দেশে মজুদ গ্যাসে আর চলবে সাত বছর। কিন্তু কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের চেয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতে নতুন কোনো টেকসই বিনিয়োগ আসছে না। কিন্তু এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু সুলভে গ্যাসপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে পাইপলাইন স্থাপন করে ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেই; যেসব গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে নেই সেগুলোর উন্নয়ন। ফলে গ্যাসের সরবরাহ ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। স্পটমার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পথও রুদ্ধ হয়ে আসছে। বর্তমানে ইউক্রেন সংকট বিষয়টি আরো জটিল করে তুলেছে। এতে দেশের অর্থনীতির চাঙ্গা অবস্থানকে আরো দুর্বল করার আশঙ্কা বাড়ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গ্যাস খাতে বিনিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে জোগান দেয়া কঠিন। এ কারণে বিনিয়োগে প্রাধান্য নির্ধারণ করা জরুরি। প্রশ্ন হলো, অবকাঠামো উন্নয়ন নাকি গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বেশি বিনিয়োগ করা হবে? দেশে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসা ও আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বেশি করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। গ্যাসের নিশ্চয়তা নেই কিন্তু একের পর এক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎস নাকি আমদানির মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হবে, সেটি নির্ধারণ না করেই একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ যুক্তিসংগত নয়। যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়, তাহলে এ বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইপলাইন স্থাপন করে ফেলে রাখা হয়েছে। এজন্য প্রতি বছর সুদাসল পরিশোধ করতে হলেও অর্থনীতি গতিশীলে তার কোনো ভূমিকাই নেই। অথচ এ অর্থে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা গেলে আজ আমদানির ওপর এত নির্ভরশীলতা তৈরি হতো না। জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ভুলের কারণে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। গ্যাস খাতের অবস্থাও অনেকটাই সে রকম। সময় ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। তাই সরকারকে গ্যাসের অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে অনুসন্ধান ও সরবরাহ নিশ্চিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। 

গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। স্পট মার্কেট থেকে বেশি পরিমাণ এলএনজি কেনায় ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। কারণ স্পট মার্কেট অত্যন্ত অস্থির। এ মার্কেট থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ এলএনজি কেনা উচিত ছিল, আর ৯০ শতাংশ কেনা উচিত ছিল একাধিক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে। তাহলে এখন এলএনজির বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও সরকারের লোকসান তেমন বাড়ত না। কিন্তু পরীক্ষিত এ নীতি গ্রহণ করা হয়নি। এটিও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে ভ্রান্ত পরিকল্পনা গ্রহণের ফল। দেশের দুই এলএনজি টার্মিনাল বছরে ৭০ লাখ টন এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন (প্রক্রিয়াকরণ) করতে পারে। কিন্তু কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বছরে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এখানেও অবকাঠামো সক্ষমতা অব্যবহূত থেকে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী রাখতে হলে এর বিকল্প নেই। শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে অতিদ্রুত এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী মহলকেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিল্প খাতের পাশাপাশি এলএনজির বাড়তি দাম সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ যত আগে নিশ্চিত হয়েছে, সেই অঞ্চল তত এগিয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলে বগুড়ার পর গ্যাস সরবরাহ নেই; যে কারণে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুরের ১০ জেলায় শিল্পের প্রসার নেই বললেই চলে। কয়েকটি সুগার মিল ছাড়া ভারী শিল্প বলতে গেলে কিছুই নেই। একই অবস্থা খুলনা ও বরিশাল বিভাগেও। শিল্প-কারখানা না থাকায় এসব এলাকার লোকজনের ঢাকামুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। কর্মসংস্থানের অভাবে একসময় কার্তিক মাস এলেই মঙ্গা দেখা দিত উত্তরাঞ্চলে। বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগে মঙ্গা বিতাড়িত হলেও মানুষের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্য এখনো ফেরেনি। গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। শুধু বিশেষ এলাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, প্রধানমন্ত্রী চান সারা দেশের সুষম উন্নয়ন। দেশে ১০০ বিশেষ ইকোনমিক জোন স্থাপন করা হচ্ছে তারই অংশ হিসেবে। এসব ইকোনমিক জোনে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ইতিবাচক নির্দেশনা রয়েছে। যে কারণে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোন উৎসের গ্যাস বেশি ব্যবহার করা হবে, সেটি নিশ্চিত হয়ে অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। নইলে বিপুল বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সবসময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অথচ অনেকটা সময় পেরোলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া সমীচীন নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

হতাশার বিষয় হলো, স্থানীয় পর্যায়ে গত কয়েক দশকে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে জ্বালানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ব্যয়বহুল আমদানিতেই খোঁজা হয়েছে জ্বালানি সংকটের সহজ সমাধান। উত্তোলন ও অনুসন্ধান যেটুকু হয়েছে, তাতেও প্রাধান্য পেয়েছে বিদেশী কোম্পানিগুলো। এতে রাষ্ট্রায়ত্ত খনিজ জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডও (বাপেক্স) হয়ে পড়েছে অনেকটাই গুরুত্বহীন। যদিও বিদেশী নামি কোম্পানিগুলোর চেয়েও অনেক স্বল্প ব্যয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে বাপেক্স। কোম্পানি হিসেবে গঠনের পর শুরুতেই বেশকিছু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে সক্ষমতার জানান দিয়েছিল বাপেক্স। এরপর বিভিন্ন সময়ে দেশের জ্বালানি খাতে বিদেশী কোম্পানির কর্মতত্পরতা বাড়ায় সংস্থাটি অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বাপেক্সের দেশের গ্যাস খাতের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি। উল্টো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বাপেক্সের কাজ তুলে দেয়ারও নজির রয়েছে। যদিও দেশের স্থলভাগে বিদেশী কোম্পানিগুলোর তুলনায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বাপেক্সের সাফল্যের হার অনেক বেশি। এর পরও দীর্ঘদিন স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে সংস্থাটি। বলা হয়, বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এখনো তিমিরেই রয়ে গেছে। এমন প্রবণতা টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পথে প্রতিবন্ধক।

প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান জোরদারে ‘দেশজ প্রাকৃতিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নীতিমালা, ২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানীকৃত এলএনজি অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে সরবরাহকৃত জ্বালানির মূল্য বাড়ছে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অনশোর (ভূ-ভাগে) ও অফশোরে (সমুদ্রসীমায়) গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। এজন্য নানা উদ্যোগের কথাও নীতিমালায় রয়েছে। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা থেকে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর বিষয়টিও এতে রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য নীতিমালা প্রণয়নের তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি নির্ভরতাই বেড়েছে। গ্যাস সংকট মেটাতে হলে ভূভাগে ও সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে শুধু প্রতিশ্রুতি বা নীতিমালাই নয়, সত্যিকার অর্থে বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে দেনদরবার বাড়াতে হবে।

নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা ও অদক্ষতা স্পষ্ট। সরকার এসব সমস্যার দিকে নজর না দিলে ভবিষ্যতে গ্যাস সংকটের সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। জরুরি কিছু খাতের সাময়িক সংকট মেটাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে সরকার এলএনজি আমদানি করতেই পারে। তবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দেশে গ্যাসের মজুদ অনুসন্ধানের বিকল্প নেই।