নভেল করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী মহামারী ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলছে চার দশক ধরে নিরন্তর বুনে চলা একটা জাল। হ্যাঁ, আমি বলছি বিশ্বায়নের কথা। নানান ধরনের পরিবহন ও যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, শিক্ষা এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর উৎপাদন, সরবরাহ ও ভোগের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সব অঞ্চল এখন আষ্টেপৃষ্ঠে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন শিল্পের (যথা ফ্যাশন) কাঁচামাল (খরগোশের চামড়া) উৎপাদন হয় চীনের কোনো একটা (হুবেই) প্রদেশে। সেখান থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর সেই চামড়া পরিবাহিত হয় ইতালির উত্তরাঞ্চলের শিল্প-কারখানাগুলোয়, যেখানে উৎপাদিত হয় সুন্দর ও দামি ফার-কোট; যেগুলো বিক্রি হয় ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের বিপণিবিতানে। একইভাবে কেনিয়া আর উগান্ডায় চাষ হয় ‘সুপারফুড’ হিসেবে পরিচিত আভোকাডো নামের একটা ফল, যা মধ্যপ্রাচ্যের স্বাস্থ্যসচেতন উচ্চবিত্ত শ্রেণীর জন্য পরিবাহিত হয়ে আসে সুপারমার্কেটে। আবার দেখা যায় যে শ্রীলংকা ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের স্থাপিত চায়ের শহর নুরাএলিয়াকে নতুনভাবে সাবেকি হালে উপস্থাপন করে বিদেশীদের—বিশেষ করে ইউরোপীয় পর্যটকদের—বেড়াতে আসতে আগ্রহী করার জন্য। অর্থনৈতিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা সারা বিশ্বকে নানা দিক থেকে নানান ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে মাকড়সার জালের মতো জড়িয়ে ছিল, নভেল করোনাভাইরাসে মৃত্যুর ভয় তাকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। বিশ্বায়নের প্রতি সপ্রশংস আগ্রহ আর বিশ্বায়িত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তলিয়ে গেছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে নভেল করোনাভাইরাসের করাল গ্রাস থেকে প্রাণে বাঁচার আকুতির মধ্যে। ‘দূরত্ব যতই হোক, কাছে থাকুন’ জপ করতে অভ্যস্ত বিশ্বে কেউই এখন আর কাছে আসার কথা বলে না। এমনকি স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করেও দূরত্ব বজায় রাখতে প্রাণপাত করছে।
নানান দেশে সরকার নভেল করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় হিমশিম খেয়ে চলেছে। এরই মধ্যে মাইক্রোসফটের বিলিয়নেয়ার মালিক বিল গেটস ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি এ ভাইরাসের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েক বিলিয়ন ডলার নিজের দাতব্য প্রতিষ্ঠান গেটস ফাউন্ডেশন থেকে ব্যয় করবেন। তিনি একই সঙ্গে এই আশ্বাসও ব্যক্ত করেছেন যে তার প্রতিষ্ঠান দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুচারুভাবে এ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। উন্নত দেশের সরকারগুলোর ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে বিল গেটসের কথা যথেষ্ট যুক্তিসংগত ও বিশ্বাসযোগ্য, সন্দেহ নেই। কারণ সরকার শুধু যে প্রয়োজনীয় সম্পদ আর লোকবলের অভাবে ব্যর্থ হচ্ছে তা-ই নয়, এর সঙ্গে আছে সরকারের নানান পর্যায়ে অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতি। উপরন্তু, গেটস ফাউন্ডেশনের মহামারী ঠেকানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সমন্বয়ের সফল অভিজ্ঞতা আছে, যথা পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারী ঠেকানোর অভিজ্ঞতা। কিন্তু একটা ভ্যাকসিন আবিষ্কারই কি বর্তমানের নভেল করোনাভাইরাস মহামারী রোধের জন্য যথেষ্ট কার্যকরী পথ?
২. বর্তমানের এই মহামারীর জীবাণুর নাম দেয়া হয়েছে কভিড-১৯ ভাইরাস, যার সংক্রমণ মানুষের শ্বাসযন্ত্রের একপ্রকার রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেমনটি ছিল ২০০৩ সালের সার্স আর ২০১২ সালের মার্স ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, এ ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় শতকরা ছয়জন। এ ভাইরাস মূলত পঞ্চাশের অধিক বয়স্ক এবং আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্তদের মধ্যে অধিক হারে আক্রমণ ও মৃত্যু ঘটালেও কম বয়সীদের মধ্যেও আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুবরণ করার নজির আছে। বাংলাদেশে এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া প্রথম ডাক্তার ছিলেন মধ্য তিরিশের এক যুবক। কাজেই নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই কভিড-১৯-এর ভয়ে মৃত্যুর আশঙ্কায় দিনাতিপাত করছে।
বিদ্যমান গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই মহামারী রোধে ব্যর্থ হওয়ায় সোস্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব হয়ে পড়েছে একমাত্র কার্যকরী উপায়, যা এ ভাইরাসের বিস্তার রোধ করে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বাজারঘাট, যানবাহন সবকিছুকে অচল করে দেয়া হয়েছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। শুরুতে দু-তিন সপ্তাহের জন্য এসব চরম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল এই অনুমানে যে স্বল্প সময়ের সামাজিক স্থবিরতা ভাইরাসের বিস্তার সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনলে আবার সবকিছু আগের মতো সচল করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। একাদিক্রমে দুই মাসের উপরে হয়তো চলল এই সামাজিক দূরত্ব আর স্থবিরতা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলছে, এ অবস্থা কমবেশি চলতেই থাকবে ২০২২ সালের শেষ নাগাদ।
সরকার, বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি মিডিয়ার নিরন্তর প্রচারের মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব এখন আমাদের সাধারণ জ্ঞানের অংশে পরিণত হয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগেও সারা বিশ্ব আমাদের নানানভাবে উৎসাহ দিত সামাজিক দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছে আসার।
কভিড-১৯ ভাইরাসের প্রথম বৈশ্বিক কেন্দ্র উহান হচ্ছে চীনের পাঁচটি বৃহৎ শিল্পনগরীর একটা। এক কোটির অধিক জনঅধ্যুষিত এই নগরী চীনের এবং এক ডজনেরও বেশি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক শিল্পগোষ্ঠীর উৎপাদন ও ব্যবসার মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন তার সংস্পর্শে আসা সবার মধ্যে এ ভাইরাস ছড়িয়ে দেন, একইভাবে উহান নগরীও তার সঙ্গে সম্পর্কিত দেশগুলোয় এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। যেমন ইতালির উত্তরাঞ্চলের শিল্প-কারখানাগুলোর অধিকাংশ উহান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করত। সেই সঙ্গে হাজার হাজার চীনা উদ্যোক্তা ও পর্যটক ইতালির উত্তরাঞ্চলে নিয়মিত যাতায়াত করত। ফলে উহানের পরে এ অঞ্চলেই কভিড-১৯ ভাইরাসের মহামারী দেখা গেছে সর্বপ্রথম। অনুরূপ, ইরানের কুম শহরের এক ব্যবসায়ী উহান থেকে এই ভাইরাস বয়ে নিয়ে এসেছেন বলে চিহ্নিত হয়েছেন, যার মাধ্যমে ইরানে এই মহামারী ছড়িয়ে পড়ে। উহানের সঙ্গে পরবর্তীতে আক্রান্ত শহর ও দেশগুলোয় কভিড-১৯ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ধরন নিশ্চিতভাবেই এ মহামারীতে বিশ্বায়নের প্রভাব নির্দেশ করে। আকাশ ও সমুদ্রপথে সব প্রকার আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার মধ্যে এই সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয় যে বিশ্বায়ন কভিড-১৯ ভাইরাস মহামারীতে অন্যতম অনুঘটক।
৩. কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা সবারই থাকলেও কোনো কোনো ব্যক্তির জন্য এই ভয় অন্যদের তুলনায় বেশি, যেমন শ্বাসযন্ত্রের রোগাক্রান্ত বয়স্ক মানুষ। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সব ব্যক্তিরই সমানভাবে থাকলেও যেসব ব্যক্তির শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা ভেঙে পড়েছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার অধিক। একইভাবে পৃথিবীর সব দেশেই এই মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও কোনো কোনো দেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিক ঝুঁকিবহুল। ভালোভাবে লক্ষ করলে সর্বাধিক আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে একটা সাধারণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এসব দেশ শিল্পে উন্নত, বিশ্বায়নে অগ্রসর এবং নব্য উদারতাবাদী তথা মুক্ত বাজার নীতির অনুসারী, সেখানেই এ মহামারী ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যেমন ইতালি, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স ইত্যাদি। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোয় এ ভাইরাস প্রবেশ করলেও এরা বেশ ভালোভাবে এই সংকট সামলে উঠছে। অর্থাৎ কিছু দেশের সংকট মোকাবেলা করার নিজস্ব সামর্থ্য (মানবদেহের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মতো) অন্যদের থেকে কম।
বিশেষজ্ঞ ও সমাজ গবেষকরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছিলেন কীভাবে নব্য উদারতাবাদের ভিত্তিতে গঠিত মুক্ত বাজার অর্থনীতি দেশ ও সমাজের কাঠামোয় বিশেষ কিছু দুর্বলতা তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দুর্যোগ মোকাবেলা করার সক্ষমতা। এ নীতি একদিকে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সরকারের কার্যপরিধিকে ক্রমাগত সংক্ষিপ্ত করে অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি খাতকে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সরকারের আকার ও পরিধি হ্রাস করে। অন্যদিকে স্বল্পমূল্যের বাজার ও সস্তা শ্রমের পেছনে ছুটে জাতীয় শিল্প, কৃষিসহ যাবতীয় উৎপাদনমুখী খাতকে বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এ বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে সম্পদের মোট উৎপাদন ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ বস্তগত উন্নয়ন অর্জিত হয়, যা বার্ষিক জিডিপি হার দিয়ে পরিমাপ করা হয়। কিন্তু সবকিছু ব্যক্তিমালিকানায় থাকায় লভ্যাংশের সামাজিক বণ্টন হয় অসম। ফলে বিত্তশালীরা আরো ধনী হয়, মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনরা হয় নিঃস্ব। এ অবস্থায় দেশে মহামারী উপস্থিত হলে স্বভাবতই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হয় আপামর জনতার পাশে। কিন্তু এই রাষ্ট্রের সক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে চার দশক ধরে নব্য উদারতাবাদী নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে। যেসব দেশ এ নীতির ব্যতিক্রম ঘটিয়ে তাদের স্বাস্থ্য খাতকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল, সেগুলোই এই কভিড-১৯ মহামারীতে নিজেদের নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে এ ভাইরাস মোকাবেলায় সাফল্যের দেখা পাচ্ছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলো। আর যেসব দেশ অধিক মাত্রায় নব্য উদারতাবাদকে অনুসরণ করে জনকল্যাণমুখী খাতগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তর করেছে, তারা এই মহাসংকটকালে হাবুডুবু খাচ্ছে। যেমন আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ইতালি।
৪. নব্য উদারতাবাদ কীভাবে আমেরিকার সরকারকে এই মহামারীর মোকাবেলায় পঙ্গু করে রেখেছে তা একটা বাস্তব উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে। জাতীয় অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে ব্যক্তিমালিকানায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়ার একটা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য ট্যাক্স মওকুফ করা এবং প্রদেয় ট্যাক্সের বিপরীতে আর্থিক অনুদান প্রদান করা। ২০১৮ সালে আমাজন করপোরেশনের করযোগ্য আয় ছিল ২৩২ মিলিয়ন ডলার। আমাজন এই আয়ের ওপর কোনো প্রকার কর তো দেয়ইনি, উপরন্তু নানান খাতে আর্থিক অনুদান পেয়েছে ১২৯ মিলিয়ন ডলার। মোটের ওপর আমাজন করপোরেশন যে পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পেয়েছে আমেরিকার সরকারের কাছ থেকে, তা বিশ্ব সংস্থায় আমেরিকার বার্ষিক ধার্য চাঁদার থেকেও বেশি। এভাবে শুধু করপোরেশনগুলোকে উল্লিখিত আর্থিক অনুদান দেয়া না হলে আমেরিকার সরকার আর্থিকভাবে সবল অবস্থানে থাকত এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে আপত্কালীন পর্যাপ্ত বিনিয়োগে সক্ষম হতো। আবার আমেরিকার ব্যক্তি উদ্যোক্তারা অধিকাংশ শিল্পের উৎপাদন কারখানা সরিয়ে নিয়েছে চীনসহ তৃতীয় বিশ্বের আরো নানান দেশে, যা অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের নানা রকম দায় বৃদ্ধি করেছে। অথচ রাজস্ব আয় কমিয়েছে শিল্পের এই বিদেশে স্থানান্তরই। অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের এসব রাষ্ট্র যে করোনা মহামারী মোকাবেলায় এমন নাজুক, তা প্রত্যক্ষভাবে নব্য উদারতাবাদী নীতি অনুসরণের ফল।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টিগিলজ তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে নব্য উদারতাবাদের এই বিশ্বায়ন মোট উৎপাদন বৃদ্ধিতে সফল হলেও এটি সবার জন্য সমানভাবে ফলপ্রসূ নয়। গ্লোবাল জাস্টিস আন্দোলনের অন্যতম নেতা নিক ডিয়ারডেন আফ্রিকার লেসোথো ও সিয়েরা লিওনে পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হাসপাতালের পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে এই নব্য উদারতাবাদী পদক্ষেপ গণস্বাস্থ্যসেবাকে সবল করার বদলে ধ্বংস করে। এ মতবাদের মধ্যে সমস্যার মূলে হচ্ছে জনগণের সামষ্টিক কল্যাণের উপরে ব্যক্তিগত মালিকানাকে স্থান দেয়া, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে হটিয়ে ব্যক্তির স্বাধীনভাবে মুনাফা অর্জনকে প্রাধান্য দেয়া, এমনকি তা জনগণের সামগ্রিক ক্ষতিসাধন করলেও।
কভিড-১৯ মহামারী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে নব্য উদারতাবাদ রাষ্ট্রগুলোকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে ফেলেছে। এটি আরো দেখিয়ে দিচ্ছে যে একমাত্র রাষ্ট্রই সব জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করে, ব্যক্তিগত মালিকানার করপোরেশন নয়। একটা কার্যকরী প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) হয়তো শিগগিরই একদিন কভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণ সারাবে, কিন্তু বিশ্বে যতদিন নব্য উদারতাবাদ থাকবে, ততদিনই সরকারগুলো পঙ্গু হতেই থাকবে এবং ফলত অজানা কোনো না কোনো ভাইরাসের আক্রমণে সমগ্র মানবজাতিকে সুরক্ষা দেয়ায় ব্যর্থ হতেই থাকবে।
কভিড-১৯ ভাইরাসের জন্য আমাদের দরকার একটা ভ্যাকসিন। কিন্তু সেই সঙ্গে আরো দরকার নব্য উদারতাবাদের প্রতিষেধক হিসেবে আর কোনো মতবাদ।
ড. হাসান মাহমুদ: কাতারের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের
সহকারী অধ্যাপক










