সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন। এ প্রতিবেদনে অন্য স্নাতক ডিগ্রির তুলনায় মেডিকেলের স্নাতক পর্যায়ে অকৃতকার্যতার অসমানুপাতিক চিত্র উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক সম্মান পর্যায়ের ডিগ্রিগুলোয় গড় পাসের হার ৯২ শতাংশ। স্নাতক কারিগরি ডিগ্রিগুলোয় গড় পাসের হার ৮০ শতাংশ। তার বিপরীতে এমবিবিএস পরীক্ষায় পাসের হার কেবল ৭০ শতাংশ। শুধু ওই শিক্ষাবর্ষ নয়, আগের কয়েক শিক্ষাবর্ষেও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যতার  হার বেশি। প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছেন মেডিকেল কলেজে। অথচ বাছাইকৃত এসব শিক্ষার্থীই হিমশিম খাচ্ছেন এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনে। প্রতি বছর অনেকেই অকৃতকার্যও হচ্ছেন। এতে অর্থ ও মূল্যবান সময়ের নিদারুণ অপচয় ঘটছে। প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাসহ নানা কারণে এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

বর্তমানে দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৩৭। আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৭২। এর বাইরে ছয়টি মেডিকেল কলেজ সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার আসন রয়েছে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে সরকারি কলেজগুলোয় ৪ হাজার ৩০০ এবং প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থী বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে  মেডিকেল শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের মানে, ডিগ্রিতে। মেডিকেল শিক্ষা সাধারণ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের দ্বারা হাতেকলমে পাঠদান নিশ্চিত না হলে স্নাতক পর্যায়ের চিকিৎসক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সেজন্য কোনো মেডিকেল কলেজে প্রতি বছর ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলে সেখানে কমপক্ষে ১৯৮ জন শিক্ষক প্রয়োজন। বাস্তবে এ অপরিহার্য শর্তের অনেক কম শিক্ষক নিয়ে চলছে দেশের মেডিকেল কলেজগুলো। শুধু শিক্ষকস্বল্পতা নয়, ঘাটতি রয়েছে ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মতো অবকাঠামোয়। হাসপাতাল ছাড়া মেডিকেল শিক্ষা বিশ্বের কোনো দেশে কল্পনা করা হয় না। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় থাকলেও বেসরকারি অনেক কলেজে নিজস্ব হাসপাতাল নেই। ফলে হাতেকলমে শিখতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। বড় ধরনের শিখন ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে তাদের। এছাড়া আছে পাঠ্যক্রম সম্পর্কিত অতিরিক্ত চাপ। সব মিলিয়ে প্রতি বছর অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে অকৃতকার্য হচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত দেশে মেডিকেল শিক্ষা সার্বিকভাবে সুসজ্জিত। শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক, অত্যাধুনিক মেডিকেল প্রযুক্তি, সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব হাসপাতাল পরিচালনা, পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা আছে সেখানে। রয়েছে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পাঠ্যক্রম। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে মিথস্ক্রিয়ামূলক পরিবেশ। শিক্ষার্থীরা যাতে হতাশায় না ভোগেন এবং মানসিক চাপ উতরাতে পারেন সেজন্য ক্যাম্পাসভিত্তিক মনঃসামাজিক কাউন্সিলের ব্যবস্থা আছে। এসব দিক থেকে প্রতিবেশী ভারতও পিছিয়ে নেই। প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাদি নিশ্চিতের পাশাপাশি দেশটির মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের সব ধরনের মানসিক সমর্থনও জোগায়, যার কারণে সেখানে বিশ্বমানের চিকিৎসক যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি পাসের হারও অনেক বেশি, ৯০ শতাংশের ওপরে। সুতরাং বাইরের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

স্বাস্থ্যশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেডিকেল শিক্ষার পাঠ্যক্রমের ব্যাপ্তি অন্যান্য স্নাতক ডিগ্রির চেয়ে বেশি। সাধারণ ডিগ্রির মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন ভাগ করা গেলেও এমবিবিএস কোর্সের ক্ষেত্রে আলাদা করা যায় না। মাথার চুল থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে জানতে হয়। কম গুরুত্বপূর্ণ, বেশি গুরুত্বপূর্ণ এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ ডিগ্রিতে চাপ কিছুটা বেশি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের ৩২ শতাংশ মেডিকেল শিক্ষার্থী এখন ইমপোস্টার সিনড্রোমে ভুগছেন। নিজেদের প্রতারক ও অযোগ্য ভাবছেন তারা। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভুগছেন অনেকে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ফলে। মূলত বাড়তি চাপের কারণে এমনটা হচ্ছে। কাজেই চাপ কমাতে মেডিকেল কলেজগুলোয় একটা সহায়ক মনঃসামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিথস্ক্রিয়া বাড়ানো এবং সৌহার্দমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রয়োজনে মানসিক সমস্যা থেকে উত্তরণে ক্যাম্পাসভিত্তিক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের শুধু মানসিক সমর্থন দেয়া যথেষ্ট নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। দেশের বেশির ভাগ মেডিকেল কলেজই শিক্ষক সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে পুরনো মেডিকেল কলেজগুলোয় এ সংকট আরো প্রকট। এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম, তার ওপর পুরনো প্রায় সব কয়টি মেডিকেল কলেজেই স্নাতকের পাশাপাশি স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে। এসব মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব ছিল এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের পড়ানো এবং শেখানো। এখন তারা কি এমবিবিএস ছাত্র পড়াবেন নাকি স্নাতকোত্তর ছাত্র পড়াবেন, সেই দ্বিধায় পড়েছেন। তাদের ওপর আছে আবার রোগী চিকিৎসার বাড়তি দায়িত্ব। এছাড়া রয়েছে ল্যাব, শিক্ষা সরঞ্জাম ও অন্য অবকাঠামোগত সংকট। ফলে সব ক্ষেত্রেই এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকের মানের যেমন অবনমন ঘটেছে, তেমনি অনেকেই অকৃতকার্যও হচ্ছেন। সুতরাং মেডিকেল শিক্ষার মান বাড়ানো কিংবা শিক্ষার্থীদের দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। স্নাতকোত্তর কোর্সগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর করতে হবে, যাতে শিক্ষক ঘাটতির সমস্যা কিছুটা হলেও কমে।

ইউজিসির প্রতিবেদনে মেডিকেলে স্নাতক পর্যায়ে অকৃতকার্যতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা হতাশাজনক। এটি গভীরভাবে আমলে নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সত্য যে দ্বাদশ শ্রেণী উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষার্থী চিকিৎসক হওয়ার জন্য যে শিক্ষা নিচ্ছেন, তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। এখানে বাস্তবসম্মত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাদের সাহিত্য, সমাজ, নৃবিজ্ঞান শেখানো হয় না। ফলে ওই শিক্ষার্থী এ সমাজের সঙ্গে তার জ্ঞানের সমন্বয় করতে পারছেন না। সুতরাং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী করে তুলতে পাঠ্যক্রমেও প্রয়োজনীয় পরিমার্জন দরকার। সেখানে সমাজ সম্পর্কিত বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে সন্নিবেশিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। স্বাস্থ্যশিক্ষা বিশেষজ্ঞ, কর্তৃপক্ষ ও সরকারের জোরালো প্রচেষ্টায় দেশের মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে এবং চাহিদা অনুসারে মানসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি হবে, এমনটাই প্রত্যাশা।