প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দেশব্যাপী এক কোটি পরিবারকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ট্রাকের মাধ্যমে কয়েকটি পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ থাকবে। করোনাকালে সরকারের আর্থিক সহায়তার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অনেক গরিব মানুষই সরকারের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আবার ক্ষমতার ছায়াতলে থাকার কারণে অনেক সচ্ছল মানুষও সহায়তা পেয়েছে। কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে যেন এর পুনরাবৃত্তি না হয়, তা রোধ করা চাই। পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদও গড়ে তুলতে হবে। কয়েক দিন কার্যক্রম পরিচালনা করে জোগানের স্বল্পতার কথা বলে বন্ধ করে দেয়া যৌক্তিক হবে না। সরকারের কাছে সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ওপরই এবারো ভরসা করতে হচ্ছে, যা কাম্য ছিল না। হতাশার বিষয়, সরকার এত দিনেও একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি করতে পারেনি। প্রতিদিন টিসিবির ট্রাক ঘিরে যেভাবে মানুষের হুড়োহুড়ি দেখা যাচ্ছে, তাতে এ পদ্ধতি কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। সঠিক মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যের এ সেবা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই।

আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বাংলাদেশের হাত নেই সত্য কিন্তু যেসব পণ্য দেশে উৎপাদন হয়, সেগুলোর দাম কেন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেল, সেটাই বড় প্রশ্ন। আমদানি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কত বেড়েছে আর অভ্যন্তরে কত বাড়ানো হয়েছে, সেসব মিলিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব। সরকার দুই উপায়ে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। প্রথমত, বাজারে কোনো কারসাজি হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত, নিজস্ব চ্যানেলে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো। দেরিতে হলেও টিসিবির মাধ্যমে এক কোটি পরিবার তথা পাঁচ কোটি মানুষকে কম দামে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া সয়াবিন, চিনি ও ছোলার ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে, যদিও কত ভাগ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তাছাড়া ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা তৈরি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনারও খবর মিলছে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় বিবেচনা যেন প্রাধান্য না পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। শেষ পর্যন্ত অনেককে পণ্য না পেয়ে ফেরত যেতে হয়েছে প্রথম দিনে। তবে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতাদের অভিযোগ, অনেকেই দুবার পণ্য সংগ্রহ করছে। তাদের কেউ কেউ আবার পণ্য পেয়ে পাশেই মুদিদোকানে বিক্রি করেছে। তেলের সঙ্গে বাকি পণ্যগুলো বাধ্যতামূলক করায় অনেকে বিপাকে পড়েছে। যে টাকায় প্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে অন্যগুলো নিতে হয়, সেই টাকায় চাল বা অন্য বাজার দরকার হয় অনেকের। এক্ষেত্রে প্যাকেজ প্রক্রিয়াটি বাতিল করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা তৈরি ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়ম ও ভোগান্তি এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা আইন অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ ভারতীয় পরিবার খাদ্যসহায়তা পেয়ে আসছে। গণবণ্টন হলো ভারত সরকারের দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকির মাধ্যমে কম দামে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সামগ্রী বিতরণ ব্যবস্থা। এটি ভারত সরকারের খাদ্যনিরাপত্তা আইনের অধীনে খাদ্য, ভোক্তা ও গণবণ্টন মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত কার্যক্রম। সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে গম, চাল, চিনি, কেরোসিন তেল এবং অতিসম্প্রতি ডাল খাদ্যসামগ্রীর তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ভারতজুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তৃত অসংখ্য ন্যায্যমূল্যের স্টোর বা রেশন দোকান, যেগুলো সরকারি মালিকানাধীন সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশটিতে এক দেশ এক কার্ড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ যে যেই রাজ্যেই থাকুক না কেন, সে সেখান থেকে রেশনসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবে। তবে সেই কার্ড অন্য কোনো রাজ্যে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করতে পারবে না। যাদের রেশন কার্ড আছে তারাই এ প্রকল্পের আওতায় পড়বে। মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের ভর্তুকির দ্বারাই রেশন সিস্টেম চলে ভারতে। তবে কলকাতা এবার দুয়ারে রেশন প্রকল্প প্রথম চালু করেছে। এর মাধ্যমে রেশনসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হবে প্রাপকের বাড়ির দোরগোড়ায়। ১০ লাখ রুপির ‘স্টুডেন্টস ক্রেডিট কার্ড’ ও স্বনির্ভর নয় নারীদের প্রতি মাসে ৫০০ রুপির ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পরপর রেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যা পরে বন্ধ করে দেয়া হয়। স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রির জন্য ২০০৭-০৮ সালে ন্যায্যমূল্যের দোকানও চালু করা হয়। প্রথম দিকে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা এর সুফল পেলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সেখানেও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। এবার যেন তেমনটি না ঘটে, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে।

টিসিবির পণ্য বিক্রিতে অনিয়ম বন্ধে সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে তদারকি জোরদার করেছে বলে খবর মিলছে। আর ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে অনেক সচ্ছল মানুষ কার্ড পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেন হয়রানিমুক্তভাবে কার্ড ও পণ্য পেতে পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় পণ্য বিতরণের প্রথম দিকে কড়াকাড়ি থাকলেও পরবর্তী সময়ে শিথিলতা দেখা যায়। ভুললে চলবে না, এ কার্যক্রমটি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় চালু করা হয়েছে। ফলে তার সম্মান রক্ষার স্বার্থেই বাধা ও দুর্নীতিমুক্তভাবে এটি পরিচালনা করা প্রশাসনের সবার দায়িত্ব। প্রত্যাশা থাকবে, সবাই তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করবে।

এ কথা সত্য, টিসিবির ট্রাক সেল সার্বিক বাজার পরিস্থিতিতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না, তবে নিম্ন আয়ের মানুষের সাময়িক স্বস্তি মেলে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে মানুষের আয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। নানা অভিযোগ, অনুযোগ ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে টিসিবির পণ্য বিক্রি। পণ্যের স্বল্পতা, ওজনে কম দেয়া, দেরি করে স্পটে পণ্য নিয়ে আসা, জোর করে অপ্রয়োজনীয় পণ্য গছিয়ে দেয়া, দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড় করানোর পর ‘পণ্য নাই’ বলে ক্রেতা বিদায় করে দেয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এমন প্রবণতা বন্ধে তদারকি জোরদার ও দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। চাহিদামতো মানসম্পন্ন পণ্যের যথাযথ সরবরাহও নিশ্চিত করা চাই।