সড়ক-মহাসড়ক এবং
সেতু নির্মাণ
ও উন্নয়নে
গত ১০ বছরে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি
টাকা ব্যয়
করেছে সরকার।
বিপুল বিনিয়োগে
অবকাঠামো উন্নয়ন
হলেও সড়ক-মহাসড়কে স্বস্তি
আসেনি। দুর্ঘটনায় মৃত্যু আগের চেয়ে
বেড়েছে। গতকাল
বণিক বার্তায়
প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
চার-ছয় লেনের সড়ক,
এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগুলোও যাতায়াতে মানুষের ভোগান্তি
কমাতে পারেনি,
বিলম্বিত হচ্ছে
পণ্য পরিবহন।
বিপুল বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করতে
না পারা
খুবই দুঃখজনক।
উদ্বেগজনক বিষয়
হলো, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা
যায়নি। স্বভাবতই
বিপুল বিনিয়োগ
নিয়ে প্রশ্ন
উঠছে। সড়কে
নিরাপত্তা বা স্বস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পিত বিনিয়োগে জোর দিতে
হবে। ভুললে
চলবে না, নিরাপদ ও ভোগান্তিমুক্ত সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের
বড় মাপকাঠি।
এটি ছাড়া
টেকসই অগ্রগতি
সম্ভব নয়।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা সক্ষমতাবিষয়ক সমীক্ষায় সড়কের মান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় কোন দেশের সক্ষমতা কেমন, তা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর গুণগত মানের ওপরও নির্ভরশীল। সেই ডব্লিউইএফের প্রতিবেদন বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মান খারাপ। বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক ও সেতু নির্মাণ ব্যয় সবচেয়ে বেশি। অথচ অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা সঙ্গিন। একটি সড়ক নির্মাণ করার পর কোনো রকম মেরামত ছাড়াই তা টানা ১৫ বছর ভালো থাকবে, এটা ধরে নিয়েই সড়কের নকশা ও নির্মাণকাজ করার রীতি। অথচ নির্মাণের পর এক বছর না পেরোতেই সড়ক-মহাসড়কের স্থানে স্থানে ভেঙে যায়, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। ফলে বছর না ঘুরতেই সেগুলো মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। মেরামতের কাজও ভালোভাবে করা হয় না। তাই সেগুলো টেকসই হয় না। মেরামতের কাজ লেগেই থাকে আর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামত নিয়ে বিপুল অংকের অর্থের অপচয় একটা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। মানসম্পন্ন সড়কের অভাবে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে উঠছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সড়ক নিরাপত্তা একটা বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশের মধ্যে রয়েছে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জাপান। দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুহার লক্ষণীয়ভাবে কম। প্রতি লাখে গড়ে ৩-৫ শতাংশ মাত্র। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ানের কিছু দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক নিরাপত্তায় উন্নতি ঘটেছে। এটা সম্ভব হয়েছে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালক-যাত্রী নির্বিশেষে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে। তারা সঠিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগে পিছপা হয়নি।
দেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে স্বস্তি নিশ্চিতে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। দেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এসব সুপারিশ ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নয়, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেবে দেখা উচিত। নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য সুপরিকল্পিত নকশা এবং এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে কাজ করা জরুরি। মহাসড়কগুলোয় ফিডার রোড দিয়ে কম গতির গাড়ি, মোটরবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা দরকার, যাতে দুর্ঘটনা হ্রাস পায়। আর মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার, মানুষজন রাস্তা পারাপার হয়, এমন স্থানগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
প্রকৌশলগত দুর্বলতার কারণে সড়কগুলোয় গর্ত ও ফাটলের পাশাপাশি গঠনবিন্যাসেও (অ্যালাইনমেন্ট) ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। সড়ক নির্মাণের আগে মাটিও পরীক্ষা করা হয় না। ফলে সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবগ্রেড নির্মাণে দুর্বলতা থাকলে আন্ডুলেশনের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এটি অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা নাকি কাজে ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সড়ক টেকসই না হওয়ার আরো দুটি কারণের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলো অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যান চলাচল এবং সড়কগুলোয় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কমছে সড়কের স্থায়িত্ব। মহাসড়কগুলো জোড়াতালি দিয়ে কার্যকর রাখার চেষ্টা চলে এবং সেটিই এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণের ফলে বৃষ্টিপাত ও বন্যায় সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে স্তরভিত্তিক কাজ তদারকি জোরদার করতে হবে। নির্মাণকাজে গাফিলতি ও ঠিকাদার নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানবিক
ও অর্থনৈতিক
দৃষ্টিকোণ থেকে
সড়ক দুর্ঘটনার
ক্ষতি বিবেচনায়
দেশে নিরাপদ
করিডোর গড়ে তোলার বিষয়টি
অনেক দিন ধরে আলোচনা
হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেটি এখন দুটি মহাসড়কে
পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন
হতে যাচ্ছে।
বলা হচ্ছে,
প্রস্তাবিত নিরাপদ
সড়কে থাকবে
সিসিটিভি ক্যামেরা।
কোনো যানবাহন
ট্রাফিক আইন ভাঙলেই ধরে ফেলবে নিয়ন্ত্রণ
কক্ষ। সেখান
থেকে বার্তা
পেয়ে সঙ্গে
সঙ্গে ব্যবস্থা
নেবে টহল কিংবা ট্রাফিক
পুলিশ। দুর্ঘটনা
ঘটলে দ্রুত
পৌঁছে যাবে
অ্যাম্বুলেন্স। বিনামূল্যে পৌঁছে দেবে নিকটবর্তী
হাসপাতালে। প্রাথমিক
চিকিৎসার জন্য
থাকবে দক্ষ
স্বাস্থ্যকর্মী ও ট্রমা সেন্টার।
সড়ক দুটি
নিরাপদ রাখতে
সার্বক্ষণিক কাজ করবে একাধিক
সরকারি-বেসরকারি
সংস্থা। নিঃসন্দেহে এতে সড়কে শৃঙ্খলা
আসার পাশাপাশি
দুর্ঘটনা যেমন
কমে আসবে,
তেমনি সার্বিকভাবে বাড়বে যাত্রীদের নিরাপত্তাও। এটি সফল হলে দেশের সব মহাসড়কে এ প্রক্রিয়া দ্রুত
বাস্তবায়ন করতে
হবে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে মনে হয় এখনও সেই আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে দেশ। সুতরাং নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কষ্টসাধ্য বলেই মনে হয়। এই বিশ বছরে সবার জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে সব উন্নয়নই ম্লান হয়ে যাবে। বলা হয়ে থাকে কোন দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এছাড়াও, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখনই শুরু করতে হবে।
দেশে মেগা প্রজেক্ট হোক, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত হোক, তা সবারই প্রত্যাশা। তবে এসব প্রকল্প যথাযথভাবে নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই করার বিষয়টি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ও নির্মাণাধীন সড়ক-মহাসড়ক কতটা স্বস্তি দিচ্ছে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনপূর্বক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ গত দশককে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছিল। কিছু দেশ উন্নতি ঘটলেও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এক্ষেত্রে যেসব অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে, সেগুলো যথাযথ ও মানসম্পন্নভাবে হচ্ছে কিনা, তা গুরুত্বসহকারে নিয়মিত তদারক করা দরকার। প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবনী উপায়ের সন্নিবেশ ঘটিয়ে সড়ক নিরাপত্তা ও স্বস্তি বাড়াতে হবে।










