দ্রুত পড়ে যাচ্ছে টাকার দাম। অর্থাৎ টাকার নিরিখে ডলারের দাম বাড়ছে। দেখতে দেখতে তা ৯৪-৯৫ টাকা ছুঁয়েছে। অবমূল্যায়নের ধাক্কাটা যদি শুধু সমাজের উপরতলার গুটিকয়েক মানুষের ওপর পড়ত, যদি এর কুপ্রভাব কিছু বিত্তবান বিদেশ ভ্রমণেচ্ছুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে বিষয়টা নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু টাকার দাম কমতে থাকায় এরই মধ্যে আমদানীকৃত সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ডলারের সংকটে এলসি খুলতে পারছেন না ছোট ব্যবসায়ীরা। দেশের ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকরা ঋণপত্র খুলতে গিয়ে বিপদে পড়ছেন। ব্যাংকের স্বার্থে বড় ব্যবসায়ীদের কেনা দামেও ডলার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একই দামে ডলার দেয়া সম্ভব নয়। ফলে এ শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের থেকে বাড়তি দাম নিচ্ছে ব্যাংক, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। ডলার সংকট রোধে বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা/ব্যবসানির্ভর খাত স্থবির হয়ে পড়বে, যা কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে না।

বাজারের আর পাঁচটা জিনিসের মতো টাকা-ডলারের বিনিময় মূল্যও নির্ভর করে চাহিদা ও জোগানের ওপর। টাকার নিরিখে ডলারের দাম বাড়ছে, মানে টাকা-ডলার বিনিময়ের বাজারে চাহিদার তুলনায় ডলারের জোগান কমছে। টাকার সঙ্গে ডলার বিনিময়ের একটা বড় সূত্র আমদানি ও রফতানি। যিনি আমদানি করছেন, তিনি টাকা দিয়ে ডলার কিনতে চাইছেন; যিনি রফতানি করছেন, তিনি ডলার উপার্জন করে টাকার বিনিময়ে সেই ডলার বিক্রি করছেন। আমদানির তুলনায় রফতানি কম হতে থাকলে ডলারের চাহিদা তার জোগানের থেকে বাড়তেই থাকবে, ফলে বাজারের নিয়মে টাকার দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে। এ প্রবণতা ঠেকানো যেতে পারে, যদি অন্য কোনো সূত্রে ডলার পাওয়া যায়। আমদানি ও রফতানি মূল্যের মধ্যে তফাতের পোশাকি নাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি। সাধারণত এ ঘাটতির কিছুটা মেটানো হয় অনাবাসী বাংলাদেশীদের বিদেশ থেকে পাঠানো ডলার দিয়ে, কিছুটা সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত ডলার দিয়ে, খানিকটা আবার বিদেশী ঋণ কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে খয়রাতি হিসেবে পাওয়া অর্থ দিয়ে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের মোট আমদানির মূল্য রফতানি মূল্যের থেকে বেশি হয়ে আসছে। সমস্যা হলো, ইদানীং এ দুইয়ের ফারাকটা খুব বেড়ে গেছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, টাকা অবমূল্যায়ন করার মতো অজনপ্রিয় নীতির প্রতি কেন গুরুত্ব দেয়া উচিত? যদি সময়মতো টাকার অবমূল্যায়ন করা হতো, তাহলে আকাশচুম্বীতে পৌঁছে যাওয়া আমদানি ঠেকানো যেত। টাকার মান অবমূল্যায়ন হলে আমদানি করা জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, ফলে ভোগ কমে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের প্রথম বক্তব্য, এ অবস্থার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির থেকে আন্তর্জাতিক মন্দা, বিশেষত ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট অনেক বেশি দায়ী। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, দেশের মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ইউরোপের সংকট দুভাবে আমাদের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এক. সম্মিলিতভাবে ইউরোপের বাজারে আমাদের মোট রফতানির বড় অংশ বিক্রি হয়। কাজেই ইউরোপে মন্দা চলার ফলে আমাদের রফতানি প্রভাবিত হচ্ছে, কমছে বিদেশী মুদ্রার উপার্জন, ফলে টাকার মূল্যের ওপর চাপ বাড়ছে। দুই. ইউরোপে মন্দা চলার কারণে ডলারের তুলনায় ইউরো দুর্বল হচ্ছে। ফলে যে ইউরো আমরা ইউরোপ থেকে রফতানির মাধ্যমে উপার্জন করছি, ডলারে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মূল্য কমে যাচ্ছে। সরকারের দ্বিতীয় বক্তব্য, নানা কারণে পৃথিবীর প্রায় সব উল্লেখযোগ্য মুদ্রার তুলনায় এখন মার্কিন ডলারের দাম বাড়ছে। কাজেই টাকার অবমূল্যায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশী টাকা যত দুর্বল হচ্ছে, বিশ্বের বাজারে ততই কিন্তু দাম কমছে আমাদের রফতানি। ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ কেন কাজে লাগাতে পারছেন না? বিশেষ করে চীন যখন কৃত্রিমভাবে তার মুদ্রার মূল্য কমিয়ে রেখে দেশের রফতানি বিপুলভাবে বাড়িয়ে যেতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত, কয়েক মাস ধরে মার্কিন ডলারের তুলনায় প্রায় প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটেছে—এটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও সত্যি যে, গত মার্চ থেকে শুধু মার্কিন ডলার নয়, ইয়েন, পাউন্ড, ইউরো, অস্ট্রেলিয়ান ডলার, কানাডিয়ান ডলার, চীনা ইউয়ান ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি মুদ্রার তুলনায় টাকার দাম কমেছে। অর্থাৎ, মার্কিন ডলারের নিরিখে এ মুদ্রাগুলো যতটা অবমূল্যায়িত হয়েছে, বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে তার থেকে বেশি। অর্থাৎ আলাদা করে টাকার কিছু সমস্যা আছে, যা অন্যদের নেই। স্বীকার করা ভালো, কিছু গভীর অভ্যন্তরীণ সমস্যা আমাদের চলছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার সময় আমদানি ব্যাপকভাবে কমে যায়। একই সময় হুন্ডি বন্ধ থাকার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বগতিতে ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু করোনাভাইরাসের জের ধরে লকডাউন ও ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে পণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে। ফলে জিনিসপত্রের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা বাংলাদেশ ব্যাংক আঁচ করতে পেরেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, বিলাসবহুল পণ্য আমদানি করার জন্য ঋণপত্র খোলার সময় ব্যবসায়ীদের আমদানি বাবদ খরচের ৭৫ শতাংশ টাকা অগ্রিম জমা দিতে হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এর মাধ্যমে আমদানি কমে যাবে। কিন্তু এ পদক্ষেপ আমদানি কমাতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে সেটি নিয়ে কিছুটা সন্দেহের অবকাশ রয়ে যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে এত বেশি অগ্রিম অর্থ জমা দিয়ে বিলাসবহুল পণ্য কেনা কঠিন হয়ে যাবে। অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীরা ঠিকই পণ্য আমদানি করবেন এবং উচ্চবিত্তরা সেসব পণ্য কিনবে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বাজার থেকে বিদায় নেবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ওইসব পণ্যের দাম নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করবেন বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে, সুনির্দিষ্ট কিছু বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি আগামী কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রাখা যায় কিনা তা ভেবে দেখা।

বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সুনির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, সহসা সংকটের মোচন হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাজারে ডলার সরবরাহ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে আধিপত্য করা ছয়টি দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডলারের মান ঊর্ধ্বগামী থাকলে টাকার মান আরো কমবে। গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মজুদ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে। টাকার মান অঘোষিতভাবে অবমূল্যায়িত হয়ে গেছে। ফলে আরো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো বিকল্প থাকবে না আগামীতে। বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রতি বছর বিপুল অংকের অর্থ পাচার হয়। আমাদের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) সক্ষমতা বাড়াতে হবে এক্ষেত্রে। প্রায়ই শোনা যায়, আমদানি-রফতানিকালে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই অর্থের বড় অংশ পাচার হয়। কোনো ফাঁকফোকর গলে কোনো দুষ্টচক্র ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে কারসাজি যেন না করতে পারে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে যাতে বেশি দামে ডলার বিক্রি করতে না পারে সে লক্ষ্যে তদারকি জোরদার করতে হবে। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশী—এ তিন ধরনের ব্যাংকের তিন রকম রেট। মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেক রেট। এটাও ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণ। এগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে।