২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত এক জরিপের ফল থেকে জানা যায়, দেশের অর্থনীতিতে আবাসন খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। উন্নয়নের ধারায় থাকা আমাদের অর্থনীতির দেশে বাড়ন্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিশাল এক অংশের স্বপ্ন থাকে একটি বাড়ি না হলেও ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার। গত বছর দেশে প্রথমবারের মতো আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা এক বছরে প্রায় ১০ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি করেছেন। আবার নতুন ফ্ল্যাটের পাশাপাশি ব্যবহূত ফ্ল্যাটের চাহিদাও বাড়ছে দেশে। বিপ্রপার্টির প্লাটফর্মে ২০২০-এর তুলনায় ২০২১ সালে ব্যবহূত ফ্ল্যাটের ব্যাপারে অনুসন্ধান প্রায় ১৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে দেশে ফ্ল্যাটের বাড়ন্ত চাহিদার ব্যাপারে আঁচ করা যায়। আমাদের দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে ফ্ল্যাটের চাহিদা যত বাড়বে, সরবরাহও তত বাড়বে এবং বাড়ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে মানুষ যেমন ফ্ল্যাট কিনছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণারও শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি এক রিপোর্টে জানা যায়, বিভিন্ন লোভনীয় অফারে ফ্ল্যাট বা প্লট কিনে প্রতারিত হওয়ার পর এখনো টাকা ফেরত পাননি ২০ হাজারের বেশি ক্রেতা। এছাড়া অনেকেই আছেন, যারা অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নতুন বা ব্যবহূত ফ্ল্যাট ক্রয় করার সময় প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতি কারো জন্য কখনই কাম্য নয়।

বাংলাদেশে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট ক্রয়ের পর কী ফল অপেক্ষা করছে তা কখনো কখনো বলা বেশ কঠিন। একজন ক্রেতা যে ফ্ল্যাটটি কিনেছেন, সেখানে কি তারা জীবনের বাকি সময় প্রশান্তিতে পার করতে পারবেন, নাকি ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্তটি নিয়েই আক্ষেপ করবেন, তা বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। কেননা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জালিয়াতি, স্ক্যাম কিংবা প্রতারণা এ কোনোটাই আমাদের কাছে নতুন কোনো শব্দ না। বিশেষ করে আবাসন খাতে এসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন অনেকেরই কমবেশি হতে হয়েছে।

প্রথম সারির কিছু ডেভেলপার কোম্পানি বাদে ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই  ক্রেতাদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়, যেখানে অনেক ক্রেতাই সন্দিহান হয়ে পড়েন, কে সত্যিকারের প্রপার্টি সলিউশন প্রভাইডার আর কে প্রতারক! 

দেশের আবাসন খাতে এমন অবস্থা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ স্থিতাবস্থা। ফ্ল্যাট ক্রয়ের প্রক্রিয়া এখানে যেমন জটিল, তেমনি আস্থাহীন এবং এমন অনেক মানুষেই ভরা, যারা অনেক সময় নির্মমভাবেই ফ্ল্যাট কিনতে আসা মানুষের বিশ্বাস ও সঞ্চয় দুটিই নষ্ট করে।

তবে বলতেই হবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আবাসন খাতে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে, যার বেশির ভাগই ছিল ইতিবাচক পরিবর্তন। তবু এ পরিবর্তনগুলো অতীতের তিক্ত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে ফেলতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, যার বেশকিছু কারণও রয়েছে।

ফ্ল্যাট ক্রয় করতে গিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছেন। সচেতনতার অভাব, প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে অপরিচিতিতা এবং নির্ভরযোগ্য গ্রাহকসেবার অভাব এ সমস্যার মূলে রয়েছে।

উন্নত ও নির্ভরযোগ্য গ্রাহকসেবার এ শূন্যতা আবাসন খাতে গ্রাহকসেবানির্ভর নতুন একটি খাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যে সম্ভাবনার দ্বার সম্পূর্ণভাবে উন্মোচন করতে সক্ষম হলে আবাসন খাতের ক্রেতাদের প্রতারণার শিকার হওয়ার হার অনেকখানি কমে আসবে। উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এমন একটি খাত দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। এ কোম্পানিগুলো ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও গ্রাহকের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। আবাসন খাতে তাদের উপস্থিতি সময়ের দাবি, কারণ একজন সাধারণ ক্রেতা, এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ির বিক্রেতাও অনেক সময়ই জানেন না যে অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করার সময় ঠিক কী ঘটছে। আর এ অস্পষ্টতাগুলো অনেকাংশে দূর হয়ে যায় যখন কোনো প্রপার্টি-সংক্রান্ত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা নেয়া হয়।

এ প্রতিষ্ঠানগুলো আবাসন খাতে গ্রাহকসেবাকে একটি কাঠামোয় দাঁড় করিয়েছে। ফ্ল্যাট কেনা-বেচার ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই ও আইনি বিষয়ে পরামর্শ, হোম লোন নেয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা, সব ক্ষেত্রেই গ্রাহকসেবা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তাদের কাজের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াগুলো আইনসম্মত এবং বোঝা সহজ। ফ্ল্যাট কেনা ও বেচার ক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরে এ ধরনের সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের প্রতিটি স্তরে তাদের গ্রাহকদের কাজের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেন। বিষয়টিকে আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে প্রপার্টি ক্রয় বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে তারা কেবল বিশ্বাসযোগ্য নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত এবং কার্যকরী। পাশাপাশি খাতটি সময়ের সঙ্গে যত বড় হচ্ছে ততই এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের প্রধান শহর বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এমন পরিষেবার সহজলভ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই এ সেবা নিচ্ছেন না। এর প্রধান কারণ হতে পারে সচেতনতার অভাব। অনেকেই সচেতনতার অভাবে বিশেষ করে ব্যবহূত ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে এখনো অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করছেন, ফলে প্রায়ই কেউ কেউ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, অথবা তার আশানুরূপ সমাধান পাচ্ছেন না। আবার এ ধরনের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়াগুলো যেমন জটিল, তেমনি খুব ধীরগতিতে চলে। এমনকি আদালতে এ-সংক্রান্ত অনেক মামলা কোনো প্রকার রায় ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে।

সুতরাং সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই। কেননা যত দিন পর্যন্ত মানুষ অননুমোদিত তৃতীয় পক্ষের ওপর ভরসা রাখবে ততদিন আবাসন খাতে কেলেঙ্কারির সমাপ্তি ঘটবে না। তবে এ অবস্থার সমাধান এরই মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে অনেকেই এ সুবিধা এখনো নিচ্ছেন না। যারা এ খাতের সঙ্গে জড়িত তারা সময়ের সঙ্গে গ্রাহকদের মাঝে এ-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কাজ করে যাবেন, সেটাই আশা করছি। কারণ এতে গ্রাহক ও দেশের আবাসন খাত দুই-ই উপকৃত হবে।

 

অনীক সীমান্ত: প্রপার্টি-সংক্রান্ত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত