যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেন্টার ফর সাসটেইনেবল, হেলদি অ্যান্ড লার্নিং সিটিস অ্যান্ড নেইবারহুডসের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ শতাংশ হারে। শহর উপকণ্ঠে প্রবৃদ্ধির হার ৪৩ শতাংশ। সীমিত জায়গায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস হলেও নগরীর আবাসন, যোগাযোগ, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ সব অবকাঠামোই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে বসবাস করছে ঢাকাবাসী, যেগুলোয় নাগরিক পরিষেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বায়ুদূষণ, দূষিত পানি, তীব্র যানজট, অপ্রতুল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো নিয়ে ঢাকা বড় হচ্ছে। কোনো কোনো সমস্যা এতটাই প্রকট যে, সেগুলোর সমাধান আদৌ সম্ভব কিনা তা গভীর ভাবনার বিষয়। অথচ ঢাকা দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, জিডিপিতে এ শহরের অবদান ৩৬ শতাংশ। সুযোগ ছিল আরো কার্যকর ভূমিকা রাখার। কিন্তু যানজটসহ বিভিন্ন কারণে সেটি তো হচ্ছে না, বরং অর্থনীতির ক্ষত আরো বাড়ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রকল্পের উপযোগ নিয়ে এরই মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু নগর অবকাঠামোর বিস্তার নয়, পরিবেশ আইন যথাযথভাবে মেনে বিধি অনুযায়ী নগর অবকাঠামো নির্মাণ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, রাস্তা-ঘাটের সংস্কার, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, যানজট নিয়ন্ত্রণসহ সব ধরনের পরিবেশ দূষণ রোধ করে ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

ঢাকার ক্ষতি ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকরা যেমন করছে, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতাও ক্ষতি করছে। নগরকে অবাসযোগ্য করে তোলার মতো এমন আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড বিশ্বের আর কোনো শহরে চলে কিনা জানা নেই। অথচ তিন দশক আগেও ঢাকার পরিবেশ যথেষ্ট ভালো ছিল। এখন ঢাকার বায়ু এতটাই দূষিত যে ঠিকমতো শ্বাস নেয়াই যেন দায়। দেশের যেকোনো স্থানের চেয়ে রাজধানীবাসী রোগ-বালাইয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। বিষয়টি নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আছে বলে মনে হয় না। উদ্বেগ থাকলে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি উন্নয়নের কিছু না কিছু নমুনা চোখে পড়ত। যেকোনো নগরীর সুস্থ পরিবেশের জন্য সবার আগে প্রয়োজন প্রাকৃতিক পরিবেশ। যান্ত্রিকতার ভিড়ে যত বেশি প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকবে, শহরের পরিবেশও তত ভালো থাকবে। পরিবেশে একটা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স বজায় থাকবে। ঢাকা শহরে এর কোনো বালাই নেই। যেদিকে তাকানো যাক না কেন, ইট-পাথরের দেয়ালে দৃষ্টি আটকে যায়। অথচ এ ঢাকা শহরই ছিল একসময় বসবাসের একটি উপযোগী শহর। এর ভেতর এবং চারপাশ দিয়ে যে পরিমাণ খাল, বিল, ঝিল ও পুকুর ছিল, তাতে এটি অনেকটা স্বর্গোদ্যান হিসেবেই পরিগণিত হতো। ভাবা যায়, এ শহরের ভেতর দিয়ে প্রায় ৪৪টি খাল প্রবাহিত হতো, দুই হাজারের বেশি পুকুর ছিল, অসংখ্য বিল-ঝিল ছিল আর চারপাশে চারটি নদী প্রবাহিত হতো! এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক যুগে ঢাকার জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চলের ৯০ শতাংশ ভরাট হয়ে গেছে। সেখানে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। ঢাকার প্রাণ বলে খ্যাত বুড়িগঙ্গা দখল ও দূষণের কবলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদীটি নিয়ে এত টানাহেঁচড়া চলছে যে এটি এখন বিষাক্ত পানিপ্রবাহের মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে। নগরবিদরা বারবার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে খালগুলো সচল রাখতে হবে। খাল, নালা, বিলসহ বিভিন্ন জলাভূমি ও প্লাবনভূমির অস্তিত্ব বিলোপ হলে রাজধানীর পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। তাদের এসব কথা কেবল শোনা যায়, কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেন না। ফলে ঢাকা ক্রমে ভয়ানক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে ভূমিকম্প বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

ঢাকার পাশের কয়েকটি দেশের সুন্দর রাজধানীর কথা বলা যেতে পারে। যেমন কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা দিল্লি। কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নগরের অধিবাসীদের ইতিবাচক সহযোগিতায় বসবাসের জন্য এসব শহর নিরাপদ ও আকর্ষণীয় বলে পরিচিতি লাভ করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ পর্বতমালার আবুরা উপত্যকার মাঝে সুন্দর এক শহর মেডিজিন। কলম্বিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহরটি আশির দশকের শেষের দিকে বিশ্বের ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস সিটি’র তালিকায় এক নম্বরে উঠে গিয়েছিল। কলম্বিয়ার সেই সময়ের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামের কথাও অনেকের জানা। ১৯৯২ সালে নগর পরিকল্পনাবিদরা এ ধ্বংসস্তূপের নগরীকে ঠিক করার জন্য এক বিশদ পরিকল্পনা নিয়ে বসলেন। তারা জোর দিলেন দুটো বিষয়ে, এক যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুই বাসস্থান। স্থানীয় প্রশাসন এলাকার বাড়িঘরে দেশের বিখ্যাত গ্রাফিতি আর্টিস্টদের দিয়ে শত শত গ্রাফিতি করিয়ে ফেলল। পুরো এলাকা হয়ে উঠল রঙিন। ট্যুরিস্টদের চাহিদা সামাল দিতে পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠল সুন্দর রেস্টুরেন্ট, কফিশপ, স্যুভেনির শপ। সমতলে বাস-ট্রাম-মেট্রো আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে এস্কেলেটর আর কেবল কার। পুরো মেডিজিন শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাকে গত কয়েক বছরে সেখানকার নগর পরিকল্পনাবিদরা এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে মেডিজিনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এখন সারা বিশ্বের মডেল হিসেবে ব্যবহূত হয়। ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া ‘মেডিজিন মেট্রো’ তাদের অন্যতম গর্বের বিষয়। প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন রাজধানী শহরকে আধুনিক ও বসবাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা গেল না? প্রত্যেক বছর হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, কিন্তু সমন্বিত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তাই করা হয়নি। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকার এ করুণদশা। দক্ষ নেতৃত্বের অভাব আর ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণেই কোনো পরিকল্পনা পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি।  ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে থানা ও জেলা শহরগুলোয় সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমাতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং সেবা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা শহরে চিকিৎসা, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের উদ্যোগ নিয়ে কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। আবাসন, আধুনিক শিক্ষা ও চিকিৎসার সন্নিবেশ ঘটিয়ে জেলা-উপজেলা শহরগুলোকে পরিকল্পিত ও আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ঢাকাকে বাঁচাতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ‘ড্যাপ’ বাস্তবায়নের কথা বহুদিন ধরে আলোচনা হলেও নানা কারণে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

যেকোনো দেশের রাজধানীর চিত্র সে দেশের সভ্যতা ও উন্নতির মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। চেহারায় যেমন মানুষের মনের ভাব ফুটে ওঠে, তেমনি রাজধানীর চিত্র দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সূচক নির্দেশ করে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকা এমন অনেক দেশ রয়েছে, যেগুলোর রাজধানীর চিত্র ঢাকার চেয়ে সুশৃঙ্খল, পরিপাটি ও বাসযোগ্য। সুদীর্ঘকাল ধরে ঢাকা মেগা সিটি হিসেবে পরিচিতি পেলেও এর গঠন ও বিন্যাস পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি, গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগের খুব একটা লক্ষণ নেই। অপরিকল্পিতভাবে এর বিস্তৃতি ঘটছে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত মানের নয়। প্রতিদিনই রাজধানীকে যানজটে স্থবির হয়ে পড়তে দেখা যায়। গবেষণায় উঠে এসেছে, শুধু যানজটের কারণে প্রতি বছর দেশের প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। এ বিপুল ক্ষতির বোঝা সামগ্রিক অর্থনীতিকে সুদীর্ঘকাল ধরেই বয়ে চলতে হচ্ছে। বলা যায়, যানজট অর্থনীতির ক্ষত হয়ে আছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক মানের একটি শহরে চলাচলের জন্য ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকে। ঢাকা শহরে রয়েছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। অর্থাৎ যানজট নিরসন, স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার জন্য যে পরিমাণ রাস্তার প্রয়োজন ঢাকায় তা নেই। যেটুকু আছে, তাও বিভিন্নভাবে দখল হয়ে আছে।

ঢাকার সমস্যা এবং একে বাসযোগ্য করে তুলতে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, তার পরামর্শ ও পরিকল্পনা বহু বছর ধরেই করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। একটু একটু করেও যদি উদ্যোগ নেয়া হতো, তবে উন্নতি দৃশ্যমান হতো। যে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান সম্ভব, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করলে পরিস্থিতি বদলে যেতে সময় লাগবে না। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় পদক্ষেপ। সরকার যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার কথা বলছে, ঢাকার এমন চিত্র বহাল থাকলে তা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য হবে না।