ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা উদার বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করছে চলমান বৈশ্বিক সংকটটি। বাদ নেই ভারতও। আমি বলব, নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই দেশটির সরকারের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে রূপ নেবে। তবে এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের ভারতের অর্থনীতির আকার নিয়ে বাড়তি উচ্ছ্বাস অবশ্যই পরিহার করা প্রয়োজন।

অস্বীকারের উপায় নেই, ভারতের অর্থনীতি বেশ বড়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যানুযায়ী ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের দিক থেকে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। চীন (২৭ ট্রিলিয়ন ডলার), যুক্তরাষ্ট্রের (২৩ ট্রিলিয়ন ডলারের) বিপরীতে এর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। আর বাজার বিনিময় হারের ভিত্তিতে এর জিডিপির আকার ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। সেদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের পরেই দেশটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতি।

কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক আকার সামগ্রিক সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়নি। অনেকেই এটিকে সমস্যা হিসেবে দেখেন। এ সমস্যার একটা কারণ ভূগোল। বিসমার্ক বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই দিকে দুর্বল প্রতিবেশী দ্বারা পরিবেষ্টিত আর দুই দিকে মাছ (পড়ুন সাগর) দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভারতের অবশ্য এই সুন্দর বিচ্ছিন্নতা উপভোগের সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিম সীমান্তে ব্যাপকভাবে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, কালানুক্রমিকভাবে বৈরী এবং প্রায়ই সেনাশাসিত পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থাকতে হয়েছে তাকে।

আরো সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উত্তরাংশের প্রতিবেশী চীনও ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। দেশটি ভূখাণ্ডিক স্থিতিবস্থা প্রত্যাখ্যান করে হিমালয়ের বিরোধপূর্ণ ভূমি দখলের চেষ্টা করছে, পূর্ব দিকে ভূখণ্ড দাবি করছে এবং ভারতের সীমান্তঘেঁষে বিপুল সেনা উপস্থিতির সমাবেশ ঘটাচ্ছে। কাজেই ভারতের জন্য দীর্ঘ উপদ্বীপ-উপকূলজুড়ে প্রতিবেশী হিসেবে সামুদ্রিক মাছ ও জলজ প্রাণী থাকলেও স্থলভাগে দুই দিক থেকে দেশটি বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

একটা বড় অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভারতকে পর্যাপ্ত সামরিক সম্পদ গড়ে তুলতে বেগ পেতে হয়েছে। বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের তুলনায়। স্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ঘাটতি থাকা দেশ দুটির প্রতিরক্ষা ব্যয় অনুমান করাটা ভয়ানক কঠিন। তবে এটুকু আন্দাজ করা যায়, দুই প্রতিপক্ষের বার্ষিক সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যয় ভারতের (৭০-৭৫ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে তিন গুণের বেশি হবে। তদুপরি কার্যকর ব্যবধান আরো বেশি হতে পারে। কারণ জনশক্তির বিপরীতে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বেশির ভাগটাই সামরিক প্রযুক্তিতে নিঃশেষিত হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতের অর্থনীতি বড় হতে পারে কিন্তু বিপজ্জনক ভূগোল ও অভ্যন্তরীণ নীতিগুলো দেশটিকে সামরিকভাবে নাজুক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে।

এরপর আসে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকারের প্রশ্নটি। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সৌমিত্র চ্যাটার্জি এবং আমাদের একজন (সুব্রামানিয়ান) যেমনটা দেখিয়েছেন, ভোগের জন্য ভারতের মধ্যবিত্তের বাজার জিডিপির তুলনায় ছোট। কারণ বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত, আবার সচ্ছল লোকদের মধ্যে বিপুল অর্থ সঞ্চয়ের প্রবণতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের ভোক্তাবাজারের কার্যকর আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও কম, যা চীনের তুলনায় বেশ ছোট এবং প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিশ্ব রফতানি বাজারের তুলনায় আরো অনেক ছোট।

তবে আপনি ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক কৌশল থেকে এটি জানতে পারবেন না। অন্যত্র আমরা যেমন বলেছি, ভারত আসলে গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরমুখী মোড় নিয়েছে। সেটি করেছে শুল্ক বাড়িয়ে, কিছু প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিয়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গতিশীল অংশ এশিয়ায় আঞ্চলিক একীভূতকরণের চুক্তি থেকে নিজেকে বিরত রেখে। 

মজার বিষয়  হলো, এই অন্তর্মুখী মোড় অর্থনৈতিক ব্যর্থতার ফল ছিল না। ১৯৯০-এর দশক থেকে যখন বাণিজ্য উদারীকরণ করা হয়, প্রতি বছর ভারতের অর্থনীতি গড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করে বেড়েছে। ডলারে পণ্য  ও সেবা রফতানি গড়ে বার্ষিক ১৩ শতাংশ বেড়েছে, যে হারটি কেবল চীন ও ভিয়েতনাম অতিক্রম করতে পেরেছে। তবে এ সাফল্য ট্রাইড অ্যান্ড টেস্টেড পলিসির পক্ষে অনেকটা অকার্যকর, পরিত্যক্ত প্রমাণ হয়েছে; যেটি ১৯৫০ সালের পর তিন দশক ধরে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

সরকারের সিদ্ধান্তের একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, এটি আকারের বিভ্রমে নিমজ্জিত হয়েছে। বারবারই দাবি করা হয়েছে, ভারতের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি তিনটি ‘ডি’-এর ভিত্তিতে প্রোথিত। আর তা হলো গণতন্ত্র (ডেমোক্রেসি), জনমিতি (ডেমোগ্রাফি) ও চাহিদা (ডিমান্ড)। তদুপরি সিদ্ধান্ত টানা হয়েছে যে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ভর্তুকি ও সুরক্ষার মাধ্যমে এই অধরা চাহিদা কাজে লাগাতে পারবেন।  

আকারের উত্তেজনা নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। মানবিক বিপর্যয় সত্ত্বেও ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা বিষয়ে ভারত সরাসরি নিন্দা জ্ঞাপনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এটা এক অদ্ভুত নিয়তি সৃষ্টি করেছে: গণতান্ত্রিক ভারত পরোক্ষভাবে নিজেই একটি কর্তৃত্ববাদী অক্ষের দিকে ঝুঁকেছে, যে অক্ষের দুটি সদস্য চীন ও পাকিস্তান হলো তার বৈরী প্রতিবেশী। তবে ভারত হিসাব কষেছে, যেহেতু চীনের উত্থান মোকাবেলা করা অপরিহার্য সেহেতু রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে তার অবস্থান পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিজস্ব সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলবে না। 

অবশ্য বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার হামলার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া স্বাধীনতা প্রকাশের চেয়ে দুর্বলতা প্রতিফলনের বেশি কিছু। যদি ভারত পছন্দ করার ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে মুক্ত থাকত তাহলে দেশটি অবশ্যই বিশেষ করে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ভূখাণ্ডিক সার্বভৌমত্বের অলঙ্ঘনীয়তা সমুন্নত রাখত।

এই কঠিন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় সন্ধানে প্রয়োজন তাত্পর্যপূর্ণ প্রচেষ্টা। আরো স্পষ্টভাবে বললে, অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতকে রাশিয়ার ওপর কম নির্ভর করতে হবে। রাশিয়া নিজেই এত ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং চীনের কাছে এত নির্ভরশীল হতে ইচ্ছুক যে দেশটিই তাদের নির্ভরযোগ্য, আস্থাভাজন সরবরাহকারীরূপে রয়ে যাবে। আরো সূক্ষ্মভাবে বললে, অধিক দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করা এবং সামরিক ব্যয়ের মূল্য সর্বোচ্চকরণের মাধ্যমে দেশটিকে তার প্রতিরক্ষা সম্পদ বাড়াতে হবে। শেষোক্ত বিষয়ের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অদক্ষতা, ১৯৮০-এর দশকের কেলেঙ্কারির পর ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা এবং সূক্ষ্ম ও জটিল হার্ডওয়্যারের চেয়ে কর্মকর্তাদের সম্পদ বণ্টনে ভারসাম্যহীনতার মতো প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরার বিষয় জড়িত। 

অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের উচিত তার সীমানার বাইরে তাকানো এবং বিশ্ববাজারে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা এবং সাম্প্রতিক অগ্রগতিগুলো তেমনটি করতে একটা ব্যতিক্রমী সুযোগ সৃষ্টি করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শিল্প-কারখানা পরিচালনাকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেবে, যেটি চীন থেকে উৎপাদন কার্যক্রম স্থানান্তরের বিদ্যমান চাপ আরো তীব্রতর করবে। এ সুযোগ ধরার ক্ষেত্রে ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, যদি দেশটি সত্যিই এটি ধরতে চায়।

ভারতকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে এবং একটি মাঝারি শক্তি হিসেবে তার বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সংগতি রেখে কাজ করতে হবে। সময়ান্তরে জোরালো ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতকে বড় শক্তিতে পরিণত করবে, যা দেশটি হতে চায়; ততক্ষণ পর্যন্ত দেশটিকে অবশ্যই অর্থনীতির আকারের বিভ্রম ভুলে যেতে হবে এবং নিজেকে কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে সন্নিবেশিত করতে হবে। 

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান: ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো, সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের নন-রেসিডেন্ট ফেলো, ভারত সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

জোশ ফেলম্যান: জেএইচ কনসাল্টিংয়ের পরিচালক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির