দেশের বাজারে নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ১৭ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানকে দ্রব্যমূল্য এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হবে টাস্কফোর্সের অন্যতম কাজ। শুধু তা-ই নয়, বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানীকৃত পণ্যের শুল্ক ও কর ছাড় পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। এসবই ইতিবাচক উদ্যোগ কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বাজারে এর প্রভাব খুবই কম বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর আগে গঠিত টাস্কফোর্স দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তেমন প্রভাব রাখতে পারেনি। বাজার পরিদর্শন আর কিছু ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যা অতীতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে যথাসময়ে পণ্যের জোগান নিশ্চিত করার মাধ্যমে কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব। এবারে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। শুধু বিশেষ সময়ে নয়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে ৩৬৫ দিন সক্রিয় থাকতে হবে। 

বাজারে চালের দাম বাড়তি হলে দেখা যায় অন্যান্য পণ্যেরও দাম বাড়ছে। এখন নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী; চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুনের দাম বেড়েই চলছে। এ বছর সবজি, মাছ, মুরগি, খাসি ও গরুর মাংস, ডিম ইত্যাদি পণ্যেরও দাম চড়া রয়েছে। পরিস্থিতি যে খুবই খারাপ তার প্রমাণ মেলে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের সামনে লাইন দেখে। এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে শহরের চাকরিজীবী পরিবারের গৃহিণী ও অন্যান্য সদস্যকে ট্রাক থেকে পণ্য নিতে লাইন দিতে। অর্থনীতির হিসাবে গড় আয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষের আয় বাড়েনি, ক্রয়ক্ষমতা বরং হ্রাস পেয়েছে। যেহেতু দ্রব্যমূল্য বাড়তি, টাকার মান কমছে, ফলে মানুষের প্রকৃত আয়ও কমতির দিকে। এ অবস্থায় কেবল পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মানুষ। করোনাকালে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীও পরিস্থিতির অবনতির কথা স্বীকার করেছেন।

অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বাজার। সরকার কেবল টিসিবির মাধ্যমে এদের মজুদদারিসহ মূল্যবৃদ্ধির কৌশল ঠেকাতে পারবে না। এজন্য আরো ব্যাপক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন চাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের যে হিসাব দেয়া হয়, তা সম্ভবত বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্বিতীয়ত, বার্ষিক কী পরিমাণ চাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হবে, তার সঠিক হিসাব করে আমদানির ব্যবস্থা করা দরকার। তৃতীয়ত, বিশেষ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে খাদ্যপণ্য আমদানিতে করের হার কমাতে হবে। চতুর্থত, মজুদদারির বিষয়ে কড়া তদারকি বজায় রাখতে হবে। পঞ্চমত, বাজারে মূল্য নির্ধারণ ও তা স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। সরকারও একটি কার্যকর সরবরাহ চেইন তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি নীতির ক্ষেত্রেও ভ্রান্তি দেখতে পাচ্ছেন অনেকে, যা দূর করা প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর নজরদারির কাজটি করে ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) ও বিচার মন্ত্রণালয় (ডিওজে)। এর মধ্যে কংগ্রেসের কাছে এফটিসির জবাবদিহির বিধান রয়েছে। ইউরোপে রয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের পাশাপাশি ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) বিভিন্ন দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। কমিশনের ক্ষমতা রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেয়ার, যারা আবার আদালতে আপিল করতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো গুটিকয় অস্পষ্ট আইন দ্বারা পরিচালিত। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুসৃত হয় শারম্যান অ্যাক্ট ও ট্রিটি অব রোম। ১৮৯০ সালে প্রণীত শারম্যান অ্যাক্ট মাত্র ৭৬৯ শব্দের। আদালতে এ আইনগুলোর ব্যাখ্যা একেক সময় একেক রকম হতে দেখা গেছে। সারা বিশ্বেই বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংস্থাগুলো ভোক্তার কল্যাণকেই তাদের একমাত্র লক্ষ্য বলে প্রচার করে। মোটাদাগে অনিয়মের জন্য শাস্তি বিধান, একাধিক প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণে তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়াকরণের লক্ষ্যে শক্তির অপপ্রয়োগ রোখা এসব সংস্থার কাজ। এক কথায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো একই সঙ্গে সহায়ক, পুলিশ ও বিচারকের ভূমিকায় থাকে। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা টাস্কফোর্সকে বাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে হবে। একেক পণ্যের দাম একেক কারণে বাড়ে। ফলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আমদানীকৃত পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, ঠিক একই পথ স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। প্রত্যাশা থাকবে বাজার যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে টাস্কফোর্স কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। 

রমজান এলে দেখা যায়, প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেট নামিয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে তদারক করেন। কোথাও অতিরিক্ত মূল্য চাওয়া হচ্ছে কিনা তা দেখা হয়। দোকানগুলোয় মূল্যতালিকা রাখা হলো কিনা এবং সে অনুযায়ী দাম রাখা হচ্ছে কিনা তা দেখে এবং কিছু জরিমানা করে। বাস্তবতা হচ্ছে, মূল্য নিয়ন্ত্রণের এ পদ্ধতি বলতে গেলে কাজে লাগে না। আসল ব্যাপারটা ঘটে সরবরাহের পর্যায়ে। এক ডজন আমদানিকারক যদি একসঙ্গে হাত মেলান তাহলে সহজেই তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে পারেন। এটাই সরকারকে দেখতে হবে। যারা আমদানি করেন তাদের আমদানি ব্যয় কেমন এবং তারা কোনো কারসাজি করছেন কিনা, বেআইনি কিছু করছেন কিনা, সেটাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সামনের দিনগুলোয় আরো বেশি পণ্যসামগ্রীর উচ্চমূল্য ঘটতে পারে। কারণ মূল্যস্ফীতি এখন একটা বৈশ্বিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বিশ্বে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে, দেশে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, কাঁচামালের দাম বাড়ছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ হচ্ছে বা হবে হবে অবস্থা চলছে, তেলের দাম বাড়ছে, আমদানিকারকদের আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। অনেকে সলিড অ্যাসেট কিংবা ফরওয়ার্ড মার্কেটে অপরিশোধিত তেলের মতো পণ্য ধারণ করার দিকে ঝুঁকছেন। এসব কারণে অগ্রসর অর্থনীতিগুলোয়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ওপরের দিকে রয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি এখন ওপরের দিকে। একসময় প্রায় ‘জিরো ইনফ্লেশন’ বা শূন্য মূল্যস্ফীতি ছিল। বৈশ্বিক এ প্রবণতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। কারণ বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয় বা বিচ্ছিন্ন কোনো অর্থনীতিও নয়। এটা ঠিক যে সামনের দিনগুলোয় হয়তো আমাদের উচ্চতর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বসবাস করার চিন্তা করতে হবে এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

সমস্যা হচ্ছে, এরই মধ্যে আমাদের যে মূল্যস্ফীতি ঘটে গেছে, এ পরিস্থিতিটা কীভাবে মোকাবেলা করা হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজে নিচের দিকে থাকা মানুষদের বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত, তাদের অনেকের আয় খুবই কম বা অনেকে সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে চলছে। এর অর্থ হচ্ছে অর্থনীতিতে যে পরিমাণ আয় উৎপাদন হচ্ছে, তার সঙ্গে সমাজের এই শ্রেণীর মানুষের কোনো সংযুক্তি নেই। অর্থাৎ তাদের কাছে আয়টা প্রবাহিত হচ্ছে না। এখন মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের দুর্ভোগ কীভাবে কমানো যায়, সেদিকে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। এ অবস্থায় টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহের যে ব্যবস্থা করেছে, তা নিঃসন্দেহে ভালো পদক্ষেপ। বাজার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব দরিদ্র লোকের জন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে, তাদের সরকারি সহায়তা দিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হচ্ছে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি আরো বাড়ানো। এটাকে উপজেলা পর্যায়ে নিতে হবে, গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে নিতে হবে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে কোথাও যাতে ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির শিকার না হন, সেদিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি তেল-ডাল-চিনিসহ বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারে যাতে মুনাফালোভী সিন্ডিকেট কালো হাত বাড়াতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে অনেক উপাদান তথা টুলস আছে, যেগুলোর অধিকাংশই প্রয়োগ করা হয় না অথবা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। টিসিবি এর মধ্যে অন্যতম। সরকারের এসব অস্ত্র পুরনো হয়ে গেছে। এর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় এটা স্পষ্ট যে এখানে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ জায়গায় সরকারের জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বাজার তদারকি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পণ্যের সরবরাহ যাতে যথেষ্ট থাকে, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। একচেটিয়া প্রভাব খাটিয়ে বা পণ্যের অবৈধ মজুদের মাধ্যমে কেউ যাতে কোনো পণ্যের বাজার অস্থির করতে না পারে, সেজন্য নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যেকোনো সংকটে অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা যাতে অসাধু পন্থা অবলম্বনের সুযোগ না পায়, সেজন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। রমজানে যেসব পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কিছু আমদানিকারক ও বিক্রেতা কারসাজি করে সেসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। এবার যাতে তেমনটি না ঘটে সেজন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।