সেবা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বই পড়েনি এমন লোক প্রজন্মের মধ্যে অন্তত যারা বই পড়ে, খুঁজে পাওয়া মুশকিল। রোমাঞ্চে ভরা সেবা প্রকাশনীর প্রতিটি সিরিজ, প্রতিটি খণ্ড পাঠককে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, সে কথা বলা বাহুল্য। কাজী আনোয়ার হোসেন এসব সিরিজের লেখক বলেই সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে দায়ের করা একটি মামলার নিষ্পত্তির মাধ্যমে ফয়সালা হয় যে মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি ও কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখক হলেন শেখ আবদুল হাকিম। অনেকের জন্যই খবরটি বেশ চাঞ্চল্যকর এবং মাসুদ রানা সিরিজের মতোই রোমাঞ্চে ভরা।

শেখ আবদুল হাকিম ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই কপিরাইট অফিসে একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি মাসুদ রানা সিরিজের ২৬০টি ও কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বইয়ের লেখকস্বত্ব দাবি করেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর কপিরাইট অফিস শেখ আবদুল হাকিমের পক্ষে রায় দেয়।

অনুরূপ তাত্পর্যময় একটি ঘটনা কিছুদিন আগেও লক্ষ করা গেছে। ‘সারেগামাপা’ খ্যাত মাঈনুল আহসান নোবেল জি বাংলায় বাংলাদেশের অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর বেশকিছু জনপ্রিয় গান গেয়েছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে সুরকার প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুরারোপিত কিছু গান। প্রিন্স মাহমুদ অভিযোগ করছেন যে গান গাওয়ার সময় নোবেল সুরকার ও গীতিকারের নাম উচ্চারণ পর্যন্ত করেনি। উপরন্তু, সেসব গান বাণিজ্যিকভাবেও ব্যবহার হয়েছে।

উপরের দুটি ঘটনা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইট বা মেধাস্বত্ব অধিকারের বিষয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার মতে, মেধাস্বত্ব হলো কোনো একজনের মনের দ্বারা সৃষ্ট উপাদান যেমন সাহিত্য ও শৈল্পিক কাজ, ডিজাইন, প্রতীক, নাম বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহূত ইমেজ ইত্যাদি। এই মেধাস্বত্ব রক্ষায় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। যেমন বাংলাদেশে রয়েছে ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯ (২০১৫ সালে সংশোধিত) ও কপিরাইট আইন ২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত)।

প্রপার্টি রাইট বা সম্পত্তির অধিকার পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার একটা অতিগুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ দেখিয়েছেন যে পশ্চিমা বিশ্বের উন্নতির মূলে সম্পত্তির অধিকারের যথাযথ প্রয়োগ বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। সম্পত্তির অধিকারের মর্মার্থ হলো, কারো ‘প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রাপ্তির সমন্বয়’। যেমন কোনো একজন চেষ্টা ও শ্রম দিয়ে কোনো কাজ করলে সেই কাজের ফলাফল ভোগ করার তার পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে। কেউ যদি মেধা ও শ্রম দিয়ে কোনো কিছু সৃষ্টি করেন এবং তার ফল এককভাবে পাওয়ার নিশ্চয়তা না পান, উৎপাদনশীল কাজের প্রতি মানুষের অনীহা তৈরি হবে এবং অনুৎপাদনশীল কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। এতে সমাজ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজে দুর্নীতি বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ হচ্ছে সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। সম্পত্তির অধিকার নির্ভর করবে আইন এবং তার যথাযথ প্রয়োগের ওপর—হোক সেটা স্থাবর সম্পত্তি বা মেধাস্বত্ব। তথ্যপ্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার ও ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মেধাস্বত্ব রক্ষার গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়ে গেছে। মাসুদ রানা সিরিজ নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি, সেটার মূলেও রয়েছে মেধাস্বত্ব অধিকারের প্রশ্ন।

প্রায় ৪০ বছর ধরে মাসুদ রানা সিরিজের জন্য গল্প লিখছেন শেখ আবদুল হাকিম। অনেকের মতে, বিতর্কের প্রধান সূত্রপাত হলো তাদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তির অনুপস্থিতি। আসলে চুক্তির মাধ্যমে উপর্যুক্ত প্রশ্নের মালিকানা নির্ধারণ সম্ভব নয়। মালিকানা ছাড়া অন্য বিষয়াবলি যেমন রয়্যালটি বণ্টনের অনুপাত, পারিশ্রমিক, লেখার মেয়াদ ইত্যাদি বিষয় চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি সম্ভব, তবে মালিকানা স্বত্ব কেবল আইনের মাধ্যমেই সুরাহা সম্ভব। শেখ আবদুল হাকিম লিখেছেন, কিন্তু সেটি ছাপা হতো কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে। আইন এটা কখনো সমর্থন করে না। লেখা যার মালিকানা তারই হবে। কেন আবদুল হাকিম তার লেখা অন্যের নামে ছাপাতে রাজি হলেন বা কাজী আনোয়ার হোসেন কেন অন্যের লেখা তার নিজের নামে ছাপাবেন, সেটার  পেছনে নিশ্চয় অনেক কথা আছে। তবে আইন ও নৈতিকতা কোনোটাই এই প্রথাকে সমর্থন করে না। একজনের লেখা অন্যের নামে প্রকাশ অবশ্যই মেধাস্বত্ব আইনের পরিপন্থী।

এ বিষয় বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০, ধারা ১৭-তে পরিষ্কার করে বলা আছে, ‘কোন কর্মের প্রণেতা ওই কর্মের কপিরাইটের প্রথম স্বত্বাধিকারী হইবেন।’ ১৭ নং ধারার ক অনুচ্ছেদে আরো বলা আছে, ‘চাকুরী বা শিক্ষানবিশী চুক্তির অধীন সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা সাময়িকীর মালিকের চাকুরীতে নিযুক্ত থাকাকালে প্রণেতা কর্তৃক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা সাময়িকীতে প্রকাশের উদ্দেশ্যে রচিত সাহিত্য উক্ত মালিক কর্মটি সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা সাময়িকীতে প্রকাশ বা পুনরুৎপাদনের সহিত যতখানি সম্পর্কযুক্ত ততখানি কপিরাইটের প্রথম স্বত্বাধিকারী হইবেন।’ এ ধারা এটাই প্রমাণ করে যে কর্মটি যখন আব্দুল হাকিমের, লেখাটির স্বত্বও তার। যদি আব্দুল হাকিম কাজী আনোয়ার হোসেনের অধীনে চাকরিও করেন, তবুও লেখাটির স্বত্ব প্রথম পক্ষ থেকে দ্বিতীয় পক্ষে হস্তান্তর হয় না, যদিও দ্বিতীয় পক্ষ প্রকাশ ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বত্ব পাবেন, যেটা চুক্তির অনুপস্থিতিতে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে। তবে আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে এ উপধারা সম্পর্কিত নয়; কেননা কাজী আনোয়ার হোসেনের অধীনে আব্দুল হাকিম চাকরিতে নিযুক্ত নন। সংগত কারণেই যিনি লেখক, তিনিই তার স্বত্বাধিকারী।

কাজী আনোয়ার হোসেন গল্পের পটভূমি তৈরি করার জন্য ধারণা বাতলে দিয়েছেন, গল্পের চরিত্রের বর্ণনা করেছেন, তাতেও গল্পের মালিকানা স্বত্ব তৈরি হয় না। এমনকি যৌথ মালিকানাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। কপিরাইট আইনের ৩০ নম্বর উপধারায় সংজ্ঞা আছে—যৌথ গ্রন্থকার কর্মের ‘দুই বা ততোধিক গ্রন্থকারের সহযোগিতায় প্রণীত কর্ম, যাহাতে একজন গ্রন্থকারের অবদান অপর গ্রন্থকারের অবদান হইতে স্বতন্ত্র নহে।’ আলোচ্য ঘটনায় দুজনের অবদানই স্বতন্ত্র, একজন চিন্তার ধারক, আরেকজন বাহক (লেখক)। আর সেজন্যই কাজী আনোয়ার হোসেন যেমন মাসুদ রানার স্রষ্টা, আব্দুল হাকিম লেখার স্বত্বাধিকারী।

অনেকেই আবার বিষয়টাকে ‘ঘোস্ট রাইটার’ বা ‘ছায়া লেখক’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন যে আব্দুল হাকিম একজন ছায়া লেখক, টাকা নিয়ে তিনি কাজী আনোয়ার হোসেনের জন্য লিখেছেন, তাই বইগুলোর মালিকানা কাজী আনোয়ার হোসেনেরই। ঘোস্ট রাইটিং আইনগতভাবে কতটুকু বৈধ, সে ব্যাপারে অনেক বিতর্ক রয়েছে, তবে নৈতিকভাবে সেটা সমর্থনযোগ্য নয়। যেমন একজন পিএইচডি প্রত্যাশী অনেক সুন্দর একটা বিষয়ে সন্দর্ভ লেখার জন্য অন্য একজনকে, যে টাকার বিনিময়ে কাজটা করে দেবে, নির্দেশ দিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি দ্বারা সন্দর্ভ লেখার পর কি প্রথম ব্যক্তি পিএইচডি অর্জনের উপযুক্ত হবেন? বা আমার এ লেখাটা যদি কোনো একটা পত্রিকার সম্পাদক লিখতে বলেন এবং তিনি এটাও বলে দেন কীভাবে লেখাটা সাজাতে হবে এবং আমার লেখাটাকে এডিটিং করে পত্রিকায় প্রকাশ করেন, তবে পত্রিকার সম্পাদক কি লেখাটার মালিক হয়ে যাবেন? নৈতিক দিক দিয়ে এর কোনোটাই সমর্থনযোগ্য নয়।  

এ ব্যাপারগুলো আমাদের দেশে আদালতে খুব বেশি একটা আলোচিত হয়নি। কারণ মেধাস্বত্ব আইন সম্পর্কে অজ্ঞানতা বা অসচেতনতা। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ রকম ঘটনা অহরহই দেখা যায়। Roddz-Eden v. Berle (N.Y. Sup. Ct. 1951), বিবাদী (Milton Berle) ভালো কিছু উপন্যাস লেখার জন্য বাদীকে (Roddz-Eden) মজুরির ভিত্তিতে ভাড়া করলেন। বাদী যথাসময়ে লেখা শেষ করে বিবাদীকে জমা দিলেন। বিবাদী সেটা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিলে বাদী মামলা করলেন। আদালত সেই মামলা খারিজ করে দিলেন এই মর্মে যে এ রকম চুক্তি জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এ চুক্তি বড় কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র না হলেও আইনের চোখে এটা অবৈধ ও অকার্যকর।

যৌথ মেধাস্বত্ব বিষয়ে যুক্তরাজ্যের একটি মামলা আলোচ্য বিষয়টির সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। Ray v. Classic FM plc,1998, রায়ে বলা হয় যে যদি লেখার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকে অভিব্যক্তিতে (এক্সপ্রেশন) অবদান রাখেন, তবে প্রত্যেকে ‘লেখক’ হিসেবে গণ্য হবেন। আর যদি কেউ কেবল ‘ধারণা’র সাহায্যে অবদান রাখেন, তবে তিনি কোনো একক বা যৌথ লেখক হিসেবে গণ্য হবেন না। যুক্তরাজ্যের আরো একটি মামলা বিষয়টি বেশ পরিষ্কার করে বর্ণনা করেছে [Cala Homes Limited v. Alfred McAlpine Homes East Ltd (1995) F.S.R. 818]। এই মামলার রায়ে বলা হয়, কপিরাইট শুধু ‘ধারণা’ বা ‘আইডিয়া’ তৈরির মাধ্যমে নয়, বরং তার বাস্তব রূপদানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। আদালত আরো বলেন যে কোনো নাটকের পটভূমি চিন্তা করা বা একজনের স্মৃতিকথা কোনো এক ছায়া লেখককে ব্যাখ্যা করা দ্বারা লেখকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং একজন যৌথ লেখককে অবশ্যই রচনায় অংশ নিতে হবে এবং তাকে অবশ্যই কাজের স্রষ্টা হতে হবে।

উপর্যুক্ত আলোচনা এটাই প্রমাণ করে যে মাসুদ রানা সিরিজের মালিকানা নিয়ে কপিরাইট অফিসের রায় শুধু নৈতিক দিক থেকেই সঠিক নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। একজনের লেখা অন্যের নামে চালিয়ে দেয়া মানে নতুন মেধাবীদের বিকশিত হওয়ার জায়গাটা সংকুচিত করা। এতে মেধার বাজারে একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হবে, যা দেশ ও জাতির জন্য অকল্যাণকর।

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

অর্থনীতি ও ফিন্যান্স বিভাগ

নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান

dulal@unizwa.edu.on