সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন যেমন ক্রমান্বয়ে বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর আমদানিনির্ভরতা। পরিসংখ্যানে কিছুটা গরমিল থাকলেও গত চার-পাঁচ বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন ১৭-১৮ লাখ টনে মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে (বিবিএস, ২০১৭, ২০১৯)। বিপরীতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে গত পাঁচ বছরে আমদানির পরিমাণ প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যচিত্রে বাংলাদেশে গত এক দশকে পেঁয়াজের আবাদি জমি, উৎপাদন ও ফলন ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সবই প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যমতে ২০২১ সালে ২ দশমিক ৩৭ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ টন, যা উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উন্নীত করেছে। কিন্তু এত উৎপাদনের পরও দেশে পেঁয়াজের সংকট এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে; যা কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য সত্যিই দুশ্চিন্তার কারণ।  

একটু তলিয়ে দেখলেই পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, এভাবে উৎপাদন বাড়ার পরও পেঁয়াজ সংকটের মূলে রয়েছে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ব্যাপক বৃদ্ধি। গত এক দশকে দ্বিগুণের বেশি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমদানিও বেড়েছে প্রায় আট গুণ, যা আমাদের এ ক্রমবর্ধমান চাহিদার বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়

কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২০-এর তথ্যমতে ২০২০ সালে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল ১৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন। যেহেতু পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য তাই মোট উৎপাদনের শতকরা ২৫ ভাগ সংগ্রহোত্তর অপচয় হিসেবে ধরলে ব্যবহারের উপযোগী পেঁয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৬৫৫ লাখ টন। অন্যদিকে মাথাপিছু পেঁয়াজের বর্তমান ব্যবহার ৩২ গ্রাম হিসেবে নিট ভোগ্যপণ্য হিসেবে মোট চাহিদা দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৮৬ লাখ টন। তাছাড়া বীজ উৎপাদন, মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত ও ওষুধ শিল্পে পেঁয়াজের ব্যবহার যোগ করলে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক মোট চাহিদা প্রায় ২২ লাখ টন।

প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় ৬ দশমিক ৪১ লাখ টন, যার মূল্য ৩৩৩ মিলিয়ন ডলারের অধিক। আমদানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে পেঁয়াজের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যও বাড়তে থাকায় দেশের আমদানি ব্যয় প্রকৃত অর্থেই বেড়ে চলেছে, যার রাশ টানা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

পেঁয়াজের দেশীয় উৎপাদন ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার ব্যবধান কমাতে দেশের সব নীতিনির্ধারক, গবেষক, কৃষিজীবী ও কৃষককে একযোগে কাজ করতে হবে। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলে শিগগিরই আমরা পেঁয়াজ বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত হব। এজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেয়া দরকার:

উফশী জাতের বীজ ব্যবহার ও উন্নত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন: বাংলাদেশে পেঁয়াজের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ১০ দশমিক ৫৬ টন হলেও কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের ফলন মাত্র ৯ টন। অন্যদিকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সেল কর্তৃক উদ্ভাবিত উন্নত জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১৯ টন, এমনকি হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ হলে এর উৎপাদন ৩৫ টন বা তারও বেশি হতে পারে। কাজেই পেঁয়াজের আবাদি জমির আওতা না বাড়িয়ে শুধু উন্নত জাত ব্যবহার করেই দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক উৎপাদন ৫০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব। যার মাধ্যমে পেঁয়াজ উৎপাদনে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত অংশ রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাবে। দেশে পেঁয়াজ চাষের গুরুত্ব বিবেচনা করে পেঁয়াজ গবেষণায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিও পেঁয়াজ গবেষণায় এগিয়ে এসেছে। যা দেশের জন্য অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) খরিফ মৌসুমের জন্য তিনটি বারি পেঁয়াজ-২, বারি পেঁয়াজ-৩, বারি পেঁয়াজ-৫ এবং রবি মৌসুমের জন্য দুটি বারি পেঁয়াজ-১ ও বারি পেঁয়াজ-৪ গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করেছে। এমনকি নতুন একটি হাইব্রিড জাতের উদ্ভাবনও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লালতীর সিড লি. তাদের নিজস্ব গবেষণা সেলের মাধ্যমে দুটি উচ্চফলনশীল জাত লালতীর ২০ এবং লালতীর কিং উদ্ভাবন করেছে এবং নতুন একটি হাইব্রিড জাত লালতীর হাইব্রিড পেঁয়াজ উদ্ভাবন করে বাজারে সরবরাহ করেছে। এছাড়া ইউনাইটেড সিড লিমিটেডের রঙ্গিলা (হাইব্রিড), মেটাল সিডের MS-25, সুপ্রিম সিডের সুলতান কিং এবং এসিআই সিডের এসিআই কিং এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) তাদের নিজস্ব খামার ও সংযোগ চাষীর মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নত জাতের পেঁয়াজ বীজ যেমন তাহেরপুরী, বারি পেঁয়াজ-১, লালতীর ২০, লালতীর কিং এবং লালতীর হাইব্রিড পেঁয়াজ (ফলন ১২ টন/হে), মেটালের MS-25, সুপ্রিমের সুলতান, সুলতান কিং, এসিআই কিং, হাফিজ কিং, সুপার কিং, মান কিং, দত্ত কিংসহ কৃষকের রাখা উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন করে যাচ্ছে।

পেঁয়াজের বীজ উন্নয়নে গবেষণার পাশাপাশি কৃষকের দোরগোড়ায় এসব উন্নত বীজ যথাসময়ে সহজলভ্যভাবে সরবরাহ করাটাও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ । বাংলাদেশের প্রখ্যাত মসলাবিজ্ঞানী ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার ২০২০ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বাংলাদেশে পেঁয়াজ বীজের বার্ষিক চাহিদা ১ হাজার ১০০ টন বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২১ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী এ বছর ২ দশমিক ৩৭ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ টন। সেই হিসাবে আগামী বছরে পেঁয়াজ আবাদের জন্য প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন পেঁয়াজ বীজ দরকার। এ বিপুল পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে সরকারিভাবে মাত্র পাঁচ-ছয় টন, বেসরকারিভাবে ২০০-২৫০ টন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদিত হয়। বাকি অংশের পুরোটাই কৃষকরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা সংগ্রহ করেন। কাজেই দেশে সার্বিকভাবে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে গেলে কৃষক পর্যায়ের এ বিপুল অংশের বীজের উৎপাদন এবং সংরক্ষণের মানও বাড়াতে হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে জানা যায়, পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ’ প্রকল্পের সহায়তায় মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা পেঁয়াজের সংরক্ষণকাল বাড়ানোর এবং অধিক সংরক্ষণকাল উপযোগী জাত, শস্য নিরিড়তায় খাপ খাওয়ানোর উপযোগী ছোট জীবত্কাল বিশিষ্ট পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া চলমান আছে।

পেঁয়াজ চাষের আওতা বৃদ্ধি ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ: সেচ সুবিধা না থাকায় নদীমাতৃক এ দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা রবি মৌসুমে অনাবাদি থাকে। যেহেতু পেঁয়াজ চাষে পানি কম লাগে তাই এ সুযোগ কাজে লাগানো যায়। মাত্র এক থেকে তিনটি হালকা সেচের মাধ্যমেই পেঁয়াজের ভালো ফলন আশা করা যায়। এসব এলাকার এক লাখ হেক্টর জমি পর্যায়ক্রমে পেঁয়াজ চাষের আওতায় আনতে পারলে ১০-১২ লাখ টন অতিরিক্ত পেঁয়াজ উৎপাদন করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে চাহিদার পুরোটাই মেটানো সম্ভব। তবে তার জন্য প্রথমেই আমাদের এসব অঞ্চলে পেঁয়াজ চাষের প্রধান অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। তাহলেই কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। পেঁয়াজ যেহেতু পচনশীল দ্রব্য তাই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে হিমাগারের সুবিধা বাড়ানোটাও জরুরি। মৌসুমের পেঁয়াজ পর্যাপ্ত পরিমাণে হিমাগারে সহজে মজুত করে রাখতে পারলে অমৌসুমে পেঁয়াজের এত সংকট হতো না। যদিও এক্ষেত্রে হিমাগারের খরচ বেড়ে গিয়ে পেঁয়াজের দামও বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে উপযোগী বিকল্প হিসেবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে হবে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত বারি-৫-এর মতো আরো নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সম্প্রসারণবিদদেরও এ প্রযুক্তি উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত কলাকৌশল নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

সমন্বিত চাষ ব্যবস্থাপনায়, আন্তঃফসল/রিলে ফসল হিসেবে এবং বাড়ির উঠোনের বাগানে পেঁয়াজের চাষ: বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলসহ কুমিল্লা, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ প্রভৃতি এলাকায় ভুট্টা, মুখিকচু, মরিচসহ শীতকালীন বেশকিছু ফসলের সঙ্গে আন্তঃফসল কিংবা রিলে ফসল হিসেবে পেঁয়াজের চাষ করা যায়। এসব এলাকায় প্রচলিত তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক ফসলগুলোর পরিবর্তে লাভজনকভাবে পেঁয়াজের চাষ করা যেতে পারে। তাছাড়া সারা দেশে বসতবাড়ির আঙিনায় উঠোনবাগান বা কিচেন গার্ডেনে সারা বছর পেঁয়াজ লাগিয়েও দৈনন্দিন চাহিদা অনেকাংশে মেটানো সম্ভব।

পেঁয়াজের সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন: দেশের কৃষি সম্প্রসারণবিদদের মতে, বিশেষায়িত হিমাগারে সংরক্ষণের মাধ্যমে পেঁয়াজের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমিয়ে পেঁয়াজের নিট উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ ভাগ বাড়ানো সম্ভব। তারা বলছেন, বর্তমানে পেঁয়াজের যে সংরক্ষণ ব্যবস্থা তা সনাতন এবং একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। অসহায় কৃষক ব্যাপক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে পেঁয়াজকে হয় ঘরের চিলেকোঠায়, না হয় মেঝেতে বিছিয়ে অথবা পাটের বস্তায় চার-ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের চেষ্টা করে, যার বেশির ভাগ অংশই পচে নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে যখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজ করে, তখন পেঁয়াজ ব্যাপক হারে নষ্ট হয়। তাই পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এর সংরক্ষণেরও উপযুক্ত বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এজন্য অন্তত ফরিদপুর, পাবনা, রাজবাড়ীর মতো যেসব এলাকায় পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হয় সেসব এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষায়িত হিমাগার গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী বা কম মেয়াদি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে।

বাজার তদারকি, মজুদদারি এবং উৎপাদন মৌসুমে অহেতুক আমদানি নিয়ন্ত্রণ: বাজারে পেঁয়াজের জোগান ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তার জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। দাম কিছুটা বাড়লেই খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা যেন হুজুগে বেশি মাত্রায় কিনে মজুদ না করে, তার জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখাসহ উৎপাদন মৌসুমে কৃষক যেন তার উৎপাদিত পেঁয়াজের উপযুক্ত দাম পায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু অনামৌসুমে ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেই আমদানির ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বাজার তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতাই ওই সময় পেঁয়াজের মূল্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

পেঁয়াজ চাষের উপকরণে ভর্তুকি এবং ঋণ সুবিধার সম্প্রসারণ: পেঁয়াজ চাষীদের উৎপাদন খরচ এবং প্রান্তিক মুনাফা বিবেচনা করে মৌসুমে পেঁয়াজের বাজারদর পড়ে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের উপকরণ খরচে ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পেঁয়াজকে শুধু মসলাপণ্য হিসেবে গণ্য না করে বিদ্যমান স্বল্প সুদে (৪ শতাংশ হারে) ঋণ সুবিধার পরিধি বাড়াতে হবে, যাতে বেশিসংখ্যক কৃষক পেঁয়াজ উৎপাদনে এগিয়ে আসে। স্বল্পসুদে পেঁয়াজ চাষীদের কৃষিঋণ নিশ্চিত করতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে কমিটি করে দেয়া হবে বলে অতি সম্প্রতি মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। প্রকৃত পেঁয়াজচাষীরা যেন এই ঋণ সুবিধা পান অর্থাৎ স্থানীয় প্রভাবশালীরা যাতে এ ব্যাপারে আধিপত্য না খাটায় তা নিশ্চিত করতে পারলে এর সুফল অবশ্যই পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

সরকারি-বেসরকারি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎসাহ প্রদান: পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাত এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণে লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পেঁয়াজের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা প্রণোদনা প্রবর্তন করে গবেষকদের উৎসাহিত করতে হবে।

পেঁয়াজ চাষের উন্নত কলাকৌশল অবলম্বন বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ: দেশের যেসব অঞ্চলে পেঁয়াজ উৎপাদনে তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে (ফরিদপুর, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী), সেসব অঞ্চলের কৃষকদের পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে উন্নত কলাকৌশল বিষয়ে উৎপাদন মৌসুম শুরুর আগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পেঁয়াজ যেহেতু বাংলাদেশের একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তাই আগামী দিনে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলে, পেঁয়াজ বাজারের অস্থিতিশীল অবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বীজ কোম্পানিসহ সব গবেষক, কৃষিবিদ, সম্প্রসারণবিদ ও কৃষকদের একযোগে কাজ করতে হবে। পেঁয়াজের উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনে আমাদের উন্নত বীজ, উপযোগী কলাকৌশল, আবাদি জমির আওতা বৃদ্ধি ও গ্রীষ্মকালীন আবাদ, উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, সঠিকভাবে বাজার মনিটরিং এবং কৃষক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজগুলো যদি আমরা সঠিকভাবে করতে পারি তাহলে কৃষির জন্য সর্বাপেক্ষা উপযোগী সুজলা-সুফলা এ সোনার বাংলায় পেঁয়াজের সংকট আর কোনোদিনই হবে না বলে আমরা মনে করি।

 

ড. মো. রমিজ উদ্দিন: অধ্যাপক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

ড. আ হ ম আসাদুর রহমান: উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম: কৃষি গবেষক