দেশে বিদ্যুতের বড় অংশ উৎপাদন হচ্ছে আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে। কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লাসহ সব অনবায়নযোগ্য জ্বালানিপণ্যের দাম বাড়ছে। ভবিষ্যতে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা করছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সিসহ (আইইএ) জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। মূল্যবৃদ্ধির চলমান ধারা বজায় থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন আরো ব্যয়বহুল হবে। এ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন বাড়ানোর কথা বলছেন। জামালগঞ্জে কয়লা ছাড়াও অন্যান্য খনিজসম্পদের মজুদ থাকার কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত মেলে না। এক্ষেত্রে গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগেই এটি হতে হবে।

জামালগঞ্জের কয়লা খনিটি আবিষ্কার হয় পাকিস্তান আমলে, ১৯৬২ সালে। ২০১৫ সালে ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মাইনিং অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডকে দিয়ে খনিতে মজুদকৃত কয়লায় গ্যাসের অস্তিত্ব আছে কিনা, সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে বিদ্যমান কয়লা-গ্যাসের উত্তোলন যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। পরে পেট্রোবাংলা সেখানে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। ওই সমীক্ষায় খনিটি থেকে সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন সম্ভব বলে উঠে আসে। বলা হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত কারিগরি সক্ষমতা থাকতে হবে, যা বাংলাদেশের নেই। এজন্য দরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামের অস্থিতিশীলতা মাথায় রেখে অনেক দেশই বর্তমানে দেশীয় উৎসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিয়েছে। পরিবেশ ইস্যুতে ভারত ও চীন কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও তারা ২০৪০ সাল পর্যন্ত কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখবে। বিদ্যমান খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনও করবে। উন্নত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা মাটির অনেক গভীর থেকেও কয়লা উত্তোলন করছে। চীন-ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়াও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশগুলো ঝুঁকিমুক্তভাবে অত্যাধুনিক উপায়ে গভীর কূপ থেকে কয়লাসহ অন্য খনিজ সম্পদ উত্তোলন করছে। জামালগঞ্জ কয়লাখনির বিপুল পরিমাণ মজুদ কয়লা অর্থাৎ কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন ও মিথেনকে, ইউসিজি (আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন) অর্থাৎ খনির তলদেশেই কয়লাকে পুড়িয়ে গ্যাসে রূপান্তর করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে সর্বাগ্রে পরিবেশের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে কয়লা উত্তোলন যৌক্তিক হবে না। একই সঙ্গে মানুষ, বসতভিটা, কৃষি জমি প্রভৃতি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা চাই। কষ্ট বেনিফিট রেশিওতে লাভজনক হলেই কেবল এখানে বিনিয়োগ করা যেতে পারে, নতুবা নয়।

বলা হচ্ছে, জামালগঞ্জের কয়লা খনির গভীরতা অনেক বেশি। অন্য কয়লা খনির গভীরতা যেখানে ১৫০-৫০০ মিটার, সেখানে জামালগঞ্জের কয়লা খনির গভীরতা ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিটার। এত গভীর থেকে আমাদের মতো জনবহুল দেশে কয়লা উত্তোলন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে আলোচ্য খনির বাণিজ্যিক উত্তোলনযোগ্যতা নিয়ে প্রথমত আরেকটি বিস্তৃত জরিপ করা প্রয়োজন। ওই জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে উত্তোলনের  ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রযুক্তি প্রয়োজন, সে ধরনের অগ্রসর প্রযুক্তি দেশীয় কোনো কোম্পানির নেই। সেক্ষেত্রে এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা আছে সে ধরনের বিদেশী কোম্পানি দিয়ে কয়লা উত্তোলন করা যায় কিনা, সেটি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। তাতে অবশ্যই দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে, এর ব্যয়-সুফলও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে কাজটি করা যায় কিনা, সেটিও মাথায় রাখতে হবে। গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্রের আরো উদ্যোগী হওয়াটা এখন সময়ের দাবি।   

খবর মিলছে, এরই মধ্যে বড়পুকুরিয়া থেকে পুনরায় কয়লা উত্তোলনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বাকি খনিগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এটা ইতিবাচক, তবে অবশ্যই পরিবেশ, মানুষের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানও বাড়ানো চাই। তবে প্রকৃত চিত্র হলো,  দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেক সময় পার হলেও আমাদের দেশে এটি করা হয়নি। এটি জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বাড়াতে হবে জাতীয় সক্ষমতাও।

দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে। জিডিপিতে শিল্পের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। এ খাতের উত্তরোত্তর এগিয়ে যাওয়ার মূল রসদ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। শিল্প খাতে যত সস্তায় ও সহজলভ্যভাবে জ্বালানি-বিদ্যুৎ জোগানো যাবে, অর্থনীতি তত বেগবান হবে। পণ্য উৎপাদনে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের উদ্বায়িতায় অর্থনীতি বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সেদিক থেকে জ্বালানি ক্ষেত্রে  ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তারও পরিপন্থী। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে।