করোনাকালে মানুষের একটা বড় অংশের আয় কমে গেছে। গবেষণা বলছে, নতুন করে দরিদ্র হয়েছে আরো ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। নিত্যপণ্যের বাজার চড়া। আবশ্যকীয় অনেক পণ্যের দাম বাড়ছে ক্রমাগত। আবার করোনার অভিঘাত থেকে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যও এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তার মধ্যেই জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম একলাফে বাড়ানো হয়েছে লিটারে ১৫ টাকা। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে ৫৪ টাকা। শুধু তা-ই নয়, অটোগ্যাসের দাম বাড়ানোরও খবর মিলছে। দুঃসময়ে জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জনজীবনে আরো চাপ বাড়াবে।

দেশের জ্বালানিবাজার আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদের জ্বালানি খাতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। কিছুদিন ধরে বিশ্ববাজার অস্থির। সেখানে ক্রমেই বাড়ছে জ্বালানির দাম। স্বভাবত আমদানিনির্ভর জ্বালানি পণ্য ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করায় সরকারের লোকসান বাড়ছে। মূলত এ প্রেক্ষাপটেই আরেক দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে করা হয়েছে সমন্বয়।  নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন এখন ৮০ টাকা, প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েল ৬২ টাকা, এলপিজি সিলিন্ডার (১২ কেজি) ১ হাজার ৩১৩ টাকা আর প্রতি লিটার অটোগ্যাস প্রায় সাড়ে ৬১ টাকায় কিনতে হচ্ছে। গোটা অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে ব্যাপক অভিঘাতমূলক।

বর্তমানে বিশ্বের সব দেশই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত। মহামারীসৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে নিজস্ব অর্থনীতি যেন দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় সেজন্য প্রাণপণে লড়ছে সরকারগুলো। এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি অনেক দেশ, বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রাখতে কিছু দেশ এরই মধ্যে জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনস্বার্থের বিষয়টি। সম্প্রতি উদ্ভূত জ্বালানি প্রশ্নটি কীভাবে মোকাবেলা করলে জীবনযাত্রায় চাপ সহনীয় রাখা যাবে, সে চেষ্টা করছে। তার  মধ্যে প্রতিবেশী ভারত অন্যতম। ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে দাম না বাড়িয়ে দেশটির সরকার ডিজেল ও পেট্রলের ওপর আরোপিত শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। পেট্রলে কমানো হয়েছে ৫ রুপি এবং ডিজেলে ১০ রুপি। থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকাসহ আরো কিছু দেশ এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে সরকারের আয় কমলেও ভোক্তারা লাভবান হচ্ছেন। এটা এক ধরনের পরোক্ষ ভর্তুকি বৈকি। কাজেই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঘাত-প্রতিঘাত একমুখী নয়, বহুমুখী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় সরাসরি মানুষের যাতায়াত খরচ বেড়ে যাবে। পরোক্ষভাবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সব পণ্যের পরিবহন ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি তেলের ১৬ শতাংশ ব্যবহার হয় কৃষিতে। ফলে বাড়বে সেচের ব্যয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। এখনো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৩২ শতাংশ জ্বালানি তেলনির্ভর। ব্যয় বাড়বে সেখানেও। আবার কেরোসিন ও এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিতে গ্রাম-শহরে রান্নায় জ্বালানি খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে অটোগ্যাসে মূল্যবৃদ্ধিও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি ছোট গণপরিবহনের জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দেবে। এরই মধ্যে খবর মিলছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কোথাও কোথাও বাস ভাড়া ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারিভাবে বাস-ট্রাকের ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে সারা দেশে গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। চলছে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট। অভিজ্ঞতা বলে, শেষ পর্যন্ত মালিকদের চাপে সরকারও ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হবে। বলা চলে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সব শ্রেণী-পেশার মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর আরো পীড়নমূলক হবে।

বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্যই বাড়ানো হয়েছে। এটা নাকি করা হয়েছে বিপিসির লোকসান কমানোর জন্য। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় ২০১৩ সালে। এরপর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ছিল নিম্নমুখী। এ প্রেক্ষাপটে মাঝে ২০১৬ সালে দাম কিছুটা কমিয়েছিল জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু যতটা দরকার ছিল ততটা কমানো হয়নি। কমানো হয়েছিল মাত্র ৩ টাকা। এর পেছনে যুক্তি দেয়া হয়েছিল, দীর্ঘদিন থেকে বিপিসি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। সেটিকে মুনাফার ধারায় ফেরাতে দাম বেশি কমানো হয়নি। স্বভাবত গত সাত বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। প্রশ্ন হলো,  এই অল্প দিনের মধ্যেই কি প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা নিঃশেষিত হয়েছে, যার জন্য দাম বাড়াতে হলো? কভিড পরিস্থিতি ও নিত্যপণ্যের বেড়ে চলা ঊর্ধ্বমুখী দামে যখন মানুষ দিশাহীন, তখনই কি জ্বালানির দাম বাড়াতে হবে? দাম বাড়ানোর পরিবর্তে বরং বিপিসির মুনাফা মানুষের দুঃসময়ে ভর্তুকি হিসেবে দেয়ার জন্য বলছেন অনেকে। এতে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় আরেকটু স্বস্তি ফিরবে। একই সঙ্গে ভারত ও অন্য দেশের মতো শুল্কও কমানো যেতে পারে। বর্তমানে দেশে জ্বালানি পণ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ শুল্ক ও কর বিদ্যমান। এটা কিছুটা কমানো হলে তা ভোক্তাসাধারণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হবে। কাজেই সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারের সুবিবেচনাপ্রসূত কার্যকর উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি।

অন্য ১০টি পণ্যের চেয়ে জ্বালানির তফাত বিস্তর। এটি একটা কৌশলগত পণ্য। এর দাম বাড়লে মূল্যস্তরে প্রভাব পড়ে। এর কারণে স্থির আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার  আশঙ্কা থাকে। চাপে পড়ে গোটা অর্থনীতি। ঘোষিত নতুন দামে সেটিই হতে যাচ্ছে। সর্বোপরি, চলমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুতরাং মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।