বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ভারত সরকার আরো পাঁচ বছরের জন্য বাড়াতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশটির ডাইরেক্টর জেনারেল অব ট্রেড রেমিডিস (ডিজিটিআর) সানসেট রিভিউ শুরু করেছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছে বলে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান দুটি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়। প্রায় তিন দশক ধরে প্রধানত এ চালক দুটিই বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উন্নতি করতে হলে প্রবৃদ্ধির নতুন নতুন চালক অন্বেষণ করা জরুরি। সে রকম একটি চালক হতে পারে ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে এককালের সমাদৃত পাট। কিন্তু ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বাংলাদেশের পাট শিল্প বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এতে রফতানিতে প্রভাব পড়েছে। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সানসেট রিভিউ করছে ভারত। মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন না হলে নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত পাঁচ বছর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্ক আরোপ কার্যকর থাকে না। নতুন করে আর কোনো ধরনের পর্যালোচনার প্রয়োজন হতো না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শুল্ক প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সরকার ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করা প্রয়োজন।
পাটপণ্যে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপের মেয়াদ পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে এটি পুনরায় বহাল না করার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো আলোচনা ও পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো এখনো নেয়া হয়নি। ভারত যেহেতু ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে, সেহেতু এ কাজে তাদের দক্ষতা-যোগ্যতা অনেক বেশি, তাদের কৌশলও অনেক শক্তিশালী। সর্বোপরি ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপের পুরোটা একটি আইনি প্রক্রিয়া, যা কিনা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি-বিধান মেনে করতে হয়। কোনো দেশ নিজের মনগড়া প্রক্রিয়ায় এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। আবার ডব্লিউটিওর আওতায়ই এ ধরনের পদক্ষেপ আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা ও প্রতিকার চাওয়া যায়। তবে তা সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। ভারত এ বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। কাজেই ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপের ক্ষেত্রে দেশটি যথাসম্ভব আইনি ফাঁকফোকর এড়িয়ে এ শুল্কারোপের মেয়াদ বাড়ানোয় সচেষ্ট। তার পরও পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অসংগতি থেকে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। সেগুলো চিহ্নিত করাই এখন বাংলাদেশের প্রধান কাজ হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ডব্লিউটিওর বিধানে ডাম্পিং সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং ডাম্পিংয়ের প্রতিক্রিয়ায় আমদানিকারক দেশের সমজাতীয় পণ্য ও তার বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা প্রতিবিধানের নিয়মনীতি প্রদান করা হয়েছে। এ প্রতিবিধানের প্রধান শর্ত দুটি: রফতানিকারক দেশ সত্যিই বা নিশ্চিতভাবে ডাম্পিং করছে এবং এই ডাম্পিংয়ের ফলে আমদানিকারক দেশের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ডব্লিউটিওর এগ্রিমেন্ট অন অ্যান্টি-ডাম্পিং বা ডাম্পিং-নিরোধী চুক্তিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। এ নির্দেশনা অনুসারে, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক তখনই আরোপ করা যাবে, যখন তদন্তে সুস্পষ্টভাবে এটা চিহ্নিত হবে যে—(ক) ডাম্প করা পণ্য আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে; (খ) এ ধরনের আমদানি সমজাতীয় স্থানীয় পণ্যের দাম কমিয়ে দিয়েছে এবং (গ) এর ফলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে। অর্থাৎ ডাম্পিংয়ের ফলে যে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা ক্ষতির হুমকির মুখে রয়েছে, এ কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতের তদন্ত পরিচালনা ও ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপের বিপরীতে বাংলাদেশ কি যথাযথ পদক্ষেপগুলো নিয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কিছুটা হতাশই হতে হয়। কেননা বাংলাদেশের দিক থেকে যেটুকু করণীয়, তা ঠিকভাবে করা হয়নি। বিশেষ করে অভিযুক্ত পক্ষ বা রফতানিকারকরা বোধহয় বুঝে উঠতে
পারছেন না তাদের কী বা কীভাবে পুরো বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই ভারত সরকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করা দরকার। নইলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের পাটপণ্য বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে।
বাংলাদেশী কোম্পানি রহিমআফরোজ ভারতে ব্যাটারি রফতানির শুরু থেকেই নানা ধরনের বাধার মুখে পড়ে। বিশেষত ভারতের কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের বাজার সংকুচিত হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে এ বাধা তৈরি করতে থাকে ভারতীয় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সহায়তায়। শেষ পর্যন্ত ভারতের ডিজিটিআর ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপ করে। এর বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করে রহিমআফরোজ। তবে আপিলেও এ শুল্ক বহাল থাকে। পরে বিষয়টি ডব্লিউটিও পর্যন্ত গড়ায়। আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে বিষয়টি উত্থাপনের আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে ভুলটি ধরিয়ে দিলে
তারা সেটি মেনে নিয়ে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়ার আশ্বাস দেয় এবং পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহারও করে নেয়। পাটপণ্যের ক্ষেত্রে অনেকেই সরকারকে এ পরামর্শ দিলেও সেটি আমলে নেয়া হয়নি। এখানে বাংলাদেশের কিছু দুর্বলতা ছিল বলেই ধরে নেয়া যায়। এ অবস্থায় ভারতীয় সরকার নতুন করে যে কর্মপ্রক্রিয়া শুরু করেছে তা আমলে নিয়ে দ্রুতই প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন, যাতে বিদ্যমান অবস্থাতেই এটি রহিত করা যায়।
অনেকে অবশ্য ডব্লিউটিওর মাধ্যমে এর মীমাংসার কথা বলছেন। ডব্লিউটিওর মাধ্যমে ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপের প্রতিকার চাইতে গেলে যথেষ্ট দক্ষতা-সক্ষমতা প্রয়োজন। বেসরকারি খাত ও সরকারের মধ্যে ভালো বোঝাপড়াও প্রয়োজন। সর্বোপরি বাংলাদেশের পক্ষে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দক্ষ লোকবল গড়ে তোলা জরুরি। তবে পাটের ওপর ভারতীয় ডাম্পিং-নিরোধী শুল্কারোপের ফলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে বাংলাদেশ কেন এত দিন এদিকে মনোযোগ দেয়নি? কেন ট্যারিফ কমিশনকে এ বিষয়ে দক্ষ করে তোলা হয়নি? পাট রফতানিকারকরা অভিযোগ করেছেন যে ট্যারিফ কমিশন থেকে তারা যথাযথ সহায়তা ও পরামর্শ পাননি বা পাচ্ছেন না। এটা ঠিক রফতানিকারকরা যেভাবে চান, সেভাবে হয়তো ট্যারিফ কমিশনের পক্ষে সহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একটা বড় ধরনের ঘাটতি যে কমিশনে রয়ে গেছে, তা স্পষ্ট। অথচ এই ট্যারিফ কমিশনই একাধারে সুরক্ষা (সেফগার্ড), অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে।
২০১৭ সালে ভারত হঠাৎ করে বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রফতানির ওপর আরোপ করে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক। এর পরিমাণও কম নয়—বাংলাদেশের প্রতি টন পাটপণ্যে ৩৫১ দশমিক ৭২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে দেশটি। এর পেছনে যুক্তি ছিল বাংলাদেশ ভারতের স্থানীয় বাজারের চেয়ে কম দামে পাট রফতানি করছে। ফলে সে দেশে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয় এবং সমূহ বিপাকে পড়েন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তদুপরি এর ফলে দেশীয় কৃষক এবং শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন দারুণভাবে। কেননা এক্ষেত্রে ভারতই বাংলাদেশের প্রধান ক্রেতা। এর পর থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বহু দেন-দরবার ও বৈঠক করেও সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি এখন সে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে তাই কালক্ষেপণ ও উদাসীনতার সুযোগ নেই। প্রত্যাশা থাকবে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় যথাযথ উদ্যোগ নেবে, যাতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মেয়াদ আর না বাড়ে। বাংলাদেশের পাট শিল্পের অবস্থা খুব একটা সুখকর নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, অর্থের অভাবে সেগুলো চালানো যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতও হিমশিম খাচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে। এ পরিস্থিতিতে ভারত সরকার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়ালে বাংলাদেশের পাট শিল্প আরো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। তাই অনতিবিলম্বে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে শুল্ক প্রত্যাহারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্ভাব্য সব উপায় অনুসন্ধান করা চাই। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের রফতানিকারক ও ভারতীয় উৎপাদকদের মধ্যে যোগ্যতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ফিরে আসে।
এমনিতেই নানা প্রতিবন্ধকতায় বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত, এসব ট্যারিফ, প্যারাট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধার সঙ্গে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও পাল্টা পদক্ষেপ মিলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নিদারুণ উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছে। ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং কর বাংলাদেশের পাটপণ্য, মাছ ধরার জাল এবং হাইড্রোজেন পারঅক্সাইভ রফতানির বেলায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করেও ভারতকে রাজি করাতে পারেনি অ্যান্টি-ডাম্পিং কর প্রত্যাহার করে নিতে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক যথাযথভাবে বিকশিত হতে পারছে না। দেশের পাট শিল্প ও রফতানিকারকদের স্বার্থের বিষয় বিবেচনা করে এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বিকল্প বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের পাট শিল্প ও পাটপণ্যের ভারত নির্ভরতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সারা বিশ্বে পরিবেশগত জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সিনথেটিক পণ্যের বদলে পাটের মতো প্রাকৃতিক তন্তুজাত পণ্যের কদর ও চাহিদা বেড়ে চলেছে। পাটপণ্যের উন্নয়ন, বহুমুখীকরণ এবং নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনা এখনো সম্ভব। সেই সঙ্গে পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারকে আরো বিস্তৃত করার পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বিশেষ জরুরি ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে হবে। মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে রফতানিকারকরা যাতে বিকল্প বাজারে পণ্য রফতানির সুযোগ পান, সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।










