’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যখন ইয়াহিয়া খান ’৭০-এর নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হলেন, তখন সমগ্র জাতি ১৯৫৪ সালের পক্ষের ধারায় নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে ছয় দফা অর্জনের লক্ষ্যে এ নির্বাচনকে ম্যান্ডেট হিসেবে গ্রহণ করে যখন এগিয়ে যেতে উদগ্রীব, তখন ছাত্রলীগের বৈপ্লবিক অংশ সশস্ত্র বিপ্লবের পাঁয়তারা করছিল। তাদের মূল কথা ছিল নির্বাচনের প্রহসনের মধ্যে বাঙালির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। আমরা যারা গণতন্ত্র ও মুক্ত অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতাম, গণতান্ত্রিক চেতনাবোধে বিশ্বাস করতাম, আমরা মনে করতাম যে নির্বাচন ছাড়া, একটা গণম্যান্ডেট ছাড়া বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে একচ্ছত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। আর ছয় দফার সপক্ষে মানুষ ম্যান্ডেট না দিলে আমরা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যাব।

মিটিং-মিছিলে ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় ছাত্রলীগের একটি বিরাট অংশ তখন দাবি করত, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’; ‘বাংলার অপর নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। এ রকম একটি মুহূর্তে ছাত্রলীগ সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে একটি সমস্যাসংকুল পথে আমাদের এগোতে হয়। আমরা স্পষ্ট বিশ্বাস করতাম, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে মানুষের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট আনতে না পারলে আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত হবে। বিভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে ম্যান্ডেটবিহীন স্বাধীনতা আন্দোলন বিপথগামী হতে পারে।

এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ছাত্রলীগের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অংশ তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। তা সত্ত্বেও ’৭০-এর নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে ছাত্রলীগ যে সাহসী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তা অবিস্মরণীয়। বৈপ্লবিক চেতনার আবর্তে পড়ে ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে যদি জাতি বিরত থাকত, তাহলে ১৯৭০-এর নির্বাচনের রায় শতকরা ৯৮টি ভোটের ম্যান্ডেট বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আসার সুযোগ হতো না। একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা জাতি বিস্ময়করভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে ম্যান্ডেটবিহীন সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনকে পাঞ্জাবের খালিস্তানিদের মুক্তির আন্দোলন অথবা ছাত্রলীগের ওই বৈপ্লবিক অংশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অলীক আন্দোলনের মতো ব্যর্থতার বেলাভূমিতে গুমরে মরত।

যা-ই হোক, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ’৭০-এর নির্বাচনে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে, সেটি স্বাধীনতার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। এর আগে ঐক্যবদ্ধ ছাত্রলীগের শক্তির শিকড় বাংলার মাটির এত গভীরে প্রবেশ করে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শতকরা ৯৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনকার সময়ে বাঙালির মূল মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বিজয়কে কেন্দ্র করে তদানীন্তন বার্তা সম্পাদক মরহুম সিরাজুদ্দীন হোসেন আট কলামের হেডিংয়ে উদ্ধৃত করেন, ‘এ যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবি কী দিয়া? বালির বাঁধ?’

’৭০-এর নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসার কথা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে। আমরা সবাই অবহিত ছিলাম ঐতিহাসিক এ ম্যান্ডেট পাকিস্তানের কবর রচনা করেছে এবং বাঙালি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার বিজয়কেতন উড়িয়ে দিয়েছে। সম্ভবত এ সত্য পাকিস্তানের তদানীন্তন সামরিক শাসকগোষ্ঠীও সম্যক উপলদ্ধি করেছিল বলেই ১ মার্চের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান স্থগিত ঘোষণা করেন। আমাদের ম্যান্ডেটকে নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলল, ১ মার্চ ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন হতে দিল না। তখন এটি শুধু বাঙালির কাছে নয়, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে প্রমাণিত হলো যে ওরা গণরায় মানে না, ভোটও মানে না। ওদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে কলোনি করা। এটা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট হয়ে গেল। একই কারণে ভিয়েতনামের যুদ্ধেও বিশ্বজনমত গড়ে উঠেছিল, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্বজনমত ছিল অভাবনীয়। শুধু যুদ্ধ করে পাকিস্তানের মতো সামরিক শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব হতো না। এটি সম্ভব হয়েছে বিশ্বজনমতের কারণে। এটি অর্জিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে।

এ কথা আজ অত্যন্ত স্পষ্ট, তত্কালীন রাজনৈতিক টানাপড়েনে তারাও যেমন আমাদের রুখত, আমরাও তাদের বিরুদ্ধে কৌশল নির্ধারণে সক্ষম হতাম। বঙ্গবন্ধুর সেই দূরদর্শিতাকে আমরা হূদয় দিয়ে উপলদ্ধি করতাম, অনুধাবন করতাম এবং ক্ষেত্রবিশেষে শাসনতান্ত্রিক দায়দায়িত্বের কারণে যে কথাটা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা সম্ভব হতো না, সেটিকে বজ নির্ঘোষে আমরা আমাদের কণ্ঠে উচ্চারণ করতাম। আমরা মুখপাত্র হিসেবে মূলত তার কথাগুলোই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করেছি। জনগণ বার্তা পেয়ে যেত যে বঙ্গবন্ধু কী চাচ্ছেন। তারা বুঝত, এটা তারই হূদয়ের অনুরণন, শুধু আমাদের বীণায় সুর পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজে বললে তার কথার বিকৃত অর্থ করে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানানোর যে সুবিধাটুকু পাকিস্তানিরা পেত, এ দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার কারণে সে সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা ছিলাম তার হূদয়ের প্রতিষ্ঠান। তার অন্তরের রাজনীতির স্বরলিপির অনুরণন।

বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দেন, তখন আওয়ামী লীগ প্রথমে এটিকে গ্রহণ করেনি, বরং এড়িয়ে গেছে। এটা বাস্তব, এটা ইতিহাস। তদানীন্তন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী ও আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ছাত্রলীগই এটাকে বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ হিসেবে গ্রহণ করে। সেদিন ছাত্রলীগ এভাবে ছয় দফাকে গ্রহণ না করলে স্বাধীনতার আন্দোলন আঁতুড়ঘরেই মৃত্যুবরণ করত। ’৬৯-এর আন্দোলনেও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে ছিনিয়ে আনতে দেশব্যাপী যে বিপুল গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়, তার নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্রলীগ, তখনকার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। কিন্তু স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন যে রূপ নিল, ’৭০-এর নির্বাচনের পর তার একক নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্রলীগ। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও গঠিত হয়েছিল এককভাবে ছাত্রলীগের অধীনে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সংগঠন হলেও স্বাধীনতা রূপকার ছিল ছাত্রলীগ। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, কিন্তু তার সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে ছাত্রলীগ সেদিন এত সুদৃঢ় ভূমিকায় দাঁড়াতে না পারলে, ডাকসুসহ সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ বিজয় না হলে ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় অসম্ভব ছিল, অবাস্তব ছিল।

আমাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব ছিল ’৭০-এর নির্বাচনের ম্যান্ডেট সামনে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের। গণহত্যা, ’৭০-এর নির্বাচনের ম্যান্ডেট ও অঙ্গীকার বিশ্বজনমতকে আলোড়িত করেছে। তার আগে একতরফাভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে পাকিস্তানিরা বিশ্বজনমতকে বিভ্রান্ত করত। আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে চালিয়ে দিত।

ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতিতে বাম ও উগ্র বিপ্লবীদের প্রভাব ও প্রাদুর্ভাব এতটাই প্রচণ্ড আকারে বিস্তারলাভ করেছিল যে আজকের প্রজন্মের পক্ষে তা ভাবাও অকল্পনীয়। তারা পরিবেশ ও পরিস্থিতি যা-ই থাকুক, কোনো কিছু আমলে না এনেই একটা সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখত। এর বাইরে যারা রাজনীতি করত, তাদের তারা অচ্ছুৎ ডানপন্থী চিহ্নিত করে সিআইয়ের দালাল বলেও প্রকাশ্য জনসভায় গালিগালাজ করতে মারাত্মক উৎসাহ বোধ করত। রাজনীতিতে আমি মুক্ত অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক মননশীলতায় বিশ্বাস করতাম। সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। এটা আমার রাজনৈতিক চেতনার আঙ্গিক হলেও ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ও বাইরে উগ্র বিপ্লবীদের কাছে আমি ছিলাম প্রগতির শত্রু। ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীদের কাছে আমি অত্যন্ত প্রিয়ভাজন থাকার সুবাদে এবং বঙ্গবন্ধুর লালিত স্নেহে আমি সিক্ত ছিলাম বলেই আমাকে ওদের হীনম্মন্যতার গণ্ডিতে অবরুদ্ধ করতে পারেনি। বরং আমি আপন গৌরবে ‘উদ্যত-উদ্গত-উদ্ধত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো’ বিকশিত হয়েছি। জনসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় বারবার ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠতে পেরেছি। ‘আমি বাংলার, বাংলা আমার’; ‘এ মাটি আমার সোনা আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা’; ‘সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি, যে আছে মাটির কাছাকাছি’; ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’—এসব আবেগাপ্লুত উদাত্ত আহ্বান বাংলার মানুষের হূদয়ের কন্দরে আসন পেতে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিকতাবাদ, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র স্বকল্পকল্পিত বিপ্লবের দুরাশা থেকে আমার হূদয় বিমুক্ত ছিল বলেই আমি বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনার বিমূর্ত প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা প্রদানের পর একেকটি আন্দোলনের সোপান উত্তরণের মধ্য দিয়ে ’৭০-এর নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নির্বাচনে সর্বজনীন ও স্বতঃস্ফূর্ত রায়ে বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। আন্তর্জাতিকতাবাদ ও কূপমন্ডূকতার বক্ষ বিদীর্ণ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রদীপ্ত আলোকরশ্মিতে বাংলাদেশ উদ্ভাসিত হয়েছিল এবং তারই ফলে পাকিস্তানের ২৩ বছরের শোষণ, বঞ্চনা ও দুঃস্বপ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে একটি প্রোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল বাঙালি জাতি। এ বিজয়ের পথ বিনির্মাণে বাঙালিরা যে ভিত্তিপ্রস্তর প্রতিস্থাপন করেছিল, সেটিই গণতন্ত্রের বেদিমূল। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ওই অর্জন ও বেদিমূলকে ধ্বংস করার অনেক আঘাত এসেছে, এখনো আসছে, হয়তো ভবিষ্যতেও আসবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, এ জাতির বিজয় মিছিল থামবে না।

 

নূরে আলম সিদ্দিকী: স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা

মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি