দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদানে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এ তথ্য জানাচ্ছে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘টাস্কফোর্স অন কভিড-১৯ ভ্যাকসিনস’। এমনকি সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের প্রতিটি দেশে ডিসেম্বরের মধ্যে মোট জনসংখ্যার অন্তত ৪০ শতাংশের কভিডের টিকা দেয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ১৮ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা গেছে। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এখানে টিকাদান শুরু হলেও মাঝখানে থেমে গিয়েছিল টিকা না পাওয়ার কারণে। পরে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে টিকা সংগ্রহ সাপেক্ষে টিকা দেয়া শুরু হলেও তাতে তেমন গতি নেই। টিকা নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও মানুষ টিকা নিতে পারছে না। কারণ টিকা ও জনবলের স্বল্পতা। কভিড টিকা প্রদান কার্যক্রমে গতি আনতে তাই সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

টিকা নিয়ে শুরুতে অনেকের মধ্যে যে সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, তাও অনেকটা কেটে গেছে। টিকা কেন্দ্রগুলোয় বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় প্রমাণ করে তারা টিকা নিতে আগ্রহী। কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে বিরাট ফারাক রয়ে গেছে। সরকার এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ টিকা কেন্দ্র করেছে, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে বিভিন্ন টিকা কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। টিকাপ্রার্থী মানুষের দীর্ঘ সারির ছবি ছাপা হচ্ছে নিয়মিত। এ ধরনের ভিড়ে কারো পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব নয়। অনেকেরই টিকা নিতে এসে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর প্রতিকার কী? প্রতিকার হলো অধিকসংখ্যক টিকা কেন্দ্র স্থাপন এবং টিকার পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করা। অধিকসংখ্যক টিকা কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অধিক লোকবলেরও প্রয়োজন হবে। সরকারের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেয়া।

ভারতসহ যেসব দেশ অধিকসংখ্যক টিকা দিয়েছে, সেসব দেশে সংক্রমণের হার দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গবেষণায় দেখা গেছে, নভেল করোনাভাইরাসের টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতির কারণে ক্ষতির মুখে পড়বে মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো। টিকাদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে। এরই মধ্যে উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের বুস্টার ডোজ দিতে শুরু করেছে। যেখানে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য টিকা সরবরাহের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা অপ্রতুল রয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশ ২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ টিকা দিতে ব্যর্থ হবে, তারা ২০২২-২৫ মেয়াদে ২ ট্রিলিয়ন ইউরোর সমান ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ সময়ের বাস্তব পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষের টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে মানবিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে না। এমনিতেই টিকাদানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক পিছিয়ে। আর টিকাদান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হবে এ দেশগুলো। তাই সাধারণ মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, জীবন বাঁচাতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। প্রয়োজনে টিকাদান কার্যক্রমকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে। তা না হলে আগামীতে টিকা পেতে আরো ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা যায় অনায়াসেই।

কোনো কোনো দেশে টিকা নেয়ার জন্য অর্থসহ নানা প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি দেশ টিকা কার্যক্রমকে এতটাই গুরুত্ব ও জোর দিয়েছে যে এরই মধ্যে তারা তার সুফলও পেতে শুরু করেছে। বলা হয়, কোনো দেশের ৭০-৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হলে সে দেশ নিরাপদ। এ রকম নিরাপদ দেশের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। ওইসব দেশে জীবনযাপন ও কর্মপ্রবাহ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু রোধ এবং জীবন ও কর্মপ্রবাহ সচল করার প্রয়োজনে ব্যাপক হারে টিকাদানের বিকল্প নেই। যেহেতু টিকাদান কার্যক্রম অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে, সেজন্য টিকার পর্যাপ্ত সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। উপহারের টিকার ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না, টিকা কিনতে হবে। যেখান থেকে টিকা পাওয়া যায়, কিনতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, টিকা উৎপাদনে যেতে হবে। তার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশেই উৎপাদন হলে টিকাপ্রাপ্তির দুশ্চিন্তা বা সমস্যা থাকবে না। সেই সঙ্গে গণটিকা কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে শুরু করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি দেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনা যাবে ততই কল্যাণ।

কভিড-১৯ টিকাদান কর্মসূচিতে গতি আনতে নভেম্বর থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ডোজ করে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। আগামী বছরের এপ্রিলের শেষ নাগাদ ৮০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতি মাসে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে সরকার ৯ কোটি সিরিঞ্জ কিনেছে, যা আগামী মাস থেকে দেশে আসতে শুরু করবে। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকাই মিলছে না। প্রতিশ্রুতির মধ্যেই টিকার জোগান কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।

বিভিন্ন দেশে যখন বুস্টার ডোজ প্রয়োগ করা হচ্ছে তখন দুই ডোজ টিকা নিশ্চিতে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অথচ তুলনামূলক অন্যান্য দেশের আগে বাংলাদেশে কভিড-১৯ প্রতিষেধক প্রয়োগ শুরু হয়। টিকায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকলেও মজুদ কম থাকায় তেমন গতি নেই। টিকা মজুদের তুলনায় বেশি মানুষ রয়েছে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায়। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিবন্ধন করে টিকার জন্য দিনক্ষণ গুনছে। নিবন্ধনের পর মাস পেরিয়ে গেলেও মুঠোফোনে মিলছে না এসএমএস। এভাবে চলতে থাকলে নির্ধারিত সময়ে দেশের নাগরিকদের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে কিনা, সে বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে শঙ্কা রয়েছে।

ভারত এরই মধ্যে ১০০ কোটি ডোজ টিকা দিয়েছে। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভুটান বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে আছে। টিকা সংগ্রহে পিছিয়ে থাকার কারণ শুরুতে একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকা; ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের চুক্তি হয় ২০২০ সালের শেষ দিকে। যদিও তারা প্রতিশ্রুত টিকা সরবরাহ করতে পারেনি দেশটিতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে। ভারত সরকার টিকা রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার পর প্রথম চালান এসেছে সম্প্রতি; বাকি টিকা কবে আসবে, নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কোনো পক্ষ। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো অনেক দেশ থেকে টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করে। এর মধ্যে চীনের সিনোফার্ম থেকেই বেশি টিকা এসেছে। বাংলাদেশ কোভ্যাক্স ও ফাইজার থেকেও কিছু টিকা পেয়েছে। কিন্তু চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো যোজন যোজন ফারাক। অক্টোবরে তিন কোটি ডোজ টিকা আসার কথা ছিল; পেয়েছে অনেক কম। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, শিগগিরই প্রচুর পরিমাণ টিকা এসে পৌঁছবে। বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিত নন যে টিকার কার্যকারিতা কত দিন থাকবে কিংবা বুস্টার ডোজ দেয়ার প্রয়োজন হবে কিনা। যদি এর কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ীও হয়, বুস্টার ডোজের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আর কার্যকারিতা স্বল্পমেয়াদি হলে দ্রুত বুস্টার ডোজ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকার টিকা সংগ্রহ করার চেষ্টা জোরদার রাখবে—এটাই কাম্য।