বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং ও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সামিট ২০২১ রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়েছে। এতে ৫৪টি দেশ থেকে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকরা অংশগ্রহণ করছেন। দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, ৩৯টি হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর অনেকগুলোর নির্মাণ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিসিকেরও বহু প্লট ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকের সুদহার কমানো হয়েছে। ২২টি খাতে বিনিয়োগে কর রেয়াত দেয়া হচ্ছে। সর্বোপরি বিদেশী বিনিয়োগ আনার জন্য আমেরিকা, লন্ডন, সিঙ্গাপুরে ব্যয়বহুল রোড শো করা হয়েছে। এসবের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট সামিটটি তাত্পর্যপূর্ণ বৈকি। প্রত্যাশা থাকবে, এর মাধ্যমে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়ে উঠবে। পাশাপাশি বিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছবে।
করোনার প্রভাবে দেশে বিদেশী বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন বিশ্ব অনেকটা স্বাভাবিক। অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। বাংলাদেশকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইন-বিধি আরো সংস্কার ও সহজীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশে বিনিয়োগ পদ্ধতি আরো সহজ করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। বিদেশীদের জন্য বরাদ্দ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ার কথা। কিন্তু বাড়ছে না কেন। এর কারণ বের করে তা সমাধান করতে হবে হবে। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের অনেক সুযোগ রয়েছে। এ দেশের আছে বিশাল মানবসম্পদ, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রয়েছে যথেষ্ট শ্রমশক্তি। এ শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়াতে হবে। দেশে পণ্য উৎপাদনের বড় বাজার রয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে চীন ও ভারতের মতো দেশে রফতানি করা যায়। ভিয়েতনাম বিদেশী বিনিয়োগে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। রফতানিকারক দেশের তালিকায় ভিয়েতনাম ২৫ নম্বরে, যেখানে বাংলাদেশ আছে ৫৬ নম্বরে। ভিয়েতনামের রফতানি বাজার অনেক বড়। তারা শুধু শ্রম শিল্প নয়, বরং এখন তারা উচ্চ প্রযুক্তি রফতানি করছে, যা তাদের মোট রফতানির প্রায় অর্ধেক। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত বিদেশী বিনিয়োগের কারণে। বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সুবিধা প্রদান। যেকোনো দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা দরকার।
দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে একদিকে যেমন বেসরকারি জমি রেজিস্ট্রেশনের বিষয়গুলো সহজীকরণ করতে হবে, পাশাপাশি সরকারি জমি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নামে এমনভাবে বন্দোবস্ত দেয়া উচিত, যাতে অর্থায়ন দ্রুত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন ব্যাংক খাতের অবস্থা স্বাভাবিকের চেয়ে খারাপ। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রশাসনিক অদক্ষতাকে। সর্বোপরি দেশে দক্ষ জনশক্তি ও ভালো ব্যবস্থাপকের অভাব রয়েছে। ফলে লাখ লাখ বিদেশী কর্মী দিয়ে দেশে কাজ করাতে হচ্ছে। যাদের বেতন-ভাতাদি অত্যধিক। গত ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত এফবিসিসিআই আয়োজিত সংলাপে বক্তারা বলেছেন, বিনিয়োগ বাড়ানো, বাজার উন্নয়ন ও রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে দেশে দক্ষ কর্মী ও ব্যবস্থাপক তৈরি করা প্রয়োজন। এ কথার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই।
সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু কোথায় যেন সবকিছুর ছন্দপতন ঘটছে। শত পদক্ষেপ নেয়ার পরও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরলেও আশানুরূপ বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। জ্বালানি নিরাপত্তা নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা আসছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যবসা সহজীকরণ ছাড়াও আরো কিছু বিনিয়োগের প্রতিকূল বিষয় রয়েছে। যেমন এডিবি প্রণীত সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারী সুরক্ষা সূচক-২০২১ মতে, বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৯তম, পাকিস্তান ২৬তম, শ্রীলংকা ৩৮তম ও নেপাল ৭২তম। দেশের পুঁজিবাজারও খুব একটা শক্তিশালী নয়। ডিএসই ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুন শেষে জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান ছিল: বাংলাদেশে ৯ দশমিক ৪১, ভারতে ৬২ দশমিক ৭৫, শ্রীলংকায় ১৪ দশমিক ৯২, থাইল্যান্ডে ৮৯ দশমিক ২৯ ও হংকংয়ে ১ হাজার ৩১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। অন্যদিকে মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান বব মেনেন্দেজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি শ্রম অধিকার ও শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর তাগিদ দিয়েছেন। পরবর্তী দশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশের এখন গতি পরিবর্তনের সময়। এজন্য একটি আধুনিক, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও প্রাণবন্ত বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে বিভিন্ন আইন-কানুন ও নীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান ১ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ। সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যবিরোধ এবং হংকংয়ের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। অনেক বৈশ্বিক কোম্পানি তাদের প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। তাই সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। দফায় দফায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ আগ্রহের কথাও জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন (এসবিএফ) সম্প্রতি বাংলাদেশে পোশাক ও ওষুধ খাতে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিডার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত চার বছরে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। চীন ও জাপানের বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখিয়েছে। ইউরোপ থেকেও অনেকে আসতে চাইছেন। পাশাপাশি এটিও সত্যি, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছু শঙ্কাও কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৪ সালে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে ১৩টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছিল, তারও অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পাশাপাশি ট্যাক্স, শুল্ক ছাড় এবং মুনাফার প্রত্যাবাসন অন্যতম। দুঃখজনক হলেও সত্য, এক্ষেত্রে অগ্রগতি খুব সামান্যই। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জমির দুষ্প্রাপ্যতাকেও প্রতিবন্ধকতা মনে করা হয়। এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের আইনি জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা), অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করছে। এছাড়া ১১টি সংস্থার ৪১ ধরনের পরিষেবা দেয়ার ক্ষেত্রে এসব সংস্থার সার্বিক কার্যক্রমে গতি আনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২১ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশে বিদেশী সহায়তার প্রবাহ ও স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তিও কমবে। এছাড়া বাণিজ্য ও শুল্ক সুবিধাও কাটছাঁট হবে। এক্ষেত্রে রফতানিতে একক পণ্যনির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো ও রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বলছেন। এছাড়া প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান-দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। আশা করা যায়, আলোচ্য সামিটের মাধ্যমে এক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল আসবে।










