জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় সংসার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবার সংসারে সচ্ছলতা থাকে না। অর্থ যেমন জীবনের চলার পথ সহজ করে, অর্থকষ্ট ততটাই নির্মম করে তোলে। আর যদি দ্রব্যমূল্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, জীবনাঘাত থেকে ছাড় পায় না মধ্যবিত্তের সংসারও।
সংসারে যখন দুর্গতি আসে, মানুষ দোষারোপ করে ভাগ্য, বিধাতা কিংবা সরকারকে। এখনকার বেশির ভাগ সংসারের অবস্থা এমন যে তরকারি রাঁধতে গেলে দেখা যাবে তেল নেই, গোসল করতে গেলে সাবান নেই, ভাত খেতে বসলে দেখা যাবে সন্তানের জন্য ডিম ভেজে অন্য সবার জন্য শাক-ডাল-ভর্তা কিংবা নিরামিষ। কখনো কখনো মা-বাবারা সন্তানকে ডিমও খেতে দিতে পারছেন না।
বর্তমানে মানুষের বাঁধা আয়ে সংসার চালানো কঠিন। এক দশক আগেও মানুষ ৫০০ টাকা নিয়ে ব্যাগ ভরে বাজার নিয়ে আসত। কিন্তু এখন ১ হাজার টাকার নোট নিয়ে গেলেও খুচরা টাকা ফেরত আসে না। দুই কেজি চাল, এক কেজি তেল, আধা কেজি পেঁয়াজ, এক কেজি চিনি, আর একটু আলু, মরিচ, মসলা নিতেই শেষ। অথচ এর বাইরেও প্রয়োজনীয় সাবান, ডিটারজেন্ট, নারকেল তেল, মুড়ি, বিস্কুট, কলা কেনার পয়সা হয় না।
করোনার সময় চাকরি খোয়ানোর পর ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছেন আসলাম খান। রাজধানীর রূপনগরে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে টিকে আছেন। মাসে তিনি এখন ৫০ হাজার টাকার মতো আয় করছেন। তার হিসাবে প্রতি মাসে বাসা ভাড়া ২০ হাজার, গ্যাস প্রিপেইড ৮০০, ইন্টারনেট ৫০০, বিদ্যুৎ বিল গড়ে ১ হাজার, ওষুধ ১০০, সন্তানের লেখাপড়া বাবদ খরচ ৫ হাজার, কর্মস্থলে যাতায়াত ২ হাজার টাকা। এছাড়া গ্রামে টাকা পাঠানোরও ব্যাপার থাকে। সব মিলিয়ে তার ৩২ হাজার টাকা খরচ। বাকি টাকা দিয়ে সংসারের বাজার কাটছাঁট করে চলতে হয়।
তিনি সংকোচ করে বলেন, ‘সমস্যা হলো ফল কেনা কমাইছি, রিকশার বদলে পদব্রজ বাড়াইছি, কম দামের আশায় রাতে সবজি কিনি। যেকোনো কিছু কিনতে অনেক দোকান দেখি। প্রথমবারের মতো পুলিশের রেশনের চাল কিনছি, কেজিতে ৮/১০ টাকা কমে। টিসিবির চাল না কিন্তু। আর কমু...?’ বললাম, হ্যাঁ। এরপর তিনি বললেন, ‘প্রাইভেসি আছে না?’ পাঠক, উত্তরদাতার প্রাইভেসির কথা বিবেচনায় এখানে তার ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
মানুষের সংসারে অভাবের দিন আগেও ছিল। এখন মানুষের আয় বাড়লেও যেভাবে বাসাভাড়াসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তাতে সংসারে টানাটানি দেখা দিচ্ছে। মানুষ এখন কম খাচ্ছে। পণ্যের ব্যবহার কমাচ্ছে। সঞ্চয় করতে পারছে না। বরং আগের সঞ্চয় ভাঙছে। অনেকে ধার-দেনার আশ্রয় নিচ্ছে। বিকল্প আয়ের চিন্তা করতে হচ্ছে।
আনিসুর রহমান। রাজধানীর বাংলামোটরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘জুনিয়র’ পদে কর্মরত। অথচ তিনি ১৩ বছর ধরে চাকরি করছেন। এর আগেও তিনি দুটি বড় কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এর পরও তার পদ থেকে জুনিয়র শব্দটি ঘুচেনি। অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ লোকদের জুনিয়র পদে নিয়োগ দেয়া এখন কোম্পানিগুলোর কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে মাইনে কম দেয়া যায়। যাহোক, তিনি এখন এ শহরে আয় করছেন ২০ হাজার টাকা। চাকরির শুরুতে ২০১০ সালে তার বেতন ছিল ৭ হাজার টাকা। ১৩ বছরের কর্মজীবনে প্রতি বছর গড়ে তার বেতন বেড়েছে ১ হাজার টাকা। খিলক্ষেতে একটি সাবলেট বাসায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় খরচ বাসা ভাড়া। বেতন পেয়ে ৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেই। বাকি ১৪ হাজার টাকা দিয়ে কোনোরকম সবকিছু চালিয়ে নিতে হয়। মা-বাবাকে টাকা পাঠাতে পারি না। এত বছর কাজ করেও কোনো সঞ্চয় নেই। মাছ-মাংস খাওয়া কমেছে। এ আয়ে কোথাও বেড়ানোর বা কেনাকাটা করার সুযোগ নেই। গ্রাম থেকে চাল-তেল এনে খেতে হয়। ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়ারও উপায় নেই। কারণ এখানে যতটুকু আয় করতে পারছি, গ্রামে সেটাও সম্ভব নয়।’
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষকরা বলেছেন, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, ঢাকায় চার সদস্যের একটি পরিবারের খাবার খরচের জন্য মাসিক ২২ হাজার ৪২১ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। আর তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিলে প্রয়োজন পড়ে ৯ হাজার ৫৫৭ টাকার। এখানে উল্লেখ্য, গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক এন্ট্রি লেভেল কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন ২৮ হাজার টাকা এবং কর্মচারীদের প্রারম্ভিক বেতন-ভাতা সর্বনিম্ন ২৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ নির্দেশনা প্রমাণ করে যে ২৪ হাজার টাকার কম মজুরিতে ন্যূনতম মানসম্পন্ন জীবনযাপনের সুযোগ নেই। সে হিসেবে, আমাদের গার্মেন্টস ও কারখানা শ্রমিকরা কত টাকা মজুরি পায়? মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা দিয়ে তারা রাজধানী কিংবা আশপাশে কীভাবে চলে? অনেকে বাড়তি আয়ের আশায় ওভারটাইম করে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলেন।
সাধারণ মানুষ আন্তর্জাতিক বাজার বোঝে না, মূল্যস্ফীতি কিংবা ব্যবসায়িক কারসাজি বোঝে না। তাদের ক্ষোভ, সরকার যৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের আয় বাড়ছে না, অথচ হুট করে একেকটি পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষকে মূল্য দিতে হচ্ছে। কারণ তাদের আয় সীমিত। সরকারকে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রে ভর্তুকি দিলে সাধারণদের কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে।
জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) মতে, কভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে সারা বিশ্বে খাদ্যের দাম বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। এরমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শুধু এক বছরেই ১২ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো এ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত যুদ্ধের প্রভাবে সার, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যমূল্যে প্রভাব পড়ছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর বিশ্ববাসীকে আরো খেসারত দিতে হবে।
সরকার ডিজিটাল থেকে বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশের মহাসড়কে নিয়ে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে দেশ আগের তুলনায় এগিয়েছে। ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। অনেক প্রকল্পের কাজ চলমান। আরো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে কি জনগণের পেট ভরে? আগামী দিনে সরকারকে বিশ্ব পরিস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করে অবকাঠামো ব্যয়ে সাশ্রয়ী হতে হবে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিতে জোর দৃষ্টি দিতে হবে।
পাপলু রহমান: সাংবাদিক










