পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকার সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দরে রূপ নিয়েছে মোংলা বন্দর। এরই মধ্যে বন্দরটি দিয়ে তৈরি পোশাকপণ্য রফতানি শুরু হয়েছে। এছাড়া খাদ্যশস্য, কাঁচামাল ও গাড়ি আমদানিতে মোংলা বন্দর ব্যবহূত হচ্ছে বেশকিছু বছর ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে লাভজনকও হয়ে উঠেছে এ বন্দর। এসবই আশাজাগানিয়া বিষয়। কিন্তু মোংলা বন্দরকে অর্থনৈতিকভাবে অধিকতর আকর্ষণীয় করতে হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ড্রেজিং বাবদ ব্যয় কমাতে এবং পোর্টের সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। বন্দরের অবকাঠামো এখনো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে মোংলা বন্দরের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটি সদ্ব্যবহারে যথাযথ ব্যবস্থাও নিতে হবে। নতুবা একে ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছে সেটি হারিয়ে যেতে সময় নেবে না।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মোংলা বন্দর বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভারত ও ভুটানের পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। ভারতের জাহাজ পরীক্ষামূলকভাবে মোংলা বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে। এদিকে নেপাল ও ভুটান এত দিন ভারতের সমুদ্রবন্দরই ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু তাতে ওই দুটি দেশের পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ২০১৬ সালে মহাদেশীয় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারত নেপালে পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছিল। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের মধ্যে চারদেশীয় যানবাহন পরিবহন চুক্তি সই হলেও ভুটানের সংসদ এটি এখনো অনুমোদন করেনি পরিবেশের দোহাই দিয়ে। ভুটানের পরিবেশ সুরক্ষিত থাক, তা আমরাও চাই। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। নেপাল ও ভুটানের আমাদের মোংলা বন্দর ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। বন্দর ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে, যাতে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে তাদের পণ্য গন্তব্যে পৌঁছতে পারে। মোংলা বন্দর উন্নয়ন হলে শুধু ওই দুটি দেশ নয়, ভারতের অনেক পণ্যও এই বন্দর দিয়ে আনা-নেয়া লাভজনক হবে। আগে রাজধানী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের আমদানি-রফতানিকারকদের মোংলা বন্দরের প্রতি আগ্রহ ছিল কম। কারণ এ জেলাগুলো থেকে মোংলা বন্দরে পণ্য পাঠাতে কিংবা বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে যেতে ছিল ফেরি পারাপার। এর ফলে তাদের সময়, ব্যয় ও দুর্ভোগ বাড়ত। সে জন্য তারা পণ্য আমদানি-রফতানি করছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এখন পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহারে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এখান থেকে এরই মধ্যে গার্মেন্টস পণ্য বিদেশে রফতানি শুরু হয়েছে। এছাড়া চিংড়ি রফতানি করতে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে হতো। এক্ষেত্রে মোংলা বন্দর হতে পারে উত্কৃষ্ট বিকল্প। এ কথা সত্য, পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দরে চাপ বেড়েছে। তা সামাল দেয়ার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বন্দরের জেটি পর্যন্ত নয় মিটার ড্রাফটের নাব্য। বর্তমানে জেটিতে আছে সাত মিটার ড্রাফট। মোংলা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত হোসেন বলেন, বন্দরের জেটি ও পশুর চ্যানেল নিয়মিত ড্রেজিং, নির্মাণাধীন খুলনা-মোংলা রেললাইন দ্রুত চালু এবং ভাঙ্গা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন।
বর্তমানে মোংলা বন্দরকে আধুনিক করার লক্ষ্যে অনেক উন্নয়ন ও বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় হাতে নিয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বন্দর এলাকাকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বে রো রো ফেরি প্রতিস্থাপনসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে জাহাজ খালাসের সময় কমানোর প্রতিযোগিতা চলছে। মোংলা বন্দর ঘিরে এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করতে হবে। ঢাকার সঙ্গে মোংলার দূরত্ব কম, এ বছরের মধ্যে রেললাইনও যুক্ত হয়ে যাচ্ছে; কাজেই এখানে বহুমাত্রিক যোগাযোগ হবে। কাজেই মোংলা বন্দর আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মোংলা বন্দর ঘিরে বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, পাস করা হয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আইনও। বেশকিছু যন্ত্র, নৌযান ও ইকুইপমেন্টও কেনা হয়েছে মোংলা বন্দরের জন্য। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেনও আনা হয়েছে। তবে কনটেইনার টার্মিনাল, মানসম্পন্ন আবাসন প্রভৃতি বিষয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে সেবার মানে অনেক উন্নতি ঘটাতে হবে।
আশার কথা হলো, একসময়ের রুগ্ণ মোংলা বন্দর এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে মোংলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে এ বন্দরে জাহাজ আসে। সিঙ্গাপুর-কলম্বো-হংকং হয়ে বেশির ভাগ জাহাজ মোংলায় আসে। বাংলাদেশের প্রায় নদীবন্দরগুলোর সঙ্গে মোংলার সংযুক্তি যেমন রয়েছে, তেমনি উপকূলীয় জাহাজ চুক্তির মাধ্যমে কলকাতা বন্দর এবং থাইল্যান্ডও মোংলার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে, যা মোংলাকে আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে আকাশপথের চেয়ে সমুদ্রপথই সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী। উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে সব দেশই সমুদ্রবন্দর দিয়েই তাদের সিংহভাগ আমদানি-রফতানির কাজ সম্পন্ন করে। এক সিঙ্গাপুর শুধু বন্দর কার্যক্রম দিয়ে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। একে ‘পোর্ট সিটি’ বলা হয় এবং বন্দর ব্যবহারে দেশটির অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ভারত, পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের দেশগুলোও সমুদ্রপথকেই আমদানি-রফতানির প্রধান অবলম্বন হিসেবে নিয়েছে। এসব দেশের একাধিক বন্দর থাকায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বন্দরকেন্দ্রিক অন্য অবকাঠামোসহ পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে মোংলা বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী ও আমদানি-রফতানিকারক ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে যাবে। এ বিবেচনায় ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মোংলা বন্দরকে আরো সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে।










