আবারো বেনাপোল বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবারে ঘটা আগুনে পুড়েছে আমদানি পণ্য ব্লিচিং পাউডারবাহী ভারতীয় পাঁচটি ট্রাক। তথ্য বলছে, গত এক যুগে বন্দরটিতে বড় ধরনের ১২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ঘটনা ঘটলে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি কিছু সুপারিশ করে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ তেমন একটা সচেষ্ট নয়। বেনাপোল দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পাদন হয় এ বন্দরের মাধ্যমে। এটি সরকারের বড় রাজস্বের উৎসও। কিন্তু বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যেভাবে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তা হতাশাজনক। এর দায় এড়াতে পারে না কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি যে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সেটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে বন্দরে অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের বিকল্প নেই।
বেনাপোল বন্দরের যাত্রা দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। ১৯৭২ সাল থেকে এ বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চলছে। এ বন্দর থেকে ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক শহর কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৫ কিলোমিটার। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় প্রথম থেকেই এ পথে বাণিজ্যে আগ্রহ বেশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের। তবে নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় বেশ কয়েক বছর ধরে বেনাপোল বন্দরে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বারবার অগ্নিকাণ্ডে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। উপর্যুপরি অগ্নিদুর্ঘটনার পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। সময়ান্তরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ানো হয়নি অবকাঠামো সক্ষমতা। কাগজ-কলমে বন্দরে আমদানি পণ্যের ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার টন। কিন্তু সেখানে সবসময় আমদানি পণ্য থাকে প্রায় দেড় লাখ টন। বন্দরে জায়গা সংকটে অনেক সময় সাধারণ পণ্যাগারে কেমিক্যাল পণ্য রাখা হয়। অগ্নিদুর্ঘটনার এটিও একটা কারণ। আবার অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ঘাটতি দৃশ্যমান। বন্দরে নেই পর্যাপ্ত জনবল, অভাব রয়েছে সুরক্ষা সরঞ্জামের। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে নেই কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও। ফলে আগুন ধরলে নেভানোর আগেই সব পুড়ে শেষ হয়ে যায়। এবারো তাই হয়েছে। বলতে গেলে জনবল সংকট, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে ঘটছে দুর্ঘটনা।
বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের দিকের অংশটি হলো পেট্রাপোল। ২০০৮ সালে স্থলবন্দর ঘোষণা করে এটিকে নেয়া হয় দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এরপর সেখানে আধুনিক মানের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে সুপরিসর এসি ওয়্যারহাউজ। সেই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। সুষ্ঠুভাবে বন্দর পরিচালনার জন্য সেখানে একটি সুসংহত চেকপোস্ট নির্মাণ করা হয়েছে। জায়গায় জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা। অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার জন্য রাখা হয়েছে সব ধরনের ব্যবস্থা। সর্বোপরি সীমান্তরক্ষী বিএসএফের মাধ্যমে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। ফলে সুন্দর ব্যবস্থাপনায় বন্দরটিতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভবপর হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যাগারে জায়গার অভাবে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে মূল্যবান আমদানি পণ্য। এতে একদিকে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। আবার চুরির ঘটনাও ঘটছে। একই সঙ্গে সাধারণ পণ্যের সঙ্গে কেমিক্যাল পণ্য রাখার কারণে ঘটছে অগ্নিকাণ্ডও। এ-যাবৎ ঘটা অগ্নিকাণ্ডে পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন অনেক আমদানিকারক। নিয়ম অনুযায়ী আমদানি করা পণ্য বন্দরে রাখার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুমতি দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব পণ্যের বীমা করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় আমদানিকারকরা তাদের আমদানি করা পণ্যের শুধু ট্রাকের ওপর কোনো ক্ষতি হলে তার ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকেন বীমা কোম্পানির কাছ থেকে। গুদামে রাখা পণ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় বীমা করা হয় না। আবার বন্দর আইনেও আলাদাভাবে ক্ষতিপূরণের বিধান নেই। ফলে বিভিন্ন আইনি জটিলতায় অর্থ না পেয়ে ব্যবসা বন্ধ হয়েছে অনেকের। কাজেই সর্বাগ্রে বন্দরের অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পণ্যের বীমা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলায় জোরদার করতে হবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যের পরিসর বিবেচনায় তা যথেষ্ট নয়। বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন জায়গা অধিগ্রহণ, পণ্যাগার বাড়ানো, চুরি রোধে সিসি ক্যামেরা ও বন্দরের পাশে প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। এ উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেগবান করার স্বার্থে বেনাপোলকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। এটা আমলে নেয়া দরকার। তথ্য বলছে, ১৬৩ জন আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী পিমার ১০৩ জন ও এপিবিএন নামে একটি নিরাপত্তা সংস্থার ২০ সদস্য বন্দরে আমদানি পণ্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় কাজ করছেন। কিন্তু বিদ্যমান জনবল চাহিদার তুলনায় তা অনেকাংশে কম। সুতরাং জনবল আরো বাড়াতে হবে। শুধু জনবল বা অবকাঠামো বাড়ানো নয়, ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নও জরুরি। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের আরো সচেষ্টতা প্রয়োজন।
আমরা দেখছি বেনাপোল বন্দরে বারবার আগুন লাগলেও কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পান না। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী অন্য বন্দরে চলে গেছেন। যারা এখনো আছেন, তাদের আস্থায়ও চিড় ধরছে। এ অবস্থায় শুক্রবার যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অবসান ঘটাতে হবে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, শৈথিল্য, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার। সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকাই বেনাপোল বন্দরে বাণিজ্য কার্যক্রম বেগবান হবে, এটাই প্রত্যাশা।










