প্রারম্ভিক শৈশবে শিশুর পুষ্টি পূরণের জন্য প্রয়োজন বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বড় ঘাটতি দৃশ্যমান। তথ্য বলছে, ছয় মাস থেকে ২৩ মাস বয়সী ৬৬ শতাংশ শিশু নিয়মিত খাবারে ন্যূনতম বৈচিত্র্য পায় না। এর মধ্যে দরিদ্র পরিবারের ৭৮ শতাংশ এবং ধনী পরিবারের ৫২ শতাংশ শিশু বৈচিত্র্যপূর্ণ পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে বিকাশ পর্যায়ে নানা প্রতিবন্ধকতায় বেড়ে উঠছে শিশু। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে, যা একটি সুস্থ, সবল ও অধিক কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ার পথে বাধা। পুষ্টি উন্নয়নসংক্রান্ত নানা কর্মসূচি সত্ত্বেও একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। স্বভাবত প্রশ্ন উঠছে কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে। সুতরাং শিশুর অপুষ্টি রোধে বিদ্যমান পুষ্টি কার্যক্রম পর্যালোচনাপূর্বক নতুন করে বিন্যাস করা জরুরি।

দেশে জাতীয় পুষ্টি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য সরকারিভাবে গাইডলাইনও তৈরি করা হয়েছে। সব উপজেলা কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। নিউট্রিশন সাপোর্ট অফিসারও রয়েছে জেলা পর্যায়ে। জন্মলগ্ন থেকেই অপুষ্টি দূরীকরণের বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিছুটা উন্নতি হলেও দেশের নবজাতক, শিশু-কিশোরসহ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো স্থায়ীভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। এ অপুষ্টি দূরীকরণে সরকারের ২২টি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তবে মোটা দাগে ১৩টি মন্ত্রণালয় এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করছে। তথ্য বলছে, শুধু ২০১৬-১৭ অর্থবছরেই পুষ্টিসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে মোট ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল সরকার, যা দেশের মোট জিডিপির ১ শতাংশ। ওই অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এ ব্যয়ের অংশ  ৯ শতাংশ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে পুষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৩০০ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে ৩১টি। এ ৩১ পরিকল্পনার মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে ১৯টি। এত কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও শিশুর পুষ্টিগত উন্নয়ন আশানুরূপ নয়, যা হতাশাজনক। কাজেই চলমান পুষ্টি কার্যক্রম নিয়ে পুনর্ভাবনা এখন সময়ের দাবি। 

বিগত সময়ে দেশে শিশু স্বাস্থ্য সূচকে বেশকিছু অর্জন আমাদের আছে। আগের চেয়ে শিশু মৃত্যুহার কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। প্রায় প্রতিটি শিশুই এসেছে টিকার আওতায়। শিশুদের চিকিৎসাসেবায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। তবে শিশুদের পুষ্টিগত উন্নয়ন আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বয়স অনুযায়ী উচ্চতা বাড়েনি বা খর্বতা রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৮ শতাংশের, শারীরিকভাবে দুর্বল বা কৃশকায় শিশু ১০ শতাংশ ও বয়স অনুযায়ী ওজন কম ২৩ শতাংশ শিশুর। এগুলো বহুমাত্রিক অপুষ্টির প্রকাশ। বর্তমানে শিশুর পুষ্টিহীনতার পেছনে নানা ফ্যাক্টর কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম খাবারে বৈচিত্র্যহীনতা, বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে যা যথার্থভাবে উঠে এসেছে। বাড়ন্ত বয়সে শিশুকে বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার দেয়ার কথা বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনসচেতনতার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী। সময়ান্তরে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও অনেক পরিবারে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা দূর হয়নি। দরিদ্রতার কারণে অনেকেরই পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। কভিডের অভিঘাত এবং সাম্প্রতিক নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে এটি আরো অবনতিশীল। আবার অনেকের কেনার সামর্থ্য থাকলেও পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পুষ্টিসম্মত বিচিত্র খাবার সম্পর্কেও কারো কারো মধ্যে অসচেতনতা বিরাজমান। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাড়লেও বিশেষত গ্রামীণ পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপ্রতুল ও দুর্বল। এটিও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু এলাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকিতে। এতে সেসব অঞ্চলে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের লভ্যতা কমছে। সর্বোপরি সরকারি কর্মসূচিগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বরাদ্দকৃত অর্থে ভারসাম্যহীনতারও একটা বিরূপ প্রভাব আছে। সব মিলিয়ে শিশুর পুষ্টিগত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।

যথাযথ পুষ্টি পেয়ে সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর মানবাধিকার। এটি টেকসই উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি বৈশ্বিক পুষ্টি উন্নয়ন টার্গেট ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন দেশ নিজেদের পুষ্টি কার্যক্রম ও নীতি-পরিকল্পনা সাজিয়েছে। কিছু দেশ দ্রুততার সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে। যেমন ভারতের মহারাষ্ট্র। রাজ্যব্যাপী পরিচালিত পরিকল্পিত পুষ্টি কার্যক্রমে সেখানে ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অন্তত দ্রুত হারে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমে এসেছে। পেরুতে নাগরিক আন্দোলনের ফলে সরকারের পক্ষ থেকে অপুষ্টি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে সেখানেও শিশুদের পুষ্টিগত উন্নয়ন ঘটে। সরকারি নীতিমালার সুফল হিসেবে ব্রাজিলেও খর্বতা ও কৃশকায়ত্ব কমে এসেছে। শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিতে সাম্প্রতিক সময়ে আরো কিছু দেশ ভালোও করেছে। যেমন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া, গুয়াতেমালা, মালাউই, তানজানিয়া ও নেপাল। দেশগুলোর সাফল্যের একটিই দাওয়াই। সেটি হলো নিজস্ব প্রেক্ষাপটে উপযোগী যথাযথ ও লক্ষ্যাভিমুখী কৌশল গ্রহণ, প্রমাণভিত্তিক নীতি হস্তক্ষেপ, নিবিড় তদারকি, পারস্পরিক সমন্বয়, যথাযথ জায়গায় অর্থের ব্যবহার এবং জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে জোরালো পুষ্টি কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রারম্ভিক শৈশবেই শিশুদের খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে। এ সময়ে শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে ও টিকা দিতে হবে, এটা নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পুষ্টির বিষয়ে ঘাটতি রয়ে গেছে। আমরা দেখছি, এমনকি অনেক সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও জানে না কোন খাবার কখন শিশুকে দিতে হবে। কোন খাবারে কী ধরনের পুষ্টিগুণ রয়েছে। কিংবা জানে না হরেক রকম শাকসবজি দিয়ে কীভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার প্রস্তুত করতে হবে। বলতে গেলে সচেতনতার অভাবে ধনী পরিবারের অনেক শিশুও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। আবার সচেতনতা থাকলেও দরিদ্র পরিবারগুলো আর্থিক সক্ষমতার অভাবে অনেক সময় ডাল-ভাত ছাড়া অন্য বৈচিত্র্যময় খাদ্য শিশুদের জন্য জোগাতে পারে না বা পারছে না। কাজেই সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বস্তির মতো দরিদ্রপ্রবণ এলাকাগুলোয় পুষ্টি কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। আমরা দেখছি, প্রারম্ভিক শৈশবের সময়ে পুষ্টি কার্যক্রম কম। এটা আরো বাড়াতে হবে। তদুপরি বর্তমানে প্রচার-প্রচারণার মতো পরোক্ষ কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে পুষ্টি খাতের সিংহভাগ। বিপরীতে সরাসরি খাদ্য বিতরণ ও ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, এমআইএনটি পাউডার, মিনারেল খাওয়ানোর মতো প্রত্যক্ষ পুষ্টি কার্যক্রমে ব্যয় হয় সামান্য। উন্নতি ঘটাতে হবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তারও।

আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। বহুমাত্রিক অপুষ্টি নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন শিশুর জন্য অদূরভবিষ্যতে একটি দ্রুত রূপান্তরশীল অর্থনীতির উপযোগী উৎপাদনশীল জনশক্তি হয়ে ওঠাটা কঠিন। কেননা পুষ্টিহীনতার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সংযোগ প্রত্যক্ষ। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ডিসকোর্সের জায়গা থেকে বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। জোরালো পুষ্টি কার্যক্রম ও জনসাধারণের সচেতনতায় শিশুদের পুষ্টিগত উন্নয়ন ঘটুক—এটিই প্রত্যাশা।