বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঠিক রাখতে বর্তমানে বাড়তি মূল্যেই পণ্যটি আমদানি করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। সংস্থাটির এ বাবদ ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সরবরাহে ৮৩ শতাংশ অর্থই ব্যয় হচ্ছে এলএনজিতে। এলএনজি আমদানিতে প্রয়োজনীয় এ অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে পেট্রোবাংলা এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনাময় একটা দেশে এ সংকট দুঃখজনক। গ্যাস সরবরাহ কমে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি অবহেলাজনিত। গত ২২ বছরে প্রতি বছর গড়ে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। এটি না করার মতোই। স্থলভাগে তিন ভাগের দুই ভাগ এখনো অনুসন্ধানের বাইরে পড়ে আছে। বিপুল সমুদ্রসীমাও পড়ে রয়েছে, যা দুঃখজনক। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা দরকার, যেখানে স্থানীয় অনুসন্ধান সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় অর্থনীতির চাকা স্বচ্ছন্দে চালু রেখেছে। ২০১০ সালে এসে গ্যাস সংকট জ্বালানি খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময়ে আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। ২০১৫ সালে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণয়নকালে নির্ধারিত হয় যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখবে কয়লা, যার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হবে। এটা উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বাড়ার একটি ধাপ বলে বিবেচিত হচ্ছে এখন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানির মাধ্যমে গ্যাস সংকট অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এলএনজি ব্যয়বহুল, এর ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, এলএনজি সরবরাহ করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাপক ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে। জ্বালানি পরিকল্পনাও সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু এতেও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কোনো উন্নতি লক্ষ করা যায়নি। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস, কয়লার অনুসন্ধানে গভীর দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ ক্রমে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। দেশ গ্যাস অনুসন্ধানে এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। সুতরাং দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া যৌক্তিক নয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন।
ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি জোগানোতেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছে। ভিয়েতনাম বর্তমানে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে মোট বিদ্যুতের যথাক্রমে ৩১ ও ২৬ শতাংশ উৎপাদন করছে। দেশটিতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের অবদান ৪১ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। এখন দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একইভাবে কম্বোডিয়াও গতানুগতিক অনবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও সমরূপ অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশীয় উৎসনির্ভর। ফলে সেসব দেশে জ্বালানি ব্যয় আপেক্ষিকভাবে কম। এসব দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশকেও দেশীয় জ্বালানিতে মনোযোগ দিতে হবে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশীয় উৎস কমে আসায় গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়নের চাকা সচল রাখতে ব্যয়বহুল এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানির বিকল্প কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। দেশের শিল্পায়নে চাহিদা পূরণ করতে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। এখন যেহেতু আমাদের নিজস্ব গ্যাসের উৎস সীমিত, তাই বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে। সরকার এরই মধ্যে কাতার, ওমানসহ কয়েকটি দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ করছে। সামনের দিকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনে তা সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা যে গতিতে বাড়ছে, উৎপাদন সেই গতিতে বাড়ছে না। ফলে আমদানি করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। এলএনজি একটি সহজে পরিবহনযোগ্য উচ্চমূল্যের জ্বালানি, যা শিল্পোন্নত অথচ নিজস্ব জ্বালানি নেই—এমন দেশগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এলএনজি মূল্যের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী উল্লম্ফন বিশ্ববাজারে এটিকে সর্বাপেক্ষা অস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যের জ্বালানিতে পরিণত করেছে। দেশের অর্থনীতি এমন আর্থিক বোঝা কত দিন সামাল দিতে পারবে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আর্থিক চাপের কারণে সাময়িকভাবে এলএনজি আমদানি বন্ধ করতে হলে অনেক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ও শিল্পকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করা প্রয়োজন। অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী রাখতে হলে এর বিকল্প নেই। শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে অতিদ্রুত এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলকেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিল্প খাতের পাশাপাশি এলএনজির বাড়তি দাম সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমদানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে, এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
হতাশার বিষয় হলো, স্থানীয় পর্যায়ে গত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ব্যয়বহুল আমদানিতেই খোঁজা হয়েছে জ্বালানি সংকটের সহজ সমাধান। উত্তোলন ও অনুসন্ধান যেটুকু হয়েছে, তাতেও প্রাধান্য পেয়েছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত খনিজ জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডও (বাপেক্স) হয়ে পড়েছে অনেকটাই গুরুত্বহীন। যদিও বিদেশী নামি কোম্পানিগুলোর চেয়েও অনেক স্বল্প ব্যয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে বাপেক্স। কোম্পানি হিসেবে গঠনের পর শুরুতেই বেশকিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে সক্ষমতার জানান দিয়েছিল বাপেক্স। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। উল্টো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বাপেক্সের কাজ তুলে দেয়ারও নজির রয়েছে। যদিও দেশের স্থলভাগে বিদেশী কোম্পানিগুলোর তুলনায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বাপেক্সের সাফল্যের হার অনেক বেশি। এর পরও দীর্ঘদিন স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে সংস্থাটি। বলা হয়, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে। এমন প্রবণতা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে প্রতিবন্ধক।










