দেশে পরিবহন ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়েছে ১৯১ পয়েন্ট। ২০১১ সালে এ সূচকের অবস্থান ছিল ১২৭ পয়েন্ট। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৮ পয়েন্টে। অন্য অনেক দেশের তুলনায় যা লক্ষণীয়ভাবে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে পরিবহন ব্যয়। দিন যত যাচ্ছে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যয় মেটানো ক্রমেই দুরূহ হয়ে উঠছে। সুতরাং সাধারণ্যের সার্বিক আর্থিক চাপ লাঘবে পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। 

পরিবহন ব্যয় ব্যক্তির মোট আয়ের ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে অর্থনৈতিক মানদণ্ডে সেটিকে সহনীয় ধরা হয়। এখন এ ব্যয় সার্বিকভাবে ২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পরিবহন ব্যয়ের এ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় গত দুই দশকে দেশের সড়ক অবকাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বিদ্যমান সড়ক-মহাসড়ক। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। কমছে না যানজট। যানজটের কারণে বাস-ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-লরিসহ সব যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে এর একটা ভূমিকা রয়েছে। আছে পরিবহন খাতের অনিয়মের প্রভাবও। সময়ান্তরে খাতটি আরো সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী হয়েছে। অথচ এ খাতে অবসান হয়নি বিশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি। পথে পথে, ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য। প্রতিটি যানবাহনকে বিভিন্ন জায়গায় গুনতে হচ্ছে অন্যায্য মাশুল, যার চূড়ান্ত চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। বেশ কয়েক বছর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ছিল নিম্নমুখী। তবে গত বছর থেকে এর দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মিল রেখে পণ্যবাহীসহ সব ধরনের স্থল পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। নৌপথেও নেয়া হয় একই ধরনের উদ্যোগ। সব মিলিয়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যয়।

চলমান মূল্যস্ফীতির ধারায় কম-বেশি সব দেশেই সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়েছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এ সূচক বেড়েছে ৪০ পয়েন্টের সামান্য বেশি। ভারতে বেড়েছে প্রায় ৫৫ পয়েন্ট। পাকিস্তানে বেড়েছে প্রায় ৬০ পয়েন্ট। আর মালয়েশিয়ায় বেড়েছে প্রায় ১৫ পয়েন্ট। তবে বাংলাদেশের তুলনায় এ বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম। ওইসব দেশে এটা সম্ভব হয়েছে পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দূর, সড়ক ও নৌপথের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা অবসান, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, এলাকাভেদে সুবিবেচনাপ্রসূত ভাড়া নির্ধারণ ও তার কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ফলে সেখানে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের ব্যয়।

আমরা দেখেছি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের নভেম্বরে গণপরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। একইভাবে নৌপথে ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে ৩৫ শতাংশ ও ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের লঞ্চ ভাড়া প্রায় ৪৩ শতাংশ বাড়ায় বিআইডব্লিউটিও। পণ্যবাহী নৌযানের ভাড়াও সমহারে বাড়ানো হয়। দুই বছরের মহামারীর অভিঘাতে জনজীবন বিপর্যস্ত। এ থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মানুষ। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ভাড়াও তাদের জন্য ভীষণ চাপের। তার মধ্যে নানা অজুহাতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। স্বল্প দূরত্ব ও দূরপাল্লা উভয় ধরনের যানবাহনে এ ধরনের অপকর্ম চলছে। বিআরটিএর পক্ষ থেকে রুটিন কিছু অভিযান চালিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে আর্থিক জরিমানা করা হয়, কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না কঠোর ব্যবস্থা। ফলে ভাড়া নৈরাজ্য থামছে না। ক্রমেই বেড়ে চলছে পরিবহন ব্যয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। 

শুধু জনজীবন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর একটা প্রভাব বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে খরচ হয় ০.০৬ ডলার। অথচ ভারতে প্রতি টনে ০.০২৪ ডলার এবং পাকিস্তানে ০.০২ ডলার খরচ হয়। বলতে গেলে প্রতিবেশী দুই দেশের চেয়ে আমাদের দেশে পরিবহন খরচ তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি আমদানি-রফতানি। পরিবহন ব্যয় বেশি হলে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে আমদানি-রফতানিতে। একইভাবে কৃষিসহ স্থানীয় বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব  ফেলে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ে। বৈশ্বিক সংস্থাটি বলছে, পরিবহন ব্যয় কমানো গেলে দেশের রফতানি ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। সুতরাং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন ব্যয়ের লাগাম টানা প্রয়োজন।

বেশ অনেক দিন ধরে নিত্যপণ্যের বাজারে দামের ঊর্ধ্বমুখিতা বিরাজমান। এতে জীবনযাত্রা ব্যয়ে এমনিতেই বিপর্যস্ত মানুষ। তার মধ্যে যেভাবে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বেড়ে চলছে, তা আরো শঙ্কার। এমনটা অব্যাহত থাকলে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন আরো ব্যয়বহুল ও দুরূহ হয়ে উঠবে। সুতরাং এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেটি করতে হলে শুধু রুটিন অভিযান নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পরিবহন খাতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সুশৃঙ্খলা। পরিবহন মালিকদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। সর্বোপরি বাড়াতে হবে রাষ্ট্রীয় নজরদারি। সরকারের বলিষ্ঠ উদ্যোগে পরিবহন ব্যয় কমে আসবে, এটিই প্রত্যাশা।