অতিমারীর মধ্যেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পা রাখবে দেশ। নিয়ম হলো কোনো দেশ উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে উন্নীত হলে আগের বাণিজ্য সুবিধাগুলো আর পাবে না। সব দেশের জন্য এটা প্রযোজ্য। এমনটা হলে স্বভাবতই বাংলাদেশের রফতানিতে বড় ধাক্কা আসবে। এটা মাথায় রেখে আরো কিছুদিন সুবিধাগুলো কীভাবে বহাল রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। উন্নত দেশগুলোসহ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সঙ্গে নানাভাবে দেনদরবার করছে সরকার। এমনই এক প্রেক্ষাপটে ৩০ নভেম্বর শুরু হতে যাচ্ছে বৈশ্বিক সংস্থাটির ১২তম মিনিস্টারিয়াল সম্মেলন। এটি আমাদের জন্য বড় সুযোগ। আলোচ্য সম্মেলনে বাংলাদেশের দাবিগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জোর প্রস্তুতি কাম্য।
চ্যালেঞ্জগুলো এরই মধ্যে স্পষ্ট। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে অনেক বাণিজ্য সুবিধাই বাংলাদেশ হারাবে। এখন যে রেয়াতি সুদের ঋণ পায়, তা আর পাবে না; উচ্চসুদে ঋণ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধা, মেধাস্বত্ব সুবিধা ইত্যাদি কমে যাবে কিংবা প্রত্যাহার হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ আরো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে শুল্ক ও মেধাস্বত্ব সুবিধা প্রত্যাহারের কারণে দেশের পোশাক ও ওষুধ শিল্পে বিপুল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তথ্য বলছে, শুল্ক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে বাংলাদেশকে মাশুল হিসেবে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে। আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য আর্থিক দিক থেকে এটা বিরাট চাপের ও চ্যালেঞ্জিং বৈকি।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এতে দেশের সম্মান বাড়বে। বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ আরো প্রসারিত হবে। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। নিঃসন্দেহে এটা ইতিবাচক। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো সামাল দেয়ার প্রস্তুতিটাও জরুরি। আমাদের সঙ্গে ভুটান, লাওস, মিয়ানমার, সলোমান দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি ও টোভালুর মতো দেশগুলোও এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পেয়েছে। ডব্লিউটিওর আসন্ন সম্মেলন উপলক্ষে দেশগুলো খাতওয়ারি অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে। কর্মকৌশল কী হবে, কী কী দাবি পেশ করবে, তা নির্ধারণ করছে। বৈশ্বিক ফোরামে দাবিদাওয়াগুলো বিস্তারিত তুলে ধরতে ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশগুলোর কর্মতত্পরতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিরাজমান সুবিধাগুলো বাংলাদেশ আদৌ পাবে কিনা, পেলেও কত দিনের জন্য পাবে, কী ধরনের সুবিধা পাবে—এসব বিষয় নিয়ে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সেটি দূর করতে আমাদের অবশ্যই যৌক্তিকভাবে নিজস্ব দাবিগুলো উপস্থাপন করতে হবে। বলা হচ্ছে, আসন্ন সম্মেলনে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। খাতভিত্তিক প্রয়োজনীয় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা ন্যূনতম ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার বিষয়টি তুলে ধরবে। কৃষি ও মত্স্য খাতের নগদ সহায়তা-ভর্তুকি কীভাবে বহাল রাখা যায়, সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে। তৈরি পোশাক খাতের বর্তমানের সুবিধা বজায় রেখে আরো বাড়তি সুবিধা কীভাবে আদায় করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবে। বাংলাদেশের জন্য রুলস অব অরিজিন শিথিল করার বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ডব্লিউটিওর সংস্কার চাওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দাবিদাওয়া ও কর্মকৌশল তুলে ধরতে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা দলিল প্রস্তুত করা হয়নি। এটা জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা চাই।
কভিডের অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দরিদ্র দেশগুলো। এ কারণে শুল্ক সুবিধার সময় বাড়ানোর দাবি আরো জোরালো হয়েছে। এ দাবির সপক্ষে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও সমর্থন দেবে বলে সাম্প্রতিক এক ভার্চুয়াল সভায় জানিয়েছে। শুল্ক সুবিধার সময় বাড়ানোর ব্যাপারে ডব্লিউটিওর মনোভাবও ইতিবাচক। তদুপরি উন্নত দেশগুলোও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও সেসব দেশকে বিশেষ কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া যায় কিনা, সে ব্যাপারে এরই মধ্যে চিন্তাভাবনা করছে। এটা বাংলাদেশের জন্য সুখবর বৈকি। কাজেই এটাকে কাজে লাগাতে আসন্ন সম্মেলন বড় সহায়ক হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরবর্তী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় দ্বিপক্ষীয়ভাবেও এগোতে হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশ বাণিজ্য বাড়াতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করছে। বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতেও (আরটিএ) ব্রতী হচ্ছে। আমাদেরও সেটি করতে হবে। এ ধরনের চুক্তির পথ সন্ধানে আসন্ন বৈশ্বিক আসর একটি প্লাটফর্ম হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের এটা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে।
অর্থনীতির স্থায়িত্বশীলতার জন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রফতানি ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানো না হলে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করা কঠিন। আরো কিছুদিন বিদ্যমান সুবিধাগুলো বহাল রাখা গেলেও চিরদিনের জন্য সেগুলো ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রতিযোগিতা বাড়াতে এখন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বেগবান করতে হবে। রফতানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করতে হবে। গুণগত মান বাড়াতে হবে মানবসম্পদের। বিনিয়োগের জন্য ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর আরো উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এর বিকল্প নেই।










