যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তিতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের অঙ্গীকার এ বছরে আসন্ন আরেকটি জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন কনফারেন্সের (কপ২৬) পরিপ্রেক্ষিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অর্থবহ বৈশ্বিক নীতির জন্য নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তবে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু উদ্বায়িতার ঘটনা বেড়ে চলা, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় বনে নজিরবিহীন আগুন, ক্যালিফোর্নিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় খরা, হারিকেন ও ঘূর্ণিঝড় বৃদ্ধি প্রভৃতি ঘটনা বলে যে ধরিত্রীর উষ্ণতা বৃদ্ধিকারী গ্রিনহাউজ গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণ কমাতে আমাদের দ্রুতই পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন বৈশ্বিক চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে এখনো ভয়াবহ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। সেগুলো যথাসম্ভব দ্রুত দূর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা সাধারণত জিএইচজি নিঃসরণ কমাতে কর আরোপের পদক্ষেপের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের কর প্রায় নিশ্চিতভাবে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক পরিবর্তনে বাধা সৃষ্টি করবে, যার কারণে তাদের ওপর কর আরোপ দ্রুতই ফ্রি-রাইডার বা ন্যায্যতা নিশ্চিতের সমস্যায় রূপ নিতে পারে বলে আলোচনা করা হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো যখন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে কঠোর পরিশ্রম করছে, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ পুরোপুরি পরিত্যাগের জন্য তাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে উগান্ডার মতো উন্নয়নশীল দেশ উল্লেখ করেছে যে ২০১৭ সালে মাথাপিছু কেবল শূন্য দশমিক ১৩ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকারী কোনো দেশকে যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরবের মতো দেশের একই বোঝা বহন করা গভীর অসমতামূলক, যাদের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ যথাক্রমে ১৬ ও ১৭ দশমিক ৫ টন।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল উপায় হবে প্রতিটি দেশকে একই ধরনের প্রণোদনা প্রদান। ভারতের যেমন অধিক ময়লাযুক্ত ও কার্বন নিঃসরণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা উচিত নয়, তেমনি ইউরোপেরও সেই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অচিরেই বন্ধ করা দেয়া উচিত, যা এরই মধ্যে তাদের রয়েছে। তবে প্রতিটি দেশকে নিজস্ব উপায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথ বেছে নিতে হবে, কিছুটা কর আরোপের মাধ্যমে আর বাকিটা বিধিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে। তারপরের প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক প্রয়োজনের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের প্রাধিকারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হবে, সেটি নিশ্চিত করা। যাতে আমরা আমাদের ধরিত্রীকে বাঁচাতে পারি।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের অর্থনৈতিক সমাধান খুব সহজ। আর তা হলো, একটি বৈশ্বিক কার্বন প্রণোদনা ব্যবস্থা (জিসিআই) প্রবর্তন। যেসব দেশ বৈশ্বিক গড় মাথাপিছু পাঁচ টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, তারা জনসংখ্যা ও জিসিআই অনুপাতে মাথাপিছু বাড়তি কার্বন নিঃসরণ হিসাব করে বার্ষিকভাবে গ্লোবাল ইনসেনটিভ ফান্ডে অর্থ প্রদান করবে। যদি জিসিআই প্রতি টন ১০ ডলার হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং সৌদি আরব ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে।
বৈশ্বিক মাথাপিছু গড় কার্বন নিঃসরণ হারের নিচে থাকা দেশগুলো একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাবে (যেমন উগান্ডা প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার পাবে)। এভাবে প্রতি অতিরিক্ত টনের জন্য (পড়ুন কার্বন নিঃসরণ) প্রতিটি দেশ মাথাপিছু ১০ ডলারের একটি কার্যকর লোকসানের মুখোমুখি হবে—হোক সেটি উচ্চ, নিম্ন বা গড় পর্যায়ের কার্বন নিঃসরণ। তখন আর ফ্রি রাইডার সমস্যা থাকবে না। কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে উগান্ডাও একই প্রণোদনা পাবে।
জিসিআই ন্যায্যতা সমস্যাও সমাধান করবে। নিম্ন কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো (যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দরিদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে নাজুক দেশ) একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবে, যা তাদের জনগণের অভিযোজনে সাহায্য করবে। সময়ান্তরে যদি জিসিআই বাড়ানো হয় তাহলে সামষ্টিক ক্ষতির জন্য প্রদানকৃত অর্থের পরিমাণ প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে, যা ২০০৯ সালে কপ১৫ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল। সন্দেহ নেই, জিসিআই একটি সম্ভাব্য উপায়ে অর্থ প্রদানের দায়িত্ব ন্যস্ত করবে। কারণ বড় কার্বন নিঃসরণকারীরা সাধারণত অর্থ প্রদানে ভালো অবস্থানে থাকে।
আবার জিসিআই অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাকেও বাধাগ্রস্ত করবে না, নিরুৎসাহিত করবে না। নিজস্ব প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণভাবে কোনো দেশ যা করে, এটি তারও স্বীকৃতি প্রদান করবে। রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় কার্বন কর আরোপের পরিবর্তে কোনো দেশ কয়লার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিমালা আরোপ করতে পারে, জ্বালানি
উপকরণের (এনার্জি ইনপুট) ওপর কর আরোপ করতে পারে। আর তৃতীয় উপায় হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করা। প্রতিটি দেশ নিজস্ব পথ বেছে নিলেও জিসিআই নৈতিক প্রেষণা বেগবান করবে, যা এরই মধ্যে দেশীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ গ্রহণ করছে।
জিসিআইয়ের সৌন্দর্য এর সহজতা ও আত্ম-অর্থায়নকারী কাঠামোর মধ্যে নিহিত। তবে এতে কীভাবে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ হিসাব করা হবে, সেই বিষয়টি সমন্বয় করতে হবে। আমদানীকৃত পণ্য বা উপকরণে নিহিত কার্বন নিঃসরণের হার নির্ণয়ে কিছুটা হিসাবের প্রয়োজন হবে। সেগুলো আমদানিকারকের কার্বন নিঃসরণ টালিতে যোগ করতে হবে এবং রফতানিকারকের টালি থেকে বাদ দিতে হবে।
অবশ্য অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ১০ ডলারের জিসিআইকে বেশ কম বলে বিবেচনা করছেন। তবে বড় যুক্তি হলো, ছোট পরিমাণ দিয়ে কর্মসূচিটি শুরু করাটাই সর্বাগ্রে জরুরি। এরপর জিসিআই সহজেই একটি সাধারণ চুক্তি বা সমঝোতায় উন্নীত হতে পারে (কিংবা কমানো হতে পারে, যদি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর কিছু ঘটে)। তবে ক্রমাঙ্কনের একটি প্রাথমিক সময়ের পর অনিশ্চয়তা এড়াতে কেবল প্রতি বছর বা তার কিছু সময় অন্তর অন্তর এটি পরিবর্তন করা যেতে পারে।
বিকল্প প্রস্তাবগুলো কী হতে পারে? কিছু শিল্পোন্নত দেশ কার্বন কর না থাকা দেশগুলো থেকে পণ্য বা উপকরণের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে একই কর প্রয়োগে একটি অভ্যস্তরীণ কার্বন করের পাশাপাশি একটি সীমান্ত-সমন্বয় করের পরিকল্পনা করছে। সীমান্ত কর অন্য দেশগুলোকে নিজস্ব কার্বন কর আরোপের দিকে উৎসাহিত করতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবে তা ন্যায্যতার উন্নয়ন ঘটাবে না। কিন্তু একটা আশঙ্কার বিষয় হলো ধনী আমদানিকারক দেশগুলো করের বোঝা দরিদ্র রফতানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। এটি সুরক্ষাবাদকে আরো বাড়াবে।
সত্যি বলতে কি, আন্তর্জাতিক বৈঠকগুলোয় আধিপত্য থাকা আমলারা এ প্রস্তাবকে ‘চমত্কার অথচ সহজ’ এই বলে বাতিল করতে চাইবেন। শক্তিশালী দেশগুলোই হলো আসলে বড় কার্বন নিঃসরণকারী। ব্যাপক বাজেট ঘাটতি ও বিপুল ব্যয়ের এ সময়ে খুব কম দেশই একটি বৈশ্বিক তহবিলে অর্থ প্রদান করতে চাইবে।
তবে জিসিআই আমাদের হাতে থাকা সর্বোত্তম অপশন। ধনী দেশগুলো যেহেতু অভ্যন্তরীণ অসমতার প্রতিকার করতে চেষ্টা করছে, সেহেতু তাদের
আন্তঃদেশীয় অসমতা নিয়েও কিছুটা ভাবনা-চিন্তা করা উচিত, মহামারী ও অসম টিকাদান কর্মযজ্ঞে যা কেবলই বাড়বে। উন্নয়নশীল দেশগুলো আজকে বিভিন্নভাবে নিজেদের পরিত্যাজ্য ভাবছে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে একটি ন্যায্য বৈশ্বিক প্রস্তাব তাদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করবে যে তারা অন্য ধরিত্রীতে বাস করে না; একই ধরিত্রীতে বাস করে। আর এই একমাত্র ধরিত্রীকে বাঁচাতে সবারই একটি বৃহত্তর দায়িত্ব পালন করা উচিত। জিসিআই ফান্ডে সবার অংশগ্রহণ আলোচ্য উদ্দেশ্য পরিপূরণে একটি কার্যকর উপায় হতে পারে বৈকি।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
রঘুরাম
রাজন:
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, শিকাগো বুথ স্কুল অব বিজনেসের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক এবং ‘দ্য থার্ড
পিলার: হাউ মার্কেটস অ্যান্ড দ্য স্টেট লিভ দ্য কমিউনিটি বিহাইন্ড’ বইয়ের লেখক
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










