২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এজন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি ‘দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১): রূপকল্প ২০৪১’। লক্ষ্য, ২০৪১ সালে ৯ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার, দারিদ্র্যের হার নেমে আসবে ৫ শতাংশে। কিন্তু অর্থনীতির এসব লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়ক তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রাক সমীক্ষা করা হলেও যেসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে সঠিক প্রক্রিয়ায় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে না। আবার সমীক্ষার সঙ্গে বাস্তবতারও সংযোগ ঘটছে না। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে দেশের অনেক সড়ক-মহাসড়ক। এমন প্রবণতা দেশের টেকসই সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে অন্তরায়। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা প্রণয়নের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া সড়ক নির্মাণ পরিকল্পনা গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বাস্তবতা এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রকল্প প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। 

নকশার ত্রুটি, অধিক ব্যয়, মানহীন কাজের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণে নতুন যুক্ত হওয়া যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ ও দুর্বল পরিকল্পনার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এতে অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত উপযোগ মিলছে না। দেশের সড়ক-মহাসড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ও সংস্কারে একের পর এক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা পর্যায়েই নানা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে সড়ক ব্যবহারে ভবিষ্যৎ ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টিও। আবার কখনো কখনো সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নির্মাণ পর্যায়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব, তৈরির পর সড়কের যানবাহন চলাচলে নানা ধরনের অনিয়ম মিলিয়ে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই উপযোগিতা হারিয়ে ফেলছে সড়ক-মহাসড়ক। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ বা মেরামতের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা থেকে তা গ্রহণ করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সড়ক বা সেতুর নির্দিষ্ট মেয়াদকালের এক-চতুর্থাংশ সময় পেরোনোর আগেই সেটি উপযোগিতা হারাচ্ছে। চার লেনের সড়ক নির্মাণ শেষ করতে না করতে ছয় লেনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, বাড়তি গাড়ির চাপ সামলাতে গিয়ে দেখা দিচ্ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনাও। আবার সড়ক নির্মাণের সময় ভার বহনের সক্ষমতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। এতে সড়কের স্থায়িত্ব বিনষ্ট হচ্ছে দ্রুত। এদিকে মৌসুমি আবহাওয়া বিবেচনা ব্যতিরেকে সড়ক নির্মাণ করায় বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তা ভেঙে বা দেবে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নকশা বা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন ঠিকমতো যাচাই-বাছাই করা হয় না। এটি করার দায়িত্ব প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। মানে বাস্তবায়নকারী সংস্থার। প্রকল্প কাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোও ফাঁকি দেয় অনেক সময়। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে নিজে না গিয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা করার ঘটনা আছে। এ কারণেও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে গিয়ে নানা পরিবর্তন আনতে হয়, এতে ব্যয় বেড়ে যায় হ্রাস পায় উপযোগ। এর কারণ অনুসন্ধানে দফায় দফায় বৈঠক করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সুপারিশ আর নির্দেশনার পরও সুফল মেলেনি এখনো। ভুল পরিকল্পনায় সওজের রাস্তাঘাটে খরচ ও ব্যয় বাড়ছে। ধরা পড়ছে ডিজাইনের ত্রুটি। ভুল নকশায় নির্মাণ এবং পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়নি কিন্তু বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে উঁচু-নিচু অবস্থা। অর্থাৎ রাস্তার বিভিন্ন অংশ ফুলে গেছে, যাকে বলে ‘রাটিং’। এ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে খানাখন্দের। অতিরিক্ত ওজন রাস্তার চূড়ান্ত ক্ষতি করে। এটা জানার পরও বিআরটিএ বছর বছর এসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানকে ফিটনেস সনদ দিয়ে যাচ্ছে। সরকারও রাস্তায় ২২ টন ওজন নিয়ে এসব গাড়িকে চালানোর অনুমতি দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশ এটি অনুমোদন দেয়নি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, পাকিস্তানেও ১৬ টনের বেশি ওজনের গাড়ি রাস্তায় চলতে দেয়া হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে দেয়া হচ্ছে, যা বন্ধ করা জরুরি। তবে এ কথাও সত্য, রাতারাতি দেশের বিদ্যমান দুই এক্সেলের ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানগুলোকে বদলে ফেলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি বড় বড় ট্রাক কিংবা ট্রেইলার চালানোর উপযোগী রাস্তাও আমাদের দেশে কম। একইভাবে মাঝারি ট্রাকের বদলে বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহার করলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিরও আশঙ্কা রয়েছে। ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সঠিক ও আধুনিক নকশা প্রণয়ন এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জোর দিতে হবে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে।

উন্নয়নশীল থেকে উন্নত হওয়ার পথে থাকা অন্য দেশগুলো সড়ক অবকাঠামোয় যেভাবে এগিয়ে, সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের যোগাযোগ অবকাঠামো সূচকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। একই সূচকে মালয়েশিয়ার অবস্থান ৩৩, থাইল্যান্ড ৪১ ও দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ আছে ৭২ নম্বরে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাও বাংলাদেশের ওপরে আছে। সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। এমন দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা রেখে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পণ্য পরিবহন প্রধানত সড়কনির্ভর। অথচ সেই সড়কেই লেগে থাকে যানজট ও ধীরগতি। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্বলতায় বিঘ্নিত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। বাড়ছে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও। বিশ্বব্যাংকের ‘মুভিং ফরোয়ার্ড: কানেক্টিভিটি অ্যান্ড লজিস্টিকস টু সাসটেইন বাংলাদেশিজ সাকসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, যানজটের কারণে একটি ট্রাক গড়ে চলতে পারছে ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার। একটি পণ্যের যে দাম, তার সাড়ে ৪ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে শুধু পরিবহন খরচে।

বাংলাদেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সিংহভাগই সড়কনির্ভর। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে পণ্য ও মানুষের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। যানজটে নাকাল হচ্ছে মানুষ। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে হতাহতের মিছিল। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে লাগছে অতিরিক্ত সময়। বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ব্যয়, অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে যার খেসারত দিতে হচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের লাইফলাইন হলো মহাসড়ক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, টেকসই মহাসড়ক গড়ে তুলতে পারলে প্রবৃদ্ধির হার আরো বেশি হতে পারত। বাংলাদেশে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের প্রায় পুরোটাই হচ্ছে সড়কপথে। দুর্বল সড়কের কারণে এসব পণ্য বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কিংবা উৎপাদক থেকে বন্দরে পৌঁছাতে সময় বেশি লাগছে। ফলে এখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। দুর্বল সড়ক অবকাঠামো এশিয়ান হাইওয়ে, সাসেক করিডরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক করিডরে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক করিডরগুলোর মাধ্যমে চীন, ভারত, মিয়ানমার, ভুটান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে সড়ক নির্মাণও করা হচ্ছে। কিন্তু এগুলো মানসম্পন্ন না হওয়ার কারণে যখন করিডরগুলো চালু হবে তখন সেসব করিডরের ট্রাফিকের চাপ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো কতটা নিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যানবাহনের বৃদ্ধি, ভার বহন সক্ষমতা প্রভৃতি বিষয়ে যথাযথ সমীক্ষা ও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। বুয়েট সরকারকে সহায়তা জোগাতে পারে। সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে বিদ্যমান গাইডলাইনটিরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। অর্থনীতি ও মানুষের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়কে গাড়ির চাপ, ভার বহন ব্যবস্থাপনা, এর ব্যবহার সংক্রান্ত বিস্তারিত গবেষণাপূর্বক একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড লাইন প্রণয়ন আবশ্যক। যেকোনো সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে সেটি অনুসরণ করতে হবে। কত শতাংশ হারে গাড়ি বাড়বে, কেমন হবে ভবিষ্যতে সড়ক ব্যবহারের হার, কী ধরনের গাড়ি চলবে ইত্যাদি বিষয় আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণে মানের প্রশ্নে আপস করা চলবে না। পরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক অবস্থা থেকেই তদারকি বাড়াতে হবে। যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া বা ত্রুটিপূর্ণ সমীক্ষায় যেন কোনো সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।