ঘটনাবহুল বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কোন ঘটনা কতটা গুরুত্ব বহন করে, তা বোঝা মুশকিল। যেমন শেয়ারবাজারের ক্রমাগত দরপতন অনেকের মধ্যে আলোচনার বিষয় হিসেবে শুরুতে তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি। তারপর লোকসানের বিপর্যয় সহ্য করতে না পেরে কোনো এক হতভাগ্য বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেয়। আর এতে সংশ্লিষ্ট মহল একটু নড়েচড়ে বসে। বিষয়টি নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়। কিছুদিন হয়তো এটা নিয়ে কথাবার্তাও হবে বিভিন্ন মহলে। কিন্তু তাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে, সেটা প্রশ্নই থেকে যায়।

১৫ জানুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচকটি কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৮ পয়েন্টে। যদিও নতুন বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫ দিনে সাধারণ মূল্যসূচক প্রায় ৪০০ পয়েন্ট কমেছে। ২০১৯ সালজুড়েই সূচকের পতন ছিল ক্রমাগত। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সূচকের সর্বোচ্চ মান ছিল ৫ হাজার ৯৫২ পয়েন্ট, যা এক বছরে প্রায় ১ হাজার ৯০০ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৮ পয়েন্টে, অর্থাৎ এই এক বছরে সাধারণ মূল্যসূচক ৩১ শতাংশেরও বেশি কমেছে যা সত্যিই উদ্বেগের। এর আগেএ সূচক সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৭ মে ৪ হাজার ১২২ পয়েন্টের সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল।

এবারের দরপতন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। প্রথমত, ১৯৯৬ বা ২০১০ সালের মতো এবারের বাজারে হঠাৎ করে কোনো ‘স্পেকিউলেটিভ বাবল’ বা ফাটকামূলক তেজি ভাব তৈরি হয়নি। যেমন ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালের শেষ অব্দি সাধারণ মূল্যসূচক ১৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৩৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ১৯৯৬ সালের ৫ নভেম্বর সাধারণ মূল্যসূচক দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৪৮ পয়েন্টে, অর্থাৎ ১১ মাসে বৃদ্ধি পেয়েছিল ৩৩৭ শতাংশ। ২০০৯-১০ সালের বাজারে একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ২০০৯ সালের জুনে মূল্যসূচক ছিল ৩ হাজার পয়েন্টের সামান্য উপরে। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯০০ পয়েন্টের কিছু বেশি। এক বছর তিন মাসে মূল্যসূচক বেড়েছিল প্রায় ২০০ শতাংশ। তবে তা পড়তেও বেশি সময় লাগেনি। কয়েক মাসের মাথায় মূল্যসূচক কমে ৩ হাজারের ঘরে চলে আসে। সেই থেকে একটু একটু করে মূল্যসূচক বেড়ে ২০১৭ সালের শেষের দিকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৩০০ পয়েন্ট অতিক্রম করে। এত দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যসূচকের যতটুকু উন্নতি হয়েছে, সেটা প্রত্যাশার চেয়েও কম। তাই বর্তমানে মূল্যসূচকের হঠাৎ দরপতন অনেকটা অযৌক্তিক, সেটা বলা যায়।

দ্বিতীয়ত, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পুঁজিবাজারের একটা ইতিবাচক সম্পর্ক আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করে নাকি পুঁজিবাজারের উন্নয়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে (অর্থাৎ ডিম আগে নাকি মুরগি আগে)—এ প্রশ্নের সুরাহা যদিও এখনো পুরোপুরি হয়নি, তবে দুটোর যুগপৎ উন্নয়ন খুবই সাধারণ ব্যাপার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এ কথারই প্রমাণ মেলে। সম্প্রতি মূল্যসূচকের ক্রমহ্রাসমান ধারা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে বিপরীতমুখী। যেহেতু বাজারে কোনো অযৌক্তিক উদ্দীপনা নেই, সেহেতু শেয়ারের অস্বাভাবিক দরপতন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি দেশজ উৎপাদনের বৃদ্ধি। শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে। মোট দেশজ উৎপাদনে এসব কোম্পানির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকে। তাই উদীয়মান অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকবে, সেটাই কাম্য। গত দু-তিন বছরে আমাদের করপোরেট সেক্টরে নেতিবাচক এমন কিছু শোনা যায়নি, যার জন্য পুঁজিবাজারের দরপতন অনুমেয় ছিল (কিছু পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তবে সেসব কারখানার অধিকাংশই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়)। আবার যদি আমরা ধরে নিই অর্থনীতির উন্নয়নের তথ্য-উপাত্ত সঠিক, সেক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে অপারগ। অর্থাৎ পুঁজিবাজারের তহবিলের জোগান ছাড়াই আমরা অর্থনীতির উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছি।

যদি তা-ই হয়, দেশজ উৎপাদনের বর্তমানে যে ঊর্ধ্বগতি, সেটা আদৌ টেকসই হবে কিনা, সে প্রশ্ন সবার সামনে চলে আসবে। দেশের পুঁজিবাজারকে অকার্যকর রেখে অর্থনীতির উন্নয়ন একেবারে অসম্ভব না হলেও বেশিদূর যাওয়া যাবে না। অন্যদিকে পুঁজিবাজারকে সচল ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকাকে যতটুকু গতিশীল করা যেত, সে সম্ভাবনাটুকুও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাই পুঁজিবাজারকে গতিশীল ও কার্যকর রাখাটা অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা অর্থনীতির আরেকটি দিক বিশেষভাবে উন্মোচন করে। অনেক বিনিয়োগকারী বাজার থেকে (মূলত ব্রোকারেজ হাউজ থেকে) ঋণ (মার্জিন অ্যাকাউন্ট) নিয়ে শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। তাই বাজারের বড় ধরনের দরপতনে তারা অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, যেমন অনেক বিনিয়োগকারী ইকুইটি-মার্জিন অনুপাত সমন্বয় করতে গিয়ে অনেক সময় বাধ্য হয়ে পড়তি বাজারে শেয়ার বিক্রি করেন, যা তাদের লোকসানের বোঝাটাই বাড়িয়ে দেয়। যদিও মার্জিন অ্যাকাউন্টে ক্রয়-বিক্রয় শেয়ারবাজারের একটা স্বাভাবিক নীতি হিসেবে পরিগণিত হয়, ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কখনো কাম্য নয়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ মূলত অনেক ঝুঁকিসম্পন্ন—এ কথাটা বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় থাকে। তাই বাজারের যেকোনো পরিস্থিতি সামলে ওঠার সক্ষমতা তাদের থাকতে হয়। আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সিংহভাগই যুবসম্প্রদায়, যাদের নিট আয় বা সঞ্চয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মতো অনুকূল নয়। সে কথা তারাও ভালো করেই জানে। তার পরও তারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। কারণ দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলো খুবই সংকীর্ণ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন যুবসমাজের জন্য যথাযথ কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেনি। আর তাই ঝুঁকির সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তারা শেয়ারবাজারের দিকে ঝুঁকছে। যদিও এটা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক দিক। কারণ পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পূর্বশর্ত। আর বাজারকে কার্যকর ও চাঙ্গা রাখতে হলে চাই বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীর আগ্রহ এবং সেই সঙ্গে তাদের অংশগ্রহণ।

পুঁজিবাজারের পৌনঃপুনিক অস্বাভাবিক দরপতন বিনিয়োগকারীকে বাজার থেকে দূরে রাখবে, যেটা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তাই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে বাজারের প্রতি আকৃষ্ট করতে বাজারের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এতে সবার আগে যে চ্যালেঞ্জের কথা চলে আসবে, সেটা হচ্ছে বাজারের সুশাসন। আমাদের শেয়ারবাজারের গভীরতা তুলনামূলক অনেক কম। এখানে সুশাসনের অভাব হলে বিপত্তি হতে পারে, যার প্রমাণ অতীতে মিলেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাজার ধসের পর এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথক (ডিমিউচুয়ালাইজেশন) করা হয়। কিন্তু পৃথককরণের কাজটি পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। ফলে এখনো গুটি কয়েক লোকের হাতেই বাজারের নিয়ন্ত্রণ থেকে গেছে, যারা বাজারকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। অর্থনীতির মৌলিক ভিতগুলো স্বাভাবিক থাকা অবস্থায়ও যখন সূচকের অভাবনীয় দরপতন হয়, তখন এ অনুমানকে আরো প্রবল করে তোলে। আবার অতীতে অনৈতিকভাবে বাজারকে প্রভাবিত করে অস্বাভাবিক মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বিরল নয়। বরং এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা বাজার সম্পর্কে সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থাহীনতাকে আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে (ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়)। তাই যেকোনো মূল্যে এ প্রথা ভাঙতে হবে। বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমে আসবে।

সংসদ অধিবেশনে অনেক সংসদ সদস্যই শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন (যদিও এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন)। সেটা যে নিতান্তই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিনিয়োগকারীকে রক্ষার জন্য, সে ব্যাপারে কোনো মতান্তর নেই। তবে এ রকম হস্তক্ষেপ একেবারে শেষ অবলম্বন হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ পুঁজিবাজারকে রাখতে হবে হস্তক্ষেপমুক্ত, নইলে যেকোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা বারবার হস্তক্ষেপ কামনা করবেন, যেটা বাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। আর সেজন্যই দরকার বাজারকে যেকোনো মহলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে পারিপার্শ্বিক যেকোনো অশুভ চাপ থেকে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন প্রবাহকে মুক্ত রাখা যায়। কেবল তখনই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিনিয়োগকারীরা তালিকাভুক্ত কোম্পানির মৌলিক নিয়ামকগুলোর ওপর ভিত্তি করে তাদের বিনিয়োগের কর্মপন্থা ঠিক করতে পারবেন।

শেয়ারবাজার একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। এখানে অনেক বিনিয়োগকারীর সমাবেশ না ঘটলে বাজারের বৈচিত্র্য থাকবে না এবং বাজার সম্প্রসারণ হবে না। যেহেতু আমাদের দেশে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী (যেমন পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, হেজ ফান্ড) হয় অনুপস্থিত নতুবা তাদের উপস্থিতি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, তাই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিনিয়োগকারীদের বাজারে ধরে রাখতে হবে বাজারের স্বার্থেই। বাজারকে অনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পারলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ অনেকটাই রক্ষা হবে।

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক

ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট

ইউনিভার্সিটি অব নিজুয়া, ওমান