বিশ্ববাণিজ্য ও রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির মধ্যকার কয়েক দশকের সম্পৃক্ততার পর অনেক বহুজাতিক করপোরেশন কোম্পানি (এমএনসি) দেশটি থেকে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের প্রস্থানের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে আইনের শাসনের প্রয়োগ নিশ্চিতে দেশটির বর্তমান শাসন ব্যবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীরা আর আস্থাশীল নন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, আগে যাকে একজন আধুনিক স্বৈরশাসক মনে করা হয়েছিল, তিনি এখন যেকোনো যৌক্তিক ব্যয়-সুফল হিসাবের (কস্ট-বেনিফিট ক্যালকুলেশন) বিপরীতে পরিষ্কারভাবে ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হচ্ছেন। বরাবরই রাশিয়ার পরিবেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে চলমান যুদ্ধে পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে। ফলে অভিজ্ঞ বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক কোম্পানি যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে আর থাকতে চাইছে না।
রাশিয়ার সব গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোকার্বন খাত, বহুজাতিক ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) কোম্পানি ও মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি শেল সাখালিন দ্বীপে (রাশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের দ্বীপ) বিপুল জ্বালানি উন্নয়ন প্রকল্প, রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ তেল কোম্পানি রোজনেফট এবং অন্য যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারসহ বিদ্যমান সম্পদ বিক্রি করার সংকেত দিয়েছে। এখন পরবর্তী প্রজন্মের সম্পদ উন্নয়নে বৈশ্বিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে অন্যত্র দৃষ্টি দিতে হবে এবং তাদের মনোযোগের এ স্থানান্তর হাইড্রোকার্বন থেকে বৃহত্তর
রূপান্তরের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর কেবলই শুরু হয়েছে। অন্তত আগামী দুই দশকে বর্ধিষ্ণু প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি বিশ্বে প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হবে। তেল-গ্যাসের নতুন খনি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা এখনো বেশ সম্ভাবনাময়, যদিও ইরাক ও লিবিয়ার মতো দেশে কাজ করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আরো সাধারণভাবে বললে, তেল ও গ্যাস সম্পদের মূল্য বাড়বে এবং এ শিল্পে একীভূতকররণ ও অধিগ্রহণ কার্যক্রম বৃদ্ধির একটা ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সৃষ্ট নতুন ঝুঁকি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করবে এবং অন্য দৃষ্টিগ্রাহ্য খাতগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরাবে। অর্থনৈতিক নৈরাজ্য, বেড়ে চলা মূল্যস্ফীতি এবং পশ্চিমা অবরোধের মুখে বিপরীত পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হওয়া দেশটির সরকারও বড় বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। সম্পদের মান হ্রাস করতে হতে পারে। এটা কিছু করপোরেটের স্থিতিপত্রে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আবার রাশিয়ায় কর্মরতদের বীমা ফি অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল হবে। সর্বোপরি নিজেদের যা আছে তা নিয়ে বিপুল রুশ নাগরিক অন্য দেশে পাড়ি জমাতে পারেন। ফলে বিশ্বজুড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় অর্থপ্রবাহ বেড়ে যাবে।
পুতিন ভুল করবেন, যদি তিনি মনে করেন বিপি, শেল এবং অন্য কোম্পানিগুলোর গয়রহ প্রস্থান দেশটির তেল ও গ্যাস খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ব্যাহত করবে না। ২০ বছর ধরে বাইরে থেকে আসা উন্নত প্রযুক্তি রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সেকেলে জ্বালানি খাতের সমস্যা চিহ্নিতকরণ, নতুন সম্পদ উন্নয়ন এবং এর দক্ষতা, নৈপুণ্য বাড়াতে সাহায্য করেছে। এমনকি রাশিয়ার জ্বালানি খাত স্থিতিশীল থাকলেও আগের নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহ, সঞ্চালন ব্যবস্থা এবং পাইপলাইন স্থাপনে দেশটির আরো বিনিয়োগ দরকার হবে। বিশ্বের বড় আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর অনুপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করতে না পারলে দেশটির জন্য খাতটি উন্নয়ন করা অনেক কঠিন হবে।
ইউরোপেও
এর পরিণাম
হবে ভয়াবহ,
যেখানে পুতিনের
চলমান আগ্রাসন
জ্বালানি নিরাপত্তা
নিশ্চিতের বিষয়টিকে
সর্বোচ্চ রাজনৈতিক
এজেন্ডায় পরিণত
করবে। জার্মানি
আগে রুশ জ্বালানি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করত তারা তখন জ্বালানি উৎসের
বৈচিত্র্যায়ণ করতে
চাইছে। শুধু
তা-ই নয়, দেশটি
এমনকি অবশিষ্ট
তিন পারমাণবিক
বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ
বাড়ানোর বিষয়
পুনর্বিবেচনা করছে।
এটা তরলীকৃত
প্রাকৃতিক গ্যাসের
(এলএনজি) জন্য
সুখবর, যেটি
এরই মধ্যে
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যযোগ্য গ্যাসের অর্ধেকের বেশি
সরবরাহে অবদান
রাখে এবং সম্ভাবনাময়ভাবে যা পারমাণবিক খাতের
জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অভ্যন্তরীণভাবে এমন বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের উদ্বায়িতামুক্ত, কাজেই বিপজ্জনক জ্বালানি নির্ভরতা এড়ানোর প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে সামনে একে দেখা হবে। রোলস-রয়েসের মতো ক্ষুদ্র, মডিউলার রিঅ্যাক্টরগুলো যুক্তরাজ্য, ইউরোপের অন্য অংশ এবং বিশ্বজুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আরো সমাদৃত হবে। তবে শিল্পটিতেও বিপত্তি ঘটতে পারে, যদি ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি করে।
সময়ান্তরে গ্যাস থেকে সরে
আসার চাপ
ইউরোপে বাড়লেও
বিশ্বের অন্য
অনেক অংশে
এর চাহিদা
বৃদ্ধি অব্যাহত
থাকবে। জ্বালানি
নিরাপত্তাহীনতার এ ধরনের পরিবেশে
রাষ্ট্র থেকে
রাষ্ট্র সমর্থিত
প্রত্যক্ষ লেনদেন
ও পারস্পরিক বিনিময় বজায় থাকবে।
এ প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন,
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও অন্য তেল
উৎপাদনকারী দেশগুলোকে তেল উৎপাদনে উৎসাহিত
করার মতো
বৈশ্বিক পরিসরে
একক শক্তি
হিসেবে দেশটির
উত্থান এখনো
দূর অস্ত।
রাশিয়ার সঙ্গে
একটি সাম্প্রতিক গ্যাস চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে
সংঘটিত ঘটনাগুলো
মনে হয় রাশিয়ার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (সাইবেরিয়া ও সাখালিন) ওপর
দেশটির বর্ধিত
নির্ভরতার বিষয়টি
পুনর্মূল্যায়নে চীনকে
চালিত করবে,
যেমনটা জার্মানির ক্ষেত্রে ঘটেছে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার নীতিগুলো তাত্পর্যজনকভাবে কম প্রাধিকার তালিকায় চলে যাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহ জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হলেও এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ স্থগিত হতে পারে। অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু জ্বালানির দাম যেহেতু এরই মধ্যে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থ নিঃশেষিত করে ফেলেছে, সেহেতু তাদের ওপর গ্রিন এজেন্ডা এগিয়ে নিতে সরকারগুলো বাড়তি ব্যয় চাপাতে চাইবে না।
পরিশেষে
বলব ইউক্রেনে
রাশিয়ার যুদ্ধ
সুযোগ ও ঝুঁকি উভয়ই
সৃষ্টি করবে।
প্রাকৃতিক সম্পদে
(যেমন খাদ্য,
খনিজ ও জ্বালানি) বিনিয়োগ
আগের যেকোনো
সময়ের চেয়ে
অনেক বেশি
আবশ্যকীয় হবে।
নতুন স্নায়ুযুদ্ধ গত ৩০ বছরে
গড়ে ওঠা
বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্যগুলো ম্রিয়মাণ করতে পারে,
তবে অর্থনৈতিক জীবন থেমে থাকবে
না। বিদ্যমান
পরিস্থিতির কোনো
কিছুই বৈশ্বিক
অর্থনীতির অন্তর্নিহিত ডিনামিক্স (ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাচালিত প্রবৃদ্ধি এবং বিশেষ
করে এশিয়া
অঞ্চলে সমৃদ্ধির
অব্যাহত বিস্তার)
পরিবর্তন করতে
পারেনি। কিন্তু
বর্তমানে ইউক্রেনে
যা ঘটছে
তার সব জটিলতা ও ক্ষতিই যে নিকট ভবিষ্যতে
জ্বালানি খাত
পরিচালনার মৌলিক
নিয়ামক হিসেবে
কাজ করবে,
সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
নিক বাটলার: লন্ডন কিংস কলেজের অতিথি অধ্যাপক; দ্য কিংস পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ও প্রমিউজ অ্যাসোসিয়েটসের চেয়ার
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










