট ফুঁকার
ইচ্ছা পোষণ করেন, পাশাপাশি
যেকোনো কাজকে
সমান মনে করা প্রভৃতি।
কিন্তু নারী জাতি, আমরা যে এখনো সেই ঐতিহ্য
থেকে বের হতে পারিনি,
তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? আমার মন ও মস্তিষ্ক সেই ঐতিহ্য চর্চা
করছে, তা কি কখনো উপলব্ধি করেছি?
অবচেতন মনে নিজেকে কোমলমতিই
মনে করি, তা কি ভেবে দেখেছি?
অবচেতন মনে নারী যে এখনো পরনির্ভরশীল হতেই পছন্দ করে, তা কি মানি? নিজেকে
মানুষ না ভেবে ‘মেয়েমানুষ’
ভাবেই চিন্তা
করি, তা কি উপলব্ধি
করি? চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে আমি যে এখনো পরাধীন, তা কি ভেবেছি
কখনো?
‘নারীমুক্তি’ টার্মটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। প্রশ্ন হলো, এ সম্পর্কে কতটুকু বুঝি আমরা? নারীমুক্তির প্রথম ও প্রধান লক্ষ্যই হলো নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। জগতে নারী যে আলাদা একটা সত্তা, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। অন্যের আধিপত্য থেকে মুক্তি লাভ।
নারীমুক্তির ক্ষেত্রে হাজার বাধা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো নারী নিজেই। কারণ নারী নিজেই অন্ধকার থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার চেষ্টা করেন না। আমরা অধিকার ভোগ ঠিকই করতে চাই, কিন্তু অধিকারগুলো কী কী—এ সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং তা লাভের জন্য উপায়গুলো নিয়ে চিন্তা করি না। আমরা সবকিছু রেডিমেড পেতে চাই। অমুক যেন আমার অধিকার ফিরিয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও আমরা ঐতিহ্য (পরনির্ভরশীলতা) লালন করছি।
‘আমার অধিকার, আমার দায়িত্ব’—এমনটা যদি সবাই লালন করতাম তাহলে হয়তো এই একুশ শতকেও পরনির্ভরশীল বা পরাধীন থাকতে হতো না।
উনিশ শতকের দিকে যথেষ্ট নারীশিক্ষার সুযোগ ছিল না বলে নারীরা বাধ্যগত বা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগে বাংলাদেশ সরকার নারীশিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাদের শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। চিন্তাভাবনা, ভালো-মন্দ বোঝা—সবকিছুর জন্য নারীরা সুযোগ পাচ্ছেন। এত কিছুর পরও বর্তমান নারীসমাজের চিত্র উনিশ শতকের মতো কেন? একাধিক সুযোগ-সুবিধা লাভের পরও নারীরা পরাধীন কেন?
কারণ নারী নিজেকে মানুষ নয়, ‘মেয়েমানুষ’ হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করে। নারীমুক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নারীর চিন্তা-চেতনার মুক্তি ঘটানো। যে মুক্তি অন্য কেউ করে দেবে না, যে মুক্তি নিজেকে করে নিতে হবে।
লিঙ্গবৈষম্য রোধেও সবচেয়ে বড় বাধা হলো নারী। বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও লিঙ্গবৈষম্য রোধ তখনই সম্ভব যখন বাংলাদেশের নারীরা মনন ও চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে মুক্ত হতে পারবেন। নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব।’ এই শিক্ষিত মা মানে একাডেমিক শিক্ষায় দীক্ষিত মা নন, যদি তা-ই হতো তাহলে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সেই ঐতিহ্যের বিলুপ্তি বহুকাল আগেই ঘুচে যেত। শিক্ষিত মা মানে চিন্তা-চেতনার দিক থেকে নিজেকে মুক্ত করে ভালো-মন্দ বোধ আনা।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Gender equality today for sustainable
tomorrow’. অর্থাৎ ‘টেকসই আগামীর জন্য জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য।
উল্লিখিত বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে চাই, এটি বাংলাদেশের জন্য আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখার মতো। যে স্বপ্ন বাংলাদেশী নারীসমাজের দেখার সাহস আছে কিনা সন্দেহ, যেখানে দেশের প্রতিটি গৃহে চর্চা হয় লিঙ্গবৈষম্যের। যেখানে লিঙ্গসমতা চাঁদ ধরার মতো।
দেশের বর্তমান নারীবাদীদের কাছে প্রশ্ন—এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় বাংলাদেশের সমাজের জন্য কতটা যুক্তিসংগত? পাশাপাশি বাংলাদেশ কি নারী দিবস পালন করার সক্ষমতা রাখে?
সাদিয়া আরেফিন: গবেষক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ










