রফতানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২১-২৪ মেয়াদের রফতানি নীতি প্রণয়ন করেছে সরকার। ২৩ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া এ নীতিতে সম্ভাবনাময় রফতানি পণ্যকে বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের অন্তর্ভুক্ত করে আয়কর রেয়াত, সহজ শর্তে ও হ্রাসকৃত সুদহারে রফতানি ঋণ প্রদানসহ নানা সুযোগ-সুবিধা জোগানোর কথা বলা হয়েছে। তিন বছরের জন্য প্রণীত নতুন রফতানি নীতিতে সব খাতের জন্য কম বেশি সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হতে পারে। তবে এ নীতির সাফল্য নির্ভর করছে যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। আগের রফতানি নীতিতে অনেক ভালো ভালো উদ্যোগের কথা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতার কারণে রফতানিকারকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাছাড়া সুবিধা ছাড়করণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কমিয়ে আনা প্রয়োজন। সর্বোপরি স্বচ্ছতার সঙ্গে অনিয়মমুক্তভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। সুযোগের অপব্যবহার বন্ধে তদারকিও শক্তিশালী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য রফতানি বহুমুখীকরণ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশের রফতানি খাত এখনো গুটিকয়েক পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে। এরপর রয়েছে চামড়া, পাটজাত পণ্য ও ওষুধ পণ্য। স্বল্প পণ্যের ওপর এই অতিনির্ভরতা রফতানি নৈপুণ্য এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা উভয় দিক থেকে দুশ্চিন্তার। কাজেই রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। বাস্তবতা হলো, রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোয় সমস্যা, বাণিজ্যনীতি ও প্রণোদনা ব্যবস্থা সম্পর্কিত সমস্যা, শুল্কায়ন পদ্ধতির জটিলতা, বিরাজমান বাণিজ্যনীতি ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা এবং অবকাঠামো ব্যবহার (বন্দর, পরিবহন প্রভৃতি) সেবায় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়। রফতানি বৈচিত্র্য বেগবান করতে এগুলোর সমাধান এখন সময়ের দাবি। সরকার রফতানি বাণিজ্যকে বেগবান করতে ও বৈচিত্র্যকরণ নিশ্চিতে দিকনির্দেশনামূলক অবস্থান থেকে নীতি প্রণয়ন করে। রফতানিতে সুফল বয়ে আনতে পারে, এমন নীতিও থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়েই তৈরি হয় জটিলতা। অনেক ভালো নীতি দিকনির্দেশনামূলক পদক্ষেপের অভাবে আলোর মুখ দেখে না। ফলে দেশের রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে, যা কাম্য নয়। এবারের রফতানি নীতিতে যেসব সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে, প্রত্যাশা থাকবে সেগুলো বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপও নেয়া হবে।
উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে এবং বিদ্যমান সুবিধাগুলো সংকুচিত হলে দেশের রফতানি বাণিজ্য বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার কমে যাবে। তেমনটি হলে পুরো অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ পড়বে বৈকি। সুতরাং এটি বিবেচনা করে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রচলিত পণ্যের বাইরে আরো কিছু পণ্যের রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে গ্লাস, ইলেকট্রনিক পণ্য, সিরামিকস, হালকা প্রকৌশল পণ্য, সিমেন্ট, আইটি পণ্য, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ছোট জাহাজ প্রভৃতি। শুধু পণ্য নয়, রফতানি গন্তব্যেও বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। দেশের রফতানি বাজার প্রধানত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক। মূলত বিভিন্ন ধরনের অগ্রাধিকারমূলক ও শুল্ক সুবিধার কারণে বাজার প্রবেশাধিকারে তুলনামূলক ভালো করেছে বাংলাদেশ। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সেখানে বাজার ধরে রাখা কঠিন। তাই নতুন রফতানি গন্তব্যের অন্বেষণ দরকার। জাপান, রাশিয়া, ব্রাজিল, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় রফতানি গন্তব্য হতে পারে। রফতানি বাড়াতে ওইসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করা বেশ সহায়ক হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো এভাবেই এগোচ্ছে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করা যায়। পোশাক পণ্যের বাইরে দেশটি ইলেকট্রনিক পণ্য (মোবাইল), যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, পাদুকা পণ্য এবং কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজ অবস্থান টেকসই করছে। তদুপরি, দেশগুলো অনেক দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করছে। রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ইস্যু পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স অর্জন। এজন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তাছাড়া মান ও খরচ বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক না হলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই রফতানি বহুমুখীকরণকে একক বা বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে শিল্পনীতি, আমদানি নীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।
পণ্য রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে বাজার বহুমুখীকরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের তৈরি-পোশাক বহির্ভূত পণ্যের বড় বাজার অপ্রচলিত বাজারগুলোতে বিদ্যমান। এসব বাজার মূলত ভারত, শ্রীলংকা, রাশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশকেন্দ্রিক। পাশাপাশি বাংলাদেশী অধ্যুষিত বা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর অবস্থানরত দেশগুলোতে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাজার রয়েছে। অবশ্য এসব পণ্যের বাজার খুব বড় নয়। উপরোক্ত সব পণ্যের বাজারে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা খুব সীমিত আকারেই রফতনি বৃদ্ধি করতে পারছেন ভিন্ন ভিন্ন কারণে। প্রথমত, অপ্রচলিত প্রায় প্রতিটি বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব দেশ উন্নয়নশীল হওয়ায় পণ্য রফতানিতে উচ্চ শুল্ক এক বড় বাধা। যেমন, রাশিয়া, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় বাজারে ৩০-৪০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রফতানি সম্ভব নয়। রাশিয়ার মতো বাজারে সরাসরি এলসি খুলে রফতানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ, যেমন চীন বা ভারত বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ তা পর্যাপ্ত আকারে ব্যবহার করতে পারে না। যেমন চীনের ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের শর্ত থাকায় তা মিটিয়ে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা খুব কমসংখ্যক পণ্যেই পাওয়া সম্ভব। কৃষিজাত পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে স্যানিটারি ও ফাইটো স্যানিটারি স্ট্যান্ডার্ড পরিপালন গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই স্ট্যান্ডার্ড পরিপালনে সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডে পণ্য উৎপাদন জরুরি। এ ধরনের মানদণ্ড পরিপালন খুব অল্পসংখ্যক ল্যাব এবং সীমিতসংখ্যক পণ্যের জন্য ব্যাপক কারিগরি প্রস্তুতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মানদণ্ড রয়েছে, যা পরিপালন দরকার হয় আমদানীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে। যেমন আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য আঞ্চলিক মানদণ্ড প্রবর্তন করেছে। বাংলাদেশকেও বিষয়গুলো আমলে নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
রফতানি বহুমুখীকরণে উদ্যোক্তা বা বেসরকারি খাতের দুর্বলতাও চোখে পড়ার মতো। একটি নির্দিষ্ট খাত রফতানি বাজারে তখনই এগোতে পারে, যখন পণ্য ক্রেতারা পণ্যের অর্ডার দেয়ার জন্য অনেক বিক্রেতার খোঁজ পান। দুর্ভাগ্যজনক হলো বাংলাদেশের বেশির ভাগ উদীয়মান খাতই মাত্র এক বা একাধিক স্বল্পসংখ্যক বিক্রেতা উদ্যোক্তার ওপর নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট খাতের ন্যূনতমসংখ্যক বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার উপস্থিতি না থাকলে ক্রেতা অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত থাকে। বেশির ভাগ খাত কিছু বৃহৎ উদ্যোক্তা বা গ্রুপ অব কোম্পানিজ নির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এসব খাতের বিকাশ শ্লথগতিতে হচ্ছে। এসব খাতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবা উৎপাদন ও প্রদানের ক্ষমতা থাকা জরুরি। মোটকথা, প্রতিটি উদীয়মান খাতের ভ্যালু চেইনকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঁচামাল উৎপাদন বা আমদানি মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদন এবং পূর্ণাঙ্গ পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
উদীয়মান এসব খাতে স্বল্পতম সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দেশী বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করা জরুরি। বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়, বিদেশী বিনিয়োগের জন্য সব ধরনের সুবিধা রয়েছে এবং প্রায় সব খাত বিদেশী বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বাধার সম্মুখীন হন। অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করার অজুহাতে বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করার একটা অলিখিত প্রবণতা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে। রফতানি বহুমুখীকরণে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগের পথ সুগম করা বিশেষভাবে জরুরি। মনে রাখা দরকার, বিদেশী উদ্যোক্তারা প্রথমে ক্ষুদ্র আকারের বিনিয়োগ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বৃহদাকারের বিনিয়োগে যেতে চান। সুতরাং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বিদেশী বিনিয়োগ উদীয়মান খাতের জন্য উপযোগী এবং এর জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার।










