রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায় ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ক্রমেই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। খবরে প্রকাশ, এরই মধ্যে রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় বাড়তে শুরু করেছে আক্রান্ত রোগীদের চাপ। বিশেষ করে বিশেষায়িত হাসপাতাল আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশে (আইসিডিডিআর,বি) সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। নির্দিষ্ট শয্যার বাইরে দুই শতাধিক শয্যার তাঁবু টানিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে শিশুদের পাশাপাশি ভুগছে বয়স্ক জনগোষ্ঠী। ঢাকায় পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত অবনমন হচ্ছে তা আশঙ্কাজনক। কাজেই ডায়রিয়া প্রতিরোধে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত ও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সক্রিয়তা কাম্য।
দেশে বছরে অন্তত দুবার ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। গরমে ও শীতে। গরমের মৌসুমে সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি বা মে মাসের শুরুতে ডায়রিয়ার প্রকোপ শুরু হয়। কিন্তু এবার কিছুটা আগে শুরু হয়েছে। গরম আসতে না আসতেই বিশেষ করে রাজধানীতে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা। এর পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। করোনা সংক্রমণ কমে এসেছে। অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই এখন সচল। স্বভাবত শিশু থেকে বয়স্ক সবারই বাইরে যাতায়াত বেড়েছে। বেড়েছে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয় গ্রহণের পরিমাণ। রাস্তার ধারে, ফুটপাতে কিংবা স্কুলের পাশের দোকান থেকে খাচ্ছে ভাজাপোড়া খাবার, ফুচকা। অসতর্কতা ও অসচেতনতায় পান করছে অনিরাপদ পানি। আবার আবহাওয়ারও একটা বিরূপ প্রভাব আছে। ক্রমেই বাড়ছে তাপমাত্রা। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। অনেক জায়গায় নির্মাণ উপকরণগুলো উন্মুক্তভাবে রেখে দেয়া এবং পানি ছিটিয়ে কাজ না হওয়ার কারণে রাজধানীতে বেড়েছে ধুলাবালির পরিমাণ। তদুপরি আছে নিরাপদ পানির সংকট। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানিকে ওয়াসা ‘নিরাপদ’ বললেও নানাভাবে তা দূষণের শিকার। বিশেষ করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মুগদা, শনির আখড়া, মানিকনগর, উত্তরখান, দক্ষিণখান, কড়াইল, মোহাম্মদপুর, মিরপুর প্রভৃতি এলাকার পানির অবস্থা বেশি খারাপ। সব মিলিয়ে রাজধানীতে অবনমন ঘটছে ডায়রিয়া পরিস্থিতির।
ডায়রিয়া বা কলেরা মোকাবেলায় দেশ বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কুড়িয়েছে সুনাম। সুচিকিৎসা নিশ্চিত এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ব্র্যাক কর্মীদের খাবার স্যালাইন তৈরির প্রণালি শেখানোর বিষয়টি হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। ডায়রিয়ায় মৃত্যু প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। বিশেষ করে আইসিডিআর,বির উত্তরোত্তর গবেষণায় ডায়রিয়া চিকিৎসায় নতুন অনেক দিক উন্মোচন হচ্ছে। বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশে সেগুলো প্রয়োগ হচ্ছে এবং তাতে যুগান্তকারী সুফলও মিলছে। কাজেই চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের শক্তির দিকগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। অতীত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করতে হবে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারের ডায়রিয়ার চিত্রটা একটু বেশিই ভয়ংকর। মূলত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পানি ও পানীয়জাতীয় খাবার, শরবত ইত্যাদি পান এবং গরমের কারণেই এটি হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন। কাজেই সবাইকে সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে প্রচারণা বাড়াতে হবে। যত্রতত্র অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পানি ও শরবত বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানির ৮০ শতাংশেই ডায়রিয়ার জীবাণুর (ই-কোলাই) উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এলেও অনিরাপদ পানির কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টিতে বিশেষ নজর দিতে হবে। চিকিৎসকরা ফুটিয়ে পানি পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এলপিজি গ্যাসসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখিতার প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে গ্যাস সংযোগবিহীন রাজধানীর বিভিন্ন ভবনের মানুষ পানি ফুটাতে অনেকটা অনীহ। সেজন্য গ্যাসের দামও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
বলা হচ্ছে, এবার তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগছে এমন রোগীর সংখ্যা বেশি। তারাই মূলত হাসপাতালে আসছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র। কাজেই তাদের বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো, খাবার স্যালাইন, আইভি ফ্লুইড স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সুবিন্যাসিত লোকবলের মাধ্যমে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায়ও আনতে হবে পরিবর্তন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও ডায়রিয়া থেকে বাঁচতে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটি প্রতিদিনকার কাজকর্মে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সবসময় সুপেয় পানি পানের ওপর জোর দিচ্ছে। শুধু কাগজে-কলমে বললেই হবে না, মানুষকে সচেতন করে তুলতে সক্রিয়ভাবে প্রচারণামূলক বিভিন্ন উদ্যোগও নিতে হবে। যেসব এলাকায় প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে, সেখানে কী ধরনের সমস্যা আছে, সেখানকার পানিতে কোন ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি মিলছে তা পুঙ্খাপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। নিতে হবে পরীক্ষালব্ধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
নাগরিকদের সুস্বাস্থ্যের পূর্বশর্ত নিরাপদ খাদ্য ও পানি। রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার সত্ত্বেও আমরা এখনো সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পানি নিশ্চিত করতে পারিনি। ভেজাল-মানহীন খাদ্য ও দূষিত পানির কারণে প্রতি বছর রাজধানীবাসী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ভুগছে অন্য দীর্ঘস্থায়ী রোগেও। ভেজাল ও মানহীন এসব খাবার গ্রহণ করে ভোক্তারা একদিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সুতরাং নিরাপদ খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষকে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। সেবা সংস্থাগুলোকে জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে। সর্বোপরি বাড়িয়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে চলমান ডায়রিয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন ঘটবে বলে প্রত্যাশা।










