স্বাধীন
বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি চেতনা ও একটি জাতীয় অধ্যায়ের নাম। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ—এ দুটি নাম একে অন্যের পরিপূরক, যা আজ ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত। একটি ছাড়া অন্যটি যেন নিষ্প্রাণ, অনুজ্জ্বল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের পথ ধরেই বাঙালি জাতি তাদের অর্জিত বিজয় অর্জন করে। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে এ দেশ সব প্রকার অন্যায় শাসন, শোষণ, নিপীড়ন থেকে মুক্তিলাভ করে, অর্জন করে স্বাধীনতা। হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো বঙ্গবন্ধু পুরো জাতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেন। তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি। রাজনীতিকে তিনি সৃষ্টিশীল চেতনা দিয়ে নিজের হাতে আকার দিয়েছেন।
বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অধিকারী ছিলেন। শোষক ও স্বেচ্ছাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খল থেকে তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে মুক্ত করে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। এ মুক্তির সংগ্রামে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করেছিলেন। পাকিস্তানি শোষক চক্রের বিরূপ মনোভাব বুঝতে পেরে তিনি ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকেই স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার।
বঙ্গবন্ধু সেই লক্ষ্যে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছেন এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে ছিনিয়ে আনেন মহান বিজয়। তার পর থেকে তিনি যুক্ত হন আরেক সংগ্রামে, যার মূল মন্ত্র ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠন। তিনি এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের নেতা ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন সারা বিশ্বের নেতা। সারা পৃথিবীর শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। তাই তো তিনি বিশ্বনেতা। বিশ্বসভায় বাংলাদেশের একমাত্র ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আত্মনিয়োগ করেছিলেন জাতি গঠনে। দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক নিরাপত্তাসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় সেক্টরের মতো পর্যটন শিল্প নিয়েও তার পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ঘুরেছেন। তিনি এ দেশের অপার সম্ভাবনা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বারবার। তাই তো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা লাভের পর তিনি পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন এ দেশের উন্নয়নের জন্য অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে পর্যটন শিল্প।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু এর সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দেন। তাই পর্যটনকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম উৎসে পরিণত করতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল তিনি সুইজারল্যান্ডের মতো করে বাংলাদেশকে নির্মাণ করবেন। কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল তিনি কক্সবাজারকে এশিয়ার ভিয়েনা হিসেবে তৈরি করবেন। সেই লক্ষ্যে তিনি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঝাউবনের গোড়াপত্তন করেছিলেন। এছাড়া তিনি সমুদ্রের অমিত সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে উত্তরণে ১৯৭৪ সালে সমুদ্রসীমা আইন প্রণয়ন করছিলেন। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পর্যটন শিল্পেরও জনক।
১৯৭২ সালের নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুয়াকাটা ভ্রমণ করেন। তখন তিনি এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে তৈরি করার জন্য তিনি নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এ দেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এটির প্রসার ঘটাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি পাল্টে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জন্য এক কলঙ্ক বয়ে আনে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লেখক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্মস্থান ও কর্মময় জীবন অবলোকন করার জন্য অনেকে ভ্রমণ করেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মহাত্মা গান্ধী, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলাসহ আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মস্থান দেখতে পর্যটকরা ভ্রমণ করেন। একইভাবে আমরাও আমাদের দেশের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় জীবন সারা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে পারি। বঙ্গবন্ধুর জীবনী সম্পর্কে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা, বিভিন্ন বই বের করে তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে রয়েছে এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া নিয়ে একটি পর্যটন এলাকা তৈরি করা যেতে পারে।
বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবন, শৈশব, কারাগারের জীবনসহ সব ক্ষেত্র তুলে ধরা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কো ডকুমেন্টারি বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে মনোনীত করেছে। এসব বিষয় আমাদের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। জাতির পিতার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। জাতির পিতার কর্মজীবন সম্পর্কে জানতে পৃথিবীর অনেক দেশের পর্যটক আগ্রহী। এজন্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। এর মধ্য দিয়ে এই মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও জীবন সম্পর্কে সারা পৃথিবীর মানুষ জানতে পারবে।
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া: অধ্যাপক ও পরিচালক, এমবিএ (ইভনিং) প্রোগ্রাম, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










