নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারো কারো বিরুদ্ধে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি নিরীক্ষা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। কেউবা আবার ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেমের (ডিবিএস) বাইরেও নিরীক্ষা করেছেন। এসব বিষয়ে আরো অধিকতর তদন্ত ও জালিয়াতি বন্ধে কঠোর হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে ১৭টি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষকের কার্যক্রম তদন্ত করে দেখতে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশকে (আইসিএবি) চিঠি দেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত জালিয়াতি রোধে এফআরসির পদক্ষেপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। এখান থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধিক তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দেয়াও প্রয়োজন। উদ্যোগটির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তালিকাভুক্ত বা তালিকাবহির্ভূত সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই আর্থিক প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে ব্যাংক ঋণ দেয়, রাজস্ব নির্ধারিত হয়, এমনকি শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কিছু কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে নানা কারসাজি ও অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছে। একাধিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির প্রমাণও মিলেছে। একটি আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন আবার ভিন্ন প্রতিবেদন দেখিয়ে রাজস্ব দিয়েছেন কম। শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিতেও আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির উদাহরণ মিলেছে। ভিন্ন উদ্দেশ্যে ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির সংস্কৃতি দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। অনেক কোম্পানি আছে, যারা অডিট না করেই অডিট রিপোর্ট জমা দিচ্ছে। কোম্পানি নানা কাজে ব্যবহারে একই বছরের জন্য তিন-চারটি পর্যন্ত অডিট রিপোর্ট জমা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এমন জালিয়াতির সঙ্গে আইসিএবির সদস্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বটে, কিন্তু তার প্রভাব সামান্যই। আর্থিক প্রতিবেদনকেন্দ্রিক জালিয়াতি রোধে এফআরসি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারপূর্বক আর্থিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে তদারকি সংস্থা। ডিবিএস সিস্টেমের সঙ্গে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আরজেএসসির সংযোগ স্থাপন করায় কোনো কোম্পানির পক্ষে জাল আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়া সম্ভব হবে না। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণও কমে আসবে। তাই সবার আগে ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। 

আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক নিরীক্ষকদের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। অনসাইট পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি অফসাইট সার্ভিল্যান্স, মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ও আর্থিক প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক। তারা চাইছে যেকোনো কেলেঙ্কারি ঘটে যাওয়ার আগে সেটি প্রতিরোধ করতে। বাংলাদেশের নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মগুলোর বিষয়ে অভিযোগ বেশ পুরনো। দেশে নিরীক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৫ সালে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন প্রণয়ন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) গঠন করা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত দেশের নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মূল দায়িত্ব ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) কাছেই রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা ফার্মের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও আর্থিক খাতে নিরীক্ষার বিষয়টি দেখভাল করছে। সার্বিকভাবে দেশের নিরীক্ষা মান এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে আসেনি। এক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও কাজে স্বচ্ছতা আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

নিরীক্ষকদের অনৈতিক আচরণের শিকার হয় ব্যাংক থেকে শুরু করে অনেকে। কখনো কখনো একই অডিটরের তিনটি হিসাব প্রতিবেদন একই বছর পাওয়া যায়। যারা এসব প্রতিবেদন দেয়, তারা অনেক সময় জানে না তারা কী দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যায় পড়তে হয়। এটা অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর। একটা ভুল প্রতিবেদনের জন্য অনেকেই ক্ষতির শিকার হতে পারেন। আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির কারণে ব্যাংক থেকে শুরু করে শেয়ারবাজার সর্বত্র ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ২০০২ সালে আমেরিকায় শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের ঘটনায় ওয়ার্ল্ডকমকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল। আরেকটি বিষয় হলো, অনৈতিকতার জন্য আমাদের দেশে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। যে কারণে অনৈতিক আচরণ চলতে থাকে। নৈতিকতার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি হয় যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে নৈতিকতার মান ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রক্ষা করতে পারে না। তাই নীতিনির্ধারণী মহলকে এসব বিষয়ে ভাবতে হবে।

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নিরীক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। নিরীক্ষকদের কাজের মূল্যায়নপূর্বক তাদের নম্বর দেয়ার ব্যবস্থাও আছে। এতে কোম্পানিগুলো নিরীক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নম্বর দেখে যাচাই করতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ নম্বরধারীদের ফিও বেশি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিরীক্ষকদের পেশাদারিত্ব দেখভালের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেরিতে হলেও সরকার এফআরসি গঠন করে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরুর পর বেশকিছু অনিয়ম উদ্ঘাটনের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, নিরীক্ষা কার্যক্রমের তদারকি আরো বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি আর্থিক ও ঋণ কেলেঙ্কারিতে নিরীক্ষকদের জড়িত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেকের আর্থিক নিরীক্ষার লাইসেন্স বাতিল করেছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বিএসইসি। এফআরসিও তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ ও তদন্ত করছে। এক্ষেত্রে নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সন্দেহ নেই যে দেশের নিরীক্ষা পেশার ও আর্থিক প্রতিবেদনের মানোন্নয়ন প্রয়োজন। এমন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিরল নয়, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা অসংগতিপূর্ণ এবং তা বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম নয়। সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। আইসিএবি কর্তৃক সনদ প্রদানকৃত নিরীক্ষা ফার্মগুলো যেসব আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে, সেগুলো যথাযথ কিনা, তার প্রত্যয়ন দেয়। এক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন দায়ী, তেমনিভাবে আইসিএবিরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণে কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষা পেশা চর্চার অনুমোদন দেয়ার সময় যেমন নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তেমনি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এসব প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শন করে সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এসব ক্ষেত্রে আইসিএবি কোনো অসংগতি পেলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ স্থগিতকরণ, সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষককে নিরীক্ষা কাজ থেকে বিরত রাখা, আর্থিক জরিমানাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি বা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের মতো অবৈধ সুযোগ নিয়েছে, তাদেরও শাস্তি দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ছাড়া ঋণ গ্রহণ বা রাজস্ব গ্রহণ না করার বিধান চালু করা হয়েছে। আমরা চাইব আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাই কার্যকর উদ্যোগ নেবে। আর্থিক খাতে জালিয়াতি বন্ধ ও টেকসইত্ব নিশ্চিতে এটি অনেক বেশি জরুরি। এতে কোম্পানিতে সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে। আর্থিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত ও তা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি করে বাড়তি অর্থ তুলে নেয়া এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনা ঘটেছে। এসব বন্ধে আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।