যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা পাওয়া ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। কিছু শর্ত পরিপালন হলেও শিশুশ্রম বিলোপ না হওয়ায় সহসাই জিএসপি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে শিশুশ্রম নিরসনে শ্রম ও কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে এখনো বিপজ্জনক ও নিকৃষ্টতম শিশুশ্রম বিদ্যমান। সরকারের হিসাবেই প্রায় ১৩ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়া নয়, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতেও শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।

রাষ্ট্রের হাতে শিশুশ্রম নিরসন করার তিনটি উপায় আছে। প্রথমত, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করতে হবে। প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। সঠিক কারিগরি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা দরকার। তৃতীয়ত, আইন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগ থাকতে হবে। আইন যেন শিশুর বিরুদ্ধে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে কারখানা থেকে শিশুকে সরিয়ে আনলে শিশুটি ও তার পরিবার বিপদে পড়বে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শ্রম নিয়োগ সম্পর্কে যে মান নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, সেখানে মূলত চারটি মাত্রার কথা বলে হয়েছে—সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, যৌথ দর কষাকষির অধিকার, শিশুশ্রমিকের অনস্তিত্ব ও বৈষম্যহীন নিয়োগ ব্যবস্থা। এগুলো নিশ্চয়ই সব দেশে নীতি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এর প্রয়োগ কৌশল নিয়ে। শিশুশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করতে গেলে কি তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিধিনিষেধের প্রশ্নটি জড়িয়ে দেয়া উচিত? মূল বিষয়টি হলো, এর ফলে শিশুদের ভালো যে হবেই তা বলা যাচ্ছে না। গত শতকে নব্বইয়ের দশকে মার্কিন কংগ্রেসের এক সিনেটর আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার জন্য বিল আনেন, যে বিল আইনে পরিণত হলে শিশুশ্রম ব্যবহূত হয়েছে এমন কোনো পণ্যই আমেরিকায় আমদানি হবে না। তখন দেখা গেছে বিল থেকে আইন হয়ে যাবে, এ আশঙ্কায় বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৫০ হাজার শিশুশ্রমিকের কাজ চলে যায়। বাজার হারানোর ভয়ে শিল্পের মালিকরা আর ঝুঁকি নিতে চাননি। পরবর্তীকালে গবেষণা থেকে জানা যায়, ওই ৫০ হাজার শিশুর অনেকেই পোশাক শিল্পের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত হয়েছে, যেসব ক্ষেত্র থেকে রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন হয় না। সমস্যাটি হলো, ওই শিশুরা যেসব পরিবার থেকে আসছে তাদের নিদারুণ দারিদ্র্য। অনেকে বলেন, দারিদ্র্যই মূল সমস্যা নয়, শিশুদের দিয়ে রোজগারের সুযোগ যতক্ষণ থাকবে, পরিবারগুলোও তাদের উপার্জনের দিকে ঠেলে দেবে। এ ধরনের প্রবণতা যে একেবারেই নেই তা নয়, কিন্তু দারিদ্র্য কমলে শিশুশ্রমের জোগান যে কমে, তার নিদর্শন রয়েছে। প্রশ্ন হলো, দরিদ্র পরিবারগুলোর অবস্থার উন্নতি কবে হবে, সেই অপেক্ষায় কি আমরা থেকে যাব অনন্তকাল? বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু বড় হয়ে অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়, ফলে তাদের আয়ও কম হয়। এভাবে দারিদ্র্য এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়, পরিবারগুলো দারিদ্র্য-শিশুশ্রম-দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে। শিশুশ্রমের কারণ হিসেবে দারিদ্র্যের তত্ত্ব মেনে নিলেও উন্নয়নের অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা তাই সমস্যার সমাধানকে বিলম্বিত করবে। সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শিশুকে বিপজ্জনক অবস্থা থেকে উদ্ধার করে তাদের শিক্ষার সুযোগ ও যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বাংলাদেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, মানবাধিকার কর্মীসহ নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা বিদ্যমান থাকার পরেও শিশুদের সার্বিক অধিকার নিশ্চিতকরণে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতে বিনা মূল্যে বই প্রদানসহ শিক্ষাবিষয়ক অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষার্থে জাতীয় সব উন্নয়নসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, পরিকল্পনা গ্রহণ, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় শিশু নীতিমালা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শিশুদের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন কৌশল কতটুকু স্পষ্ট? নানা আইন থাকার পরও কেন শিশুরা শারীরিক নির্যাতন, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না? শ্রম আইন, শিশু আইনের মতো বিধান করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিশু শ্রম নিরসনে কয়েক ধাপে প্রশিক্ষণ প্রদান ও পুনর্বাসনের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তাতেও শিশু শ্রম হ্রাস পায়নি। এসব বিষয় গভীরভাবে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

শিশুশ্রম বন্ধ না হলে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়েও জটিলতায় পড়তে হবে বাংলাদেশকে। আইএলও কনভেনশন ১৩৮ অনুসারে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে কোনো শিশু শ্রমে থাকতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এতে স্বাক্ষর করেনি। তবে সরকার এর শর্ত পরিপালনে চেষ্টা করছে। কারণ পরিপূর্ণভাবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী ইউরোপীয় ইউনিয়নের মার্কেটে শুল্ক সুবিধা পেতে হলে এ কনভেনশনে স্বাক্ষর করতে হবে। তার জন্য অতি দ্রুত শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। কারণ কনভেনশন স্বাক্ষর করা মানে আইনগতভাবে তা মেনে চলতে বাধ্য থাকা। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আর বাংলাদেশ এলডিসির সুবিধা পাবে না। তখন জিএসপি প্লাস সুবিধা ছাড়া অন্যতম প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপে এ দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। তাই এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আইনে পরিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধে জোরালো অবস্থান নেই। এমনকি শিশুর সংজ্ঞা বা হালকা বা ভারী কাজের সংজ্ঞায়ন করা হয়নি। এর সুযোগ নিচ্ছেন অনেকে। প্রয়োজনে আইন সংশোধনের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে।

দেশের শিশুশ্রম কমিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্টভাবে আইনের প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তির বিধান। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে (১৯৮৯) স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করা হয় বটে কিন্তু আদৌ কি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে? শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ আর সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা। পেনাল কোডে বিভিন্ন ধারায় শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা আছে। আছে শ্রম আইন, ন্যূনতম মজুরি আইন। এসব আইন কার্যকর থাকলে শিশুশ্রম প্রথা জিইয়ে থাকতে পারত না।