আমাদের সমাজে অটিজম ও অটিস্টিকদের নিয়ে এখনো জ্ঞানের স্বল্পতা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি দূর করা এবং সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সমর্থন ও অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। অটিস্টিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে ২ এপ্রিলকে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও অটিস্টিকদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও সচেতনতা বৃদ্ধিতে নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের এবারের অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় রাখা হয়েছে ‘‌রূপান্তর: সবার জন্য স্নায়বিক-অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি বিশ্বের দিকে’। 

বস্তুত অটিজম হচ্ছে স্নায়বিক বিকাশসংক্রান্ত সমস্যা, যেটা সামাজিক বিকলতা, যোগাযোগ অর্থাৎ কথা বলার প্রতিবন্ধকতা কিংবা ভিন্ন ধরনের আচরণের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়। এটি মূলত মস্তিষ্কের সমস্যা, যা একজন ব্যক্তির অন্যদের সঙ্গে কথা বলার বা যোগাযোগের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। তাই এটিকে সহজ ভাষায় বিশেষজ্ঞরা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) বা মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা বলে থাকেন। একজন অটিস্টিক মানুষের যোগাযোগ বা কথা বলার প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন এবং আচরণে ভিন্নতার মাধ্যমে এ লক্ষণ প্রকাশ হয়। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ৭০-৮০ জন শিশুর মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। প্রতিদিন এর নির্ণয়ের সংখ্যা বাড়ছে আমাদের মধ্যে। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, জিনগত ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে এটি হতে পারে। এ স্নায়বিক বিকাশের সমস্যার নানা লক্ষণ রয়েছে, যেগুলো কোনো শিশুর মধ্যে দেখা দিলে পরিবার ও অভিভাবকদের উচিত হবে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে শরণাপন্ন হওয়া। মূলত শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই এ সমস্যার লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোনো শিশুর বয়স অনুযায়ী ঠিকঠাক কথার বলা শুরু না হওয়া, শিশু কানে শুনতে পায় অথচ কথা না বলা, শিশু চোখে চোখ রেখে কথা না বলা, আড় চোখে তাকানো এবং ডাক দিলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকা অর্থাৎ বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ দেখা দেয়া যেমন একই খেলা বারবার খেলতে থাকা, কোনো কারণ ছাড়াই ফ্যান, গাড়ির চাকার মতো গোল ঘুরন্ত জিনিসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, খুশি হলে হাত-পা ঝাঁকাতে শুরু করা, পায়ের পাতা না ফেলে বুড়ো আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটাচলা কর, অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশায় আগ্রহী না হওয়া। অটিজম পাঁচ ধরনের হয়। এগুলো হলো— ১) ক্ল্যাসিক্যাল অটিজম, যাকে আর্লি ইনফ্যানটাইল অটিজমও বলা হয়। এতে শিশুর বিকাশে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যেমন কথা বলার সমস্যা, যোগাযোগ ও বোঝার অসুবিধা ইত্যাদি। ২) এসপারজারস সিনড্রোম, এক্ষেত্রে রোগীর স্বাভাবিক কথা বলার ক্ষমতা থাকলেও কারো সঙ্গে মিশতে পছন্দ করে না। এরা কোনো একটি বিষয়ে খুব পারদর্শিতা রাখে। ৩) পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, এতে কথাবার্তার ভাষা বোঝা কঠিন লাগে এবং মানুষ বা বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। এছাড়া এতে শিশুর খেলার ধরনের মধ্যেও ভিন্নতা দেখা যায়। ৪) রেট সিনড্রোমের ক্ষেত্রে মাথা নড়াচড়া ধীরগতি হয়ে যায় এবং হাত-পা ঝাঁকানো বেড়ে যায়। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাস কষ্টকর হওয়া, অকারণে কান্না করার উপসর্গ দেখা যায়। ৫) সিডিডি বা চাইল্ডহুড ডিসইন্টারোগেটিভ ডিজঅর্ডার, এতে চোখে চোখ রাখতে পারে না এবং বারবার এক কাজ করতে থাকে, যেমন একভাবে হাত নাড়ানো। অটিজমের বিভিন্ন ধরন থাকলেও আসলে এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, যা থেকে পুরোপুরি পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তবে আজকাল বিভিন্ন ধরনের থেরাপির মাধ্যমে অটিস্টিক মানুষকে কিছুটা সহায়তা করা যেতে পারে। এদের থেরাপির মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপনে আনা অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। 

অটিস্টিকরা নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে, সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে এবং দৈনন্দিন কাজে অংশগ্রহণ করতে নানাভাবে অসংখ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তবে সঠিকভাবে তাদের সমর্থন ও সহায়তা থাকলে এসব চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করা যেতে পারে। এর ফলে তারা পরিপূর্ণ ও ফলপ্রসূ জীবন পেতে পারে। অটিস্টিকদের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো, ঠিকমতো যোগাযোগ করার সমস্যা। অটিস্টিকদের অনেকেই মৌখিক বা বাচনিক যোগাযোগে অর্থাৎ কথাবার্তায় অস্বস্তি ও অসুবিধা বোধ করে থাকে, যার কারণে নিজেদের প্রয়োজন বা অনুভূতি প্রকাশ করা তাদের পক্ষে কঠিন বিষয় হয়ে যায়। তাদের মুখের অভিব্যক্তি এবং দেহের ভাষার মতো অবাচনিক যোগাযোগ বুঝতেও সমস্যা হতে পারে, যা প্রায় সময় ভুল বোঝাবুঝি এবং ভুল ব্যাখ্যায় উপনীত হওয়ার কারণ হয়ে থাকে। 

এ ধরনের চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলার জন্য, অটিজম আছে এমন ব্যক্তিদের বিশেষ যোগাযোগের ইন্টারভেনশন সহায়তার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—স্পিচ থেরাপি, অগমেন্টেটিভ অ্যান্ড অল্টারনেটিভ কমিউনিকেশন (এএসি) ডিভাইসের ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগ থেরাপি ইত্যাদি। স্পিচ থেরাপি অটিস্টিকদের তাদের মৌখিক বা বাচনিকভাবে করা যোগাযোগের দক্ষতা উন্নত করতে বেশ সহায়তা করতে পারে। আর অগমেন্টেটিভ অ্যান্ড অল্টারনেটিভ কমিউনিকেশন (এএসি) ডিভাইসগুলো মৌখিক যোগাযোগের অসুবিধা যাদের রয়েছে তাদের সহায়তা করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ থেরাপির মাধ্যমে সমাজের মধ্যে ভাব বা মতামত আদান-প্রদানের সময়কার সামাজিক সংকেত এবং যোগাযোগের নিয়মগুলো আরো ভালোভাবে বুঝতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে অটিস্টিকদের মধ্যে আচরণগত কিছু সমস্যাগুলো খুব বেশি দেখা যায়। যেমন পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ করা, হাইপার অ্যাকটিভ থাকা এবং অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া ইত্যাদি থাকতে পারে, যা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এ সমস্যাগুলোর জন্য অ্যাপ্লাইড বিহেভিয়ার অ্যানালাইসিস (এবিএ), কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (সিবিটি) এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ কার্যকরী সাহায্য দিতে পারে। 

অটিজম যা মূলত এক ধরনের স্নায়বিক বিকাশ ব্যাহতজনিত সমস্যা, সেটিকে আমাদের সমাজে বহু জায়গায় এখনো প্রচণ্ড কুসংস্কারাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়। অটিজম আছে এমন শিশু মানেই মানসিক প্রতিবন্ধী নয়, নয় সে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও। আপনার আমার বুদ্ধাঙ্ক (আইকিউ) যেমন কমবেশি হয়ে থাকে, অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশুরা অন্যান্য প্রতিভায় এগিয়ে থাকে, কেউ হয়তো খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ বা আবার গণিতে স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় অনেক ভালো হয়ে থাকে। আজও অটিজমের জন্য অনেকেই সন্তানের বাবা-মা কিংবা পরিবারকে দায়ী করে। তাদের দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়। এ ধরনের আচরণ-ব্যবহার সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। কারণ আমাদের সমাজে এটি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আমরা এ বিষয় সম্পর্কে নিজেদের জ্ঞানের পরিধিকে বাড়ানোর মাধ্যমেই এসব ভ্রান্তিমূলক ধারণা কমতে পারে। বাংলাদেশে অটিজম সম্পর্কে সামাজিক অজ্ঞতার পাশাপাশি আরো একটি সমস্যা হলো, এখানে অটিস্টিকদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশেষায়িত পরিষেবা ব্যবস্থা নেই। যেটুকু পরিষেবা পাওয়া যায় সেটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যে কারণে অটিজম আছে এমন শিশুর পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় সহায়তা সরবরাহ তাই বেশ কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে যায়। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অটিজম নিয়ে সরকার বেশ কয়েক বছর ধরেই কাজ করে আসছে। ১৪টি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে গঠন হয়েছে জাতীয় টাস্কফোর্স। আটটি মন্ত্রণালয়/বিভাগের সমন্বয়ে গঠন হয়েছে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি। তারা অটিস্টিকদের নিয়ে কাজ করে আসছে। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়েও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধকতা আছে এমন শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, উন্নত বিশ্বের মতো অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। দেশের অটিজম সমস্যাকে সামাজিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তীকরণের মধ্যে আনতে হবে। এ গোষ্ঠীর যথাযথ থেরাপি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সক্ষম করতে পারলে তাদেরকেও সমাজের মূলধারায় সংযুক্ত করা সম্ভব। আমাদের অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরির দিকে কাজ করতে হবে, যা ‘‌নিউরোডাইভারসিটি’-কে আলিঙ্গন করে অটিস্টিকদের জন্য সহায়তাপূর্ণ বাসযোগ্য পরিবেশ নির্মাণ করবে। এছাড়া আরো বিশেষায়িত পরিষেবা সংযুক্তির পাশাপাশি বিশেষায়িত শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রশিক্ষক ও পর্যাপ্ত গবেষণার সংখ্যাও বাড়াতে হবে।

মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক