কভিড-১৯ মহামারীর বিস্তার শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিকাশ অর্থনীতির সরকারগুলো পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সহায়তা করার লক্ষ্যে তাদের রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। উন্নত বহু দেশেই ক্রমবর্ধিষ্ণু ঋণের পরিমাণ জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে এবং গড়ে জিডিপির অংশ হিসাবে ঋণের পরিমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উচ্চতায় পৌঁছেছে।
তবে অলিভিয়ার ব্ল্যানচার্ড ও অন্য অর্থনীতিবিদদের মতে, নিম্ন সুদহারের কারণে উন্নত অর্থনীতিগুলো আরো বেশি ঋণ গ্রহণ করতে সমর্থ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গণনাকৃত তথ্যগুলো তুলে ধরে যে মহমারী শুরুর দুই দশক আগে ওই দেশগুলোর সার্বভৌম সুদ প্রদানের পরিমাণ জিডিপির ৩ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশ হয়েছে, যদিও ঋণ জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধি পেয়েছে ২০ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি। তবে সদ্য ইস্যু করা সার্বভৌম ঋণ এ পর্যায়ে ঋণাত্মক সুদহারের সঙ্গে বাড়তি ঋণ সুদের ব্যয়কে আরো কমাতে পারে।
তাহলে অতি স্বল্প সুদের এই অদ্ভুত বিশ্বে সরকারের ঋণসীমা কী? মডার্ন মনিটারি থিওরির (এমএমটি) সমর্থকদের মতে, কোনো সীমা নেই, বিশেষ করে ওইসব দেশের ক্ষেত্রে, যারা নিজস্ব মুদ্রায় ঋণ ইস্যু করে এবং যাদের উৎপাদনশীলতার ক্ষমতা অতিরিক্ত। সর্বোপরি, পরিণত ঋণ পরিশোধের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই অর্থ মুদ্রণ করতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব না হওয়া পর্যন্ত এটিকে মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এমএমটি রাজনীতিবিদদের কাছে এমন একটি গ্রহণযোগ্য ধারণা হয়ে উঠেছে, যা প্রতিটি সমস্যা সমধানে সরকারি ব্যয়কে সমর্থন করে।
অবশ্য যেকোনো ‘তত্ত্ব’, যা নিখরচায় মধাহ্নভোজের প্রতিশ্রুতি দেয়, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করাই উচিত। এবার আসা যাক সংশয়ের কারণ প্রসঙ্গে। ধরা যাক, ইতিবাচক সুদহারসহ আমরা একটি দারুণ পরিবেশের মধ্যে ছিলাম। সরকারি বন্ড ক্রয়ের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এরপর সরকার সে অর্থ নাগরিকদের কাছে হন্তান্তর বাবদ ব্যয় করতে পারে। সেক্ষেত্রে যা-ই ঘটুক না কেন, বাস্তবে এখানে এত বেশি নগদ অর্থ রয়েছে, যা যেকোনো ব্যক্তিই তার পকেটে পুরবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ মুদ্রণের আগে তার হাতে যদি প্রচুর পরিমাণ অর্থ থাকে, তাহলে সরকার কর্তৃক হস্তান্তরকৃত ওই অর্থ সে তার ব্যাংক হিসাবে রাখবে এবং ব্যাংক তার রিজার্ভ অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সব নগদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেবে।
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় রিজার্ভ ইস্যু করে সরকারি বন্ড কিনে ফেলবে, এরপর সেই অতিরিক্ত রিজার্ভগুলোর ওপর সুদ দিতে হবে। তবে সরকার কিন্তু দ্রুততার ভিত্তিতে সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ট্রেজারি বিল ইস্যু করতে পারত, যে সুদের ব্যয় কম-বেশি একই হবে। একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে, এখানে নিখরচায় মধ্যাহ্নভোজের কোনো সুযোগ নেই।
বর্তমানের অস্বাভাবিক পরিবেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় শূন্য সুদে রিজার্ভ ইস্যু করে সরকারি বন্ড ক্রয়ের জন্য অর্থায়ন করতে পারে, ফলে তারা প্রচুর পরিমাণে এ-জাতীয় উচ্চ তরল মজুদ ধরে রাখতে প্রস্তুত থাকে; যা কিনা এমএমটির বিজয়েরই নামান্তর। তবে সরকার কিন্তু আবারো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় শূন্য সুদে ট্রেজারি বিল ইস্যু করতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ দাবিকে (রিজার্ভ) প্রত্যাখ্যান না করে তাহলে সরাসরি সরকারের দাবিগুলোকেও প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের একটি সহায়ক সংস্থা।
অন্য কথায়, এমএমটির পরামর্শকৃত অর্থায়নের বিষয়টি হচ্ছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে সত্যকে শ্রেফ অস্পষ্ট করা। তবে হ্যাঁ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন করে সরকার মুদ্রাবাজারের স্বল্পমেয়াদি বাধাগুলো এড়াতে পারে। মাঝারি মেয়াদে যাই হোক না কেন, এ পদ্ধতি অনেক বেশি পরিমাণ ঋণ গ্রহণের অনুমতি দেয় না। সেক্ষেত্রে এটি সরাসরি অর্থায়ন করতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি সুদহারও যদি স্বল্প কিংবা ঋণাত্মক হয়, সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরোপুরি বাইপাস করে বাজারগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ইস্যু করে সরকারের পক্ষে ওই হারগুলো লক করা অনেক বেশি ভালো হবে।
আর এ বিষয়টিই আমাদের প্রাথমিক প্রশ্নের কাছে নিয়ে যায় যে সরকার আসলে ঠিক কী পরিমাণ ঋণ ইস্যু করতে পারে? সরকারের পক্ষ থেকে শুধু সুদের অর্থ প্রদানের সামর্থ্য কত, তা নিশ্চিত করা কিন্তু যথেষ্ট নয়; তাকে অবশ্যই এটাও নিশ্চিত করতে হবে সে এবং তার উত্তরসূরিরা সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে সক্ষম। কিছু পাঠক অবশ্য দ্বিমত প্রকাশ করতে পারেন যে সরকারের ঋণ পরিশোধের প্রয়োজন নেই, কারণ পরিণত ঋণ পরিশোধের জন্য সে নতুন ঋণ ইস্যু করতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীরা কিন্তু শুধু তখনই নতুন ইস্যুকৃত ঋণ ক্রয় করবেন, যখন তারা নিশ্চিত হবেন যে সরকার সম্ভাব্য আয় থেকে সব ঋণ পরিশোধ করতে পারে। পূর্ণ কর্মসংস্থানের পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই উদীয়মান অনেক বাজার ঋণের ‘সাডেন স্টপ’ (আকস্মিক হ্রাস) পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। আর এটি ঘটেছে বাজারের বায়বীয় আস্থা দ্বারা চালিত হয়ে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে।
অন্যভাবে বললে, নতুন ঋণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রয়োজন হয় যে সরকারের বতর্মান ও ভবিষ্যতের কর রাজস্ব পুঞ্জীভূত ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হবে। এখানেও কিন্তু একটি সীমা রয়েছে, তবে নতুন ঋণের মাধ্যমে গঠিত তহবিলগুলো যদি উচ্চ আয়ের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগ করা হয়, এটি সম্ভবত কখনো যাচাই করা হবে না, তাহলে ভবিষ্যতের বাড়তি আয় দিয়ে অতিরিক্ত ঋণ পরিশোধিত হবে। তাছাড়া দরিদ্র ও দুর্বল পরিবারগুলোর সহায়তার জন্য যদি অর্থ ব্যয় করা হয়, তাহলে ঋণের সীমারেখাটিও নজরে আসে।
এক্ষেত্রে সরকার যদি এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে কর রাজস্ব থেকে যতটা সম্ভব রাজস্ব আদায় করে, তাহলে নতুন ইস্যুকৃত ঋণের জন্য জায়গা তৈরি করতে এটি বিদ্যমান ঋণের পরিমাণকে হ্রাস করবে। যেটি করার সহজ উপায় হলো, পুরনো দায়বদ্ধতাগুলো থেকে বিচ্যুত হওয়া—উন্নত অর্থনীতির সরকারগুলো অবশ্য বিষয়টিকে অকল্পনীয় হিসেবে বিবেচনা করবে।
অন্য বিকল্পটি হচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির অনুমতি প্রদান; যা ভবিষ্যতে কর আয়ের বিপরীতে বর্তমান ডলারের মধ্যে নির্ধারিত ঋণের পরিমাণকে কমিয়ে দেবে। আর এ অবস্থায় অর্থনীতিতে পূর্ণ কর্মসংস্থানের কারণে মূল্যস্ফীতির ঘটনা ঘটবে না; বরং তা ঘটবে সরকার যে পরিমাণ ঋণ পরিশোধে সক্ষম, ঋণ গ্রহণের পরিমাণ তার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে বলে। নতুন ঋণদাতারা উচ্চতর সুদহারের দাবি করবে—সম্ভবত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির জন্য একটি প্রিমিয়ামসহ—এভাবে স্বল্প সুদহার ও অবাধ ঋণ গ্রহণ যুগের পর্দা নামবে।
যদি এটা হয়, তবে উন্নত অর্থনীতিগুলো রাতারাতি জিম্বাবুয়েতে পরিণত হবে না, তা নিশ্চিত। তবে তাদের মধ্যে কয়েকটি, যেগুলো বিভাজনমূলক রাজনীতিতে জড়িত, তারা উচ্চতর আয় নয়, বরং অধিকতর ব্যয়ে উৎসাহী হবে—উদীয়মান বাজারগুলো যতটা সরবরাহ করতে পারে। আর তাই যদি হয়, তবে কয়েক বছরের মধ্যে কিছুটা বেশি মূল্যস্ফীতি দেখে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আমি কিন্তু এখানে তাত্ক্ষণিক কঠোরতার পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছি না। খোলসা করে বললে, মহামারীকালীন সরকারগুলো পরিবার ও সংস্থার অর্থনৈতিক সক্ষমতা রক্ষার লক্ষ্যে ব্যয় করতে পারে, ভবিষ্যতের রাজস্বের মাধ্যমে তারা এ বিনিয়োগগুলো পুনরুদ্ধার করবে। তবে যেটাই হোক না কেন, জনকল্যাণের জন্য ব্যয়ের বিষয়গুলো অবশ্যই বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে, মোটেও জাদুকরী আর্থিক চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে নয়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
রঘুরাম রাজন: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) সাবেক গভর্নর ও শিকাগোর বুথ স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক
ভাষান্তর রুহিনা ফেরদৌস










