রানা প্লাজা ধসের নয় বছর পূর্ণ হলো। ২০১৩ সালের ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ২০০ জনের মধ্যে সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে, আহত শ্রমিকদের ৬৭ শতাংশ এখনো শারীরিক অক্ষমতার কারণে কোনো ধরনের কাজ করতে পারেন না। হতাশাজনক বিষয় হলো, নয় বছরেও আহত ও নিহত শ্রমিকরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি। ঘটনাটির বিচারকাজও শেষ হয়নি। রানা প্লাজা ধস-পরবর্তী দেশের পোশাক শিল্পে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চলে। এতে পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ঘটলেও ভুক্তভোগীরা কোনো ধরনের সহায়তা পাননি। অথচ সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিশ্রুতি ছিল রানা প্লাজা ধসে নিহতদের পরিবার ও আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন করা হবে। নয় বছর অতিবাহিত হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়াটা কাম্য নয়। এক্ষেত্রে শ্রম মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।

রানা প্লাজা ধসের পর হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে আসে। সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে বেশকিছু আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের দাবির মুখে পোশাক কারখানার মালিকরাও শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ব্যবসায়ীদের তত্পরতায় বিদেশী ক্রেতারাও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তায় হাত বাড়ান। তবে এখনো ব্যবসায়ী, বিদেশী ক্রেতাদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন শ্রমিকরা। শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। সেখানে ক্ষতিপূরণের কথা আছে কিন্তু পুনর্বাসনের কথাটা এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পুনর্বাসন না হলে কী সমস্যা হয়, সেটা এরই মধ্যে দেখা গেছে। ক্ষতিপূরণের অংকটাও অনেক কম। বাংলাদেশের জনগণের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু একজন শ্রমিক কারখানায় মৃত্যুবরণ করলে তার ক্ষতিপূরণ মাত্র ২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের মাথাপিছু আয়ের চেয়েও একটা মানুষের জীবনের মূল্য কম। সেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা মাপকাঠি হওয়া দরকার। ক্ষতিপূরণের মানদণ্ডটা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একজন শ্রমিকের আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহত হলে তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাকে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে। কর্মীর হাত যেন ভিক্ষুকের হাতে পরিণত না হয়, সেই ধরনের উদ্যোগ সবাই প্রত্যাশা করেন। যেহেতু এরই মধ্যে বিদ্যুৎ, আগুন ও ভবনের নিরাপত্তার বিষয়গুলোয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়েছে, তাই এ মুহূর্তে অন্য বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়াটা অপরিহার্য। প্রায়ই ‘পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা’ কথাটি ব্যবহার করা হয়, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই স্বাস্থ্যের দিকটা উপেক্ষা করা হয়। অবাক করার মতো বিষয় যে, এ শিল্প কেন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত শ্রমিকদের দীর্ঘদিন কাজ করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে না। শ্রমিকরা ৩৫-৪০ বছর বয়সে এ খাতের কাজ ছেড়ে চলে যান। অথচ এ বয়সে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল অবস্থায় থাকার কথা। কিন্তু ঘটছে এর বিপরীত। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার এখনই সময়।

রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পেছনে মালিকপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতি ছিল। বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এমন ঘটনায় আজ পর্যন্ত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি একটিও। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এসব হরহামেশা ঘটত না। দেশের আইনের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে এ ধরনের ঘটনার বিচার করতে হবে, যাতে এমন ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রেও আর হেলাফেলা নয়। জীবন অমূল্য। টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ হয় না। তার পরও কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারালে তখন টাকা দিয়েই দায় পরিশোধ করতে হয়। কর্মস্থলে নিহত কোনো শ্রমিকের জীবনের ক্ষতিপূরণ কত হবে তার একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। আমাদের দেশেও কর্মস্থলে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, তা নির্ধারণের জন্য হাইকোর্ট একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। ওই কমিটিতে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তারা বিবেচনা করেছিলেন, একজন কত বছর কাজ করেন, এ সময়ে কত আয় করেন, তার পরিবারের সদস্যদের কত ক্যালরি খাদ্য প্রয়োজন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খরচসহ নানা সূচক বিবেচনা করে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। নিহত বা আহতের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ কঠিন কাজ, কোনো কিছুতেই এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। তার পরও হাইকোর্ট থেকে গঠিত কমিটি যে হিসাব দিয়েছিল সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি, যা দুঃখজনক।

রানা প্লাজা ধসের নয় বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এ ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি হয়নি, বিচার প্রক্রিয়া চলছে ধীরগতিতে, আইএলও কনভেনশন ১২১-এর আলোকে ক্ষতিপূরণ আইন সংশোধনে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই এক স্থানে ১ হাজার ১৩৭ জনের মৃত্যু, তিন শতাধিক নিখোঁজ, সহস্রাধিক পঙ্গুত্বের ঘটনা ঘটার পরও ট্যাম্পাকো, আসওয়াদ কম্পোজিট, মাল্টিফ্যাবস গার্মেন্টস, হাশেম ফুড, লিলি কসমেটিকসের মতো অসংখ্য কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, বয়লার বিস্ফোরণে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত আছে। জীবিকার জন্য কাজ করতে এসে জীবন হারানো মানবিক সমাজের বৈশিষ্ট্য নয়। তাছাড়া অসময়ে একজন কর্মক্ষম মানুষের মৃত্যু তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারকে অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়, যা সমাজের ভারসাম্যহীনতা বাড়ায়, ব্যক্তিগত অতি মুনাফা প্রবণতার দায় রাষ্ট্রের কাঁধে চাপে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অবহেলা, বিচারহীনতা এবং দুর্ঘটনার দায় থেকে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেয়ার নীতির কারণে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুর মতো অমানবিক ঘটনা অব্যাহত আছে। এক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

কারখানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সব পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করা জরুরি। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ কাজে লাগিয়ে সব কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালু করতে হবে। পাশাপাশি রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিপূরণ পূর্বনির্ধারণ করে রাখা বাঞ্ছনীয় নয়। বরং দুর্ঘটনার ধরন ও ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিপূরণের ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা উচিত। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নজির অনুসরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী আইন প্রণয়ন জরুরি। এতে মালিকপক্ষের অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।