বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে মন্তব্য করেছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সাম্প্রতিক এক আলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, বিবিএসের দেয়া মূল্যস্ফীতির তথ্য বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ হবে। আগামী দিনে এ ধারা অব্যাহত থাকবে। আর্থিক চাপে এরই মধ্যে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির সঠিক ও যথাযথ তথ্য না হলে উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হবে। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে মূল্যস্ফীতির বাস্তবসম্মত তথ্য নির্ণয় ও প্রকাশ জরুরি।

ক্রমেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত হার। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। তথ্য বলছে, সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ৬১ শতাংশের ওপরে। আটা-ময়দার মতো পণ্যের দাম বেড়েছে ৫৮ শতাংশের মতো। ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ছে বলে খবর মিলছে। ভারতের রফতানি বন্ধের প্রভাবে গমের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩ থেকে সাড়ে ৪ টাকা। এছাড়া ডিম, মুরগি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম আবারো বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু সরকারি মূল্যস্ফীতির হিসাবে এর যথাযথ চিত্র ফুটে উঠছে না। বিবিএস মূল্যস্ফীতি নির্ণয় করে ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) নিরিখে। এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের জন্য দুটি আলাদা ভোগ্যপণ্যের তালিকা বিবেচনায় নেয়া হয়। শহরের ভোক্তাদের এ তালিকায় আছে খাদ্য, অন্যান্য নানা ব্যবহার্য জিনিসসহ ৪২২টি পণ্য এবং একইভাবে গ্রামের ভোক্তাদের তালিকায় রয়েছে ৩১৮টি পণ্য। সিপিআই তৈরিতে কোন পণ্যের গড় মান কত হবে সেটি নির্ধারণ করা হয় একটি পরিবারের মোট খরচের কত অংশ কোন পণ্যের পেছনে যায়, তার ভিত্তিতে। আর এ উপাত্তের উৎস হিসেবে এখনো ব্যবহার করা হয় ২০০৫-০৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ। স্বভাবত এতে মূল্যস্ফীতি কম দেখাচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়।

বিশ্বের দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে। অনেকে এ সময়কে বিংশ শতাব্দীর সঙ্গে তুলনা করছেন। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২২ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে জার্মানির মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল ৩২২ শতাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরির মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল ১৯০০০ শতাংশ। তখনকার মতো পরিস্থিতি না হলেও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। কাজেই উন্নত ব্যবস্থাপনার দেশগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকছে মূল্যস্ফীতি যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা। এজন্য তারা সিপিআইয়ের ভিত্তিতে বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মূল্যস্ফীতির হার নির্ণয় করছে, সেগুলো নিয়মিত প্রকাশও করছে। সেই অনুযায়ী হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষকে আর্থিক চাপ থেকে রেহাই দিতে রেশনিংয়ের ব্যবস্থাসহ সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করছে।

বিবিএসের সিপিআই ও মূল্যস্ফীতি হিসাবের বর্তমান প্রক্রিয়া অন্তত দুই দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমত, ২০১৬ সালে খানা আয়-ব্যয়ের একটি জরিপ আছে এবং যার তথ্য-উপাত্ত ২০১৭ সাল থেকেই সহজলভ্য। অথচ বিবিএস এখনো ২০০৫-০৬ সালের গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় সমীক্ষার উপাত্ত ব্যবহার করছে। কেন এটি ব্যবহার করছে, তা সুস্পষ্ট নয়। এ সম্পর্কিত কোনো ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি সংস্থাটির তরফ থেকে। দ্বিতীয়ত, ২০০৫-০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশের দরিদ্র ও সচ্ছল উভয় শ্রেণীর মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সিপিআই গণনা করার জন্য বিবিএস যে ভোগ্যপণ্যের তালিকা ব্যবহার করে, তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ভোগ বা ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যায়। সুতরাং মূল্যস্ফীতির ফলে প্রান্তিক দরিদ্র পরিবারগুলো যে চাপের মুখে পড়ে, তা সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয় না।

সানেম ও জিইডির সাম্প্রতিক এক যৌথ সমীক্ষার ফল বলছে, বিবিএস যে ভোগ্যপণ্যের তালিকা ব্যবহার করে, তার তুলনায় প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর ভোগ্যপণ্যের তালিকায় পণ্যের সংখ্যা অনেক কম। আবার শহর ও গ্রামীণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর খাদ্যের পেছনে ব্যয়েও বিপুল পার্থক্য বিদ্যমান। বিবিএসের হিসাবে শহর ও গ্রামীণ পরিবারগুলো তাদের মোট খরচের যথাক্রমে ৪৫ দশমিক ১৭ শতাংশ ও ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ খাদ্যের পেছনে খরচ করে অথচ উল্লিখিত গবেষণায় উঠে এসেছে যে শহরের প্রান্তিক গোষ্ঠী মোট খরচের ৬১ দশমিক ৩১ আর গ্রামীণ প্রান্তিক গোষ্ঠী ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। বিবিএসের হিসাবের তুলনায় যা লক্ষণীয়ভাবে বেশি। মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্র যে প্রতিফলিত হচ্ছে না, সেটি বলাই বাহুল্য।

মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য নীরব ঘাতক। আয় না বাড়লেও আগের চেয়ে একই পণ্য কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় হয় বলে এটিকে বাধ্যতামূলক কর বলা হয়। আমরা দেখছি, দেশের প্রান্তিক মানুষ প্রকৃত যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির মুখে পড়েছে, সেটি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। দরিদ্র মানুষের ব্যয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের পেছনে যায় বলে তাদের পক্ষে খরচ কমানো সম্ভব হয় না। ফলে মূল্যস্ফীতির কারণে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হচ্ছে। তাই নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগে প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ করা হতো। সেটি বন্ধ করে দিয়ে এখন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে নিয়মিত চিত্র উঠে আসছে না। আবার যা প্রকাশ করা হচ্ছে তাতেও মিলছে না বাস্তব হিসাব। তাই প্রকৃত মূল্যস্ফীতি নির্ণয়ে হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে অন্তত ২০১৬-১৭ সালের খানা জরিপের তথ্য বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

করোনা মহামারী থেকে বিশ্ব অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বেড়েছে জ্বালানি তেলসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম। বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে এমন উচ্চমূল্যের পণ্য অবশ্য এখনো বাংলাদেশে আসেনি। সেই পণ্য দেশে এলে দাম আরো বাড়বে। আবার টাকার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন হতে থাকলে আমদানি করা পণ্যের দাম বাজারে আরো বেশি হবে। স্বভাবত আগামীতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে, যা শঙ্কার। বর্তমানে যেভাবে মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে যাচ্ছে। তেমনটা অব্যাহত থাকলে সেটি অর্থনীতির জন্য আরো বুমেরাং হবে। সুতরাং প্রকৃত তথ্য নিশ্চিতে মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন জরুরি।