নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি দেশের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা। দিন দিন এর মাত্রা বাড়ছে। এমনকি করোনা দুর্যোগেও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির খবর মিলছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় করোনার প্রথম বছর দেশে ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের ঘটনা, গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে। ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ১ হাজার ৪১৩টি, ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২৭টিতে। ব্র্যাক আয়োজিত সাম্প্রতিক এক সংলাপেও নারীর প্রতি সহিংসতার আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। সহিংসতায় শারীরিক-মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন নারী, উৎপাদনশীলতায় পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব, বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। এ অবস্থায় নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রিপোর্টিং এবং শক্তিশালী সাপোর্ট সিস্টেম বাড়ানোর কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এটা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সময়ের পরিক্রমায় দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। শিক্ষায় আগের চেয়ে এগিয়েছে। ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে অধিক মাত্রায় শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন নারী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের প্রতি কমছে না সহিংসতা। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে তারা শিকার হচ্ছেন সহিংসতার। এর পেছনে বেশকিছু কারণ দায়ী। জনসংখ্যার অর্ধেক হলেও সমাজে নারীর প্রতি এখনো সমতামূলক ও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠেনি। সহিংসতা বাড়ার ক্ষেত্রে এটা প্রভাবক ভূমিকা রাখছে। রয়েছে অপরাধ অস্বীকৃতির সংস্কৃতিও। প্রতিটি ক্ষেত্রে সহিংসতার মূলে কাজ করছে অপরাধকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়ার প্রবণতা, অপরাধী হিসেবে নিজেকে মেনে না নেয়া এবং ভিকটিম ব্লেমিং কালচার। এছাড়া রয়েছে অপরাধীদের যথাযথ সাজা না হওয়ার বিষয়ও। অনেক সময় মামলা হওয়া কিংবা মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় ভিকটিমের বিচার মেলে না। এক হিসাবে মিলছে দেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটিই আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর সময় লেগে যায়। তারপর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা পায় না দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। আবার রিপোর্টিং প্রক্রিয়ায়ও আছে দুর্বলতা। তথ্য প্রদানে সুব্যবস্থা না থাকা কিংবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেক ঘটনাই অগোচরে থেকে যায়। ফলে সেগুলো দায়িত্বশীলরা জানেনও না এবং প্রতিকারও হয় না। সব মিলিয়ে রোধ হচ্ছে না নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের নয়, একটি বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। বিভিন্ন গবেষণা জরিপের তথ্য বলছে, করোনায় বিশ্বব্যাপীই সহিংসতা বেড়েছে। কিন্তু অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মাত্রাগত তারতম্য বিপুল। এছাড়া সামাজিক-রাষ্ট্রীয়ভাবে ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রেও অন্য দেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো অনেক বেশি তত্পর। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সিঙ্গাপুর, জাপান প্রভৃতি দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি খুব সংবেদনশীলতার সঙ্গে নেয়া হয়। সেসব দেশে সহিংসতার কোনো ঘটনাই যাতে রিপোর্টিংয়ের বাইরে না থাকে, সেজন্য গড়ে তোলা হয়েছে ডিজিটাল তথ্যভিত্তি। সুনির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই সহিংসতা-বিষয়ক তথ্য সেখানে দেয়া এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই অপরাধীকে চিহ্নিত করা যায়। তাছাড়া কিছু নিবেদিত হেল্প লাইন থাকে, যেখানে অভিযোগ জানালে পুলিশ তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধীকে জব্দ করে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় আনা হয়। দেয়া হয় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। সর্বোপরি, শারীরিক-মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে ভিকটিমকে সব ধরনের জরুরি সাপোর্ট দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীর প্রতি
সহিংসতা রোধে
সরকার আন্তরিক
ও সচেষ্ট।
নারী নির্যাতন
প্রতিরোধে প্রণয়ন
করেছে নানা
আইন ও নীতিমালা। এমনকি
২০১০ সালে
প্রণীত পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন
অনুযায়ী এখন
মানসিক নির্যাতনকেও নারীর প্রতি সহিংসতা
বলে বিবেচনা
করা হচ্ছে।
তার মানে
আগের চেয়ে
এ ব্যাপারে
রাষ্ট্র অনেক
বেশি সংবেদনশীল। পাশাপাশি সহিংসতার শিকার
নারীদের মনোসামাজিক পরামর্শ দেয়ার পর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
করা হচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থাও করা
হচ্ছে। জাতীয়
পর্যায়ে ১০৯
ও ৯৯৯
নামে দুটি
নিবেদিত হেল্প
লাইন আছে,
যেখানে তাত্ক্ষণিকভাবে সহিংসতার অভিযোগ জানানো
যায়। এসব
নিঃসন্দেহে ইতিবাচক
অগ্রগতি। তবে
সহিংসতা রোধ
করতে হলে
কঠোরভাবে আইন
প্রয়োগ নিশ্চিতের বিকল্প নেই।
এককভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। ব্যক্তি থেকে সমাজ, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারী সম্পর্কে চিরাচরিত ভাবনায় আনতে হবে পরিবর্তন। নারী নেতৃত্বের উদাহরণ আরো বেশি তৈরি করতে হবে, যা নারীর প্রতি সমাজের তথাকথিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনবে। লিঙ্গবৈষম্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হলে অল্প বয়স থেকেই ছেলেমেয়েদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরির জন্য শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা উপকরণসহ বইগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যা থেকে ছেলে বা মেয়ে কেউই কোনো একক লিঙ্গের প্রতি পক্ষপাত নিয়ে বড় হতে না পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মা-বাবাকে পরিবারের মধ্যে এমন সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যা দেখে মা-বাবার সমঅধিকার, সমান দায়িত্ব, বিষয়গুলো শিখবে। জোরদার করতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
সহিংসতা সমস্যা প্রতিকারের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য-উপাত্ত থাকাটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা সহিংসতার ঘটনার চেয়ে প্রকৃত ঘটনা অনেক বেশি। একটি সহজ রিপোর্টিং ও রেফারেল পদ্ধতি না থাকায় ভুক্তভোগী অনেকেই তাদের প্রতি হওয়া সহিংসতার তথ্য জানায় না। এ প্রেক্ষাপটে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ব্র্যাক ‘আর না’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করেছে। ওই প্রকল্পের আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাপ মোবাইলে ইনস্টল করে সহজেই সহিংসতার তথ্য জানানো যায়। এটা রিপোর্টিং প্রক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মনোসামাজিক সেবা প্রদান অনেক আয়াসসাধ্য করছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরো ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রয়াসে নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার অবসান হবে, এটিই প্রত্যাশিত।










