সরকার ২০০৯ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর বিদ্যুতের ঘাটতি দ্রুত মেটাতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়। নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় বেসরকারি খাতও উৎসাহিত হয় এ খাতে বিনিয়োগে। এতে সংকট মিটলেও বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ৫৬ শতাংশই আসছে ব্যক্তি খাত তথা ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস (আইপিপি) থেকে। ব্যক্তি খাতের নির্ভরশীলতা বাড়ায় এ বাবদ ব্যয়ও বাড়ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল ধীরে ধীরে আইপিপির নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরকারি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হবে। কিন্তু প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মিত না হওয়ায় বিপিডিবির বোঝা বাড়ছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে আইপিপিকে ২৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বেশি। বিষয়টি উদ্বেগজনক বৈকি। এভাবে ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারের পক্ষে ভর্তুকি জোগানো ও জনগণের বাড়তি অর্থ প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়বে। হতাশার বিষয় হলো সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিদ্যুতে ব্যয় কমার বদলে বাড়ছে। অবস্থা উন্নয়নে নির্মিতব্য ব্যয়সাশ্রয়ী সরকারি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং তা চালু করা আবশ্যক। একই সঙ্গে ব্যয়সাশ্রয়ী সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় লোডশেডিং শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের আগে এই শতভাগ বিদ্যুতের লক্ষ্য পূরণে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও ছিল। এর মধ্যে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যুতের লাইন নেয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে বিদ্যুতের বর্ধিত চাহিদার জোগান দেয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন স্থাপনসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বিদ্যুৎ বিভাগকে এগোতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে সাফল্যের দৃষ্টান্তও রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ক্রয়বিধি অনুসারে দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা বেশ কঠিন ছিল। এজন্য আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন পাস করা হয়। এ আইনের পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধুম পড়ে যায়। উৎপাদনও দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকের বেশি মালিকানা বেসরকারি খাতের। বিদ্যুৎ এমনই একটা পণ্য, যা মজুদ বা সংরক্ষণ করা যায় না। যখন যতটুকু উৎপাদন হয়, তখন ঠিক ততটুকুই সরবরাহ হবে। বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস বসে থাকার কারণে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় উৎপাদনক্ষমতার অনেকাংশ অলস পড়ে থাকছে। বিদ্যুৎ না কিনেই চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রের ভাড়া বাবদ বেসরকারি মালিকদের পেমেন্ট দিতে হচ্ছে। বেসরকারি খাতে নতুন নতুন আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। এতে সরকারের খরচ বাড়ছে, যা পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। মহাপরিকল্পনা গ্রহণের সময় করা প্রক্ষেপণগুলোর সঙ্গে পরে বাস্তবতার ফারাক দেখা গিয়েছে বিস্তর। ফলে এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা হলেও দুর্বলতা থেকে গিয়েছে সঞ্চালন ব্যবস্থায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে নেয়া পরিকল্পনাগুলো খুব একটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। সময় এসেছে বাস্তবভিত্তিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন, যেখানে ব্যয় সাশ্রয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। সরকারের আর্থিক চাপ মেটাতে ব্যয়সাশ্রয়ী সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ জনগুরুত্বপূর্ণ উপযোগ হওয়ায় সব দেশেই সরকারি সক্ষমতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়, যাতে জনগণের কাছে সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায়। ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ লাখ ৯২০ মেগাওয়াট। তার মধ্যে সরকারি সক্ষমতাই অর্ধেকের বেশি। দেশটি সেটিকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাচ্ছে। চীনেও একই অবস্থা। দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭৭ লাখ গিগাওয়াট। এ সক্ষমতার বড় অংশই সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ খাত কিছুটা উদারীকরণ করা হলেও সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা কোনোভাবে বসিয়ে রাখেনি। এ সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাচ্ছে দেশটি। ব্যতিক্রম নয় পাকিস্তানও। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এখন আইপিপির অংশ ৫৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও দেশটি সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বাদ দেয়নি। বরং সেগুলোকে আরো দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। ওইসব দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়কালে (২০২১-২৫) বিদ্যুৎ খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অভিজ্ঞতার আলোকে, সেই সঙ্গে কভিড-পরবর্তী বাস্তবতার নিরিখে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনাগুলো সাজানো প্রয়োজন। দেশের শতকরা প্রায় ৩৭ ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো ৪০ শতাংশের কম দক্ষতা মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অদক্ষতার বিষয়ে নজর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি মিশ্রণের ক্ষেত্রে বেশকিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ খাতের যে চাহিদা তার একটি যৌক্তিক প্রক্ষেপণ প্রয়োজন। আবাসিক ও শিল্প খাতের চাহিদাকে ও ভবিষ্যৎ চাহিদার শ্লথ প্রবৃদ্ধিকে বিবেচনায় রেখে চাহিদা প্রক্ষেপণ করতে হবে। সাম্প্রতিক সময় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তাড়াহুড়ো না করে সুস্থিরভাবে পরিকল্পনা করার সময় সরকারের হাতে রয়েছে। জ্বালানি মিশ্রণের জন্য অদক্ষ ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে বন্ধ করা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে যেতে হবে।

বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে নির্ভরশীলতা এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উৎপাদন খাতে বেসরকারি ও বিদেশী খাতের অংশীদারিত্ব থাকতেই পারে। তবে অবশ্যই এতে সরকারের প্রাধান্য থাকতে হবে। বর্তমানে দেশে ৫৫ ভাগ বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা সরকারের হাতে। আর বেসরকারি খাতে ৪৫ শতাংশ। আইপিপির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে এর ঝুঁকি টের পেয়ে কয়েক বছর ধরে পাকিস্তান ক্রমান্বয়ে সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বেসরকারি বিদ্যুতের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। সরকারি পর্যায়ে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় সেগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অর্থ না পাওয়ায় নাকি বেশ কয়েকটি সরকারি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। সরকারি খাতে উৎপাদন তেমন একটা হয়নি। কারণ সরকারিভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে। অর্থায়নও একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। ফলে সরকারকে বেসরকারি খাতের দিকে ঝুঁকে পড়তে হচ্ছে। বিপিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে ক্রমে ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে উৎপাদন বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি খাতের আধিপত্য বেড়ে গেলে তারা যেকোনো সময় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারকে বাধ্য করতে পারে। তাহলে সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। এটা এক ধরনের জিম্মিদশা। এসব কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ সরকারের হাতে থাকা আবশ্যক।

বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। গ্রামকে শহরে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ প্রতিশ্রুতি পূরণে অবশ্যম্ভাবীভাবেই বিদ্যুতের প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ছাড়া গ্রামকে শহরে পরিণত করা যাবে না। কাজেই সরকারকে অধিক পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সাশ্রয়ী ও বিকল্প পদ্ধতিতে কীভাবে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা চিন্তা করতে হবে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি কিংবা আমদানি করে খুব বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাশ্রয়ী প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে।