অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বিদ্বৎসমাজে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল সমর্থক হয়ে ওঠেন এবং একজন সংগঠকের ভূমিকা রাখেন। এ সময় তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে বিপুলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এর প্রধানতম কারণ প্রচলিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে এ অঞ্চলের ইতিহাস পর্যালোচনা করার এক দারুণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ ক্ষমতা। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে ভারতবর্ষের ইতিহাস তার মুখে নিজস্ব ঢঙে দারুণভাবে ব্যক্ত হয়েছে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর প্রচলিত ব্যাখ্যা সেখানে তিনি তুমুলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এসব মন্তব্য এরই মধ্যে গল্পাকারে পাঠকসমাজে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সদ্য তার ‘ভারতের রাজনৈতিক দল’ শীর্ষক বইটি প্রকাশ পাওয়ায় অধ্যাপক রাজ্জাকের নিজস্ব বিশ্লেষণ পাঠের সুযোগ করে দিয়েছে।

১৯৪৫ সালে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক বিলেতে পিএইচডি করতে যান। ডিগ্রি লাভের আনুষ্ঠানিক কাজ সম্পন্ন না করে ১৯৫০ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। সম্প্রতি তার এ বই প্রকাশ পেয়েছে। এটি সম্পাদনা করেছেন জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আহরার আহমদ। মুখবন্ধ লিখেছেন ড. রওনক জাহান। এছাড়া রয়েছে সম্পাদকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিফেইচ। বইটির আটটি অধ্যায়। আর লেখকের ৬ পৃষ্ঠার একটি চমত্কার ভূমিকা। শেষে একটি ইনডেক্স। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তার গবেষণাটিতে ইতিহাসের অন্তত পাঁচটি যুগান্তকারী ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি ভিন্ন মত হাজির করেছেন। এক. দেশ দুই টুকরো বা দেশভাগের জন্য দায়ী কে? দুই. ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসকের দেশীয় সহযোগী ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারা কি ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত? তিন. ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পাটাতন তৈরিতে আদতে কারা দায়ী? চার. আদৌ কি ভারতে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল? পাঁচ. সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা লড়ে গেছেন—এ প্রচলিত মত কি সঠিক?

আব্দুর রাজ্জাক ওপরের সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার পেছনে ঔপনিবেশিক যুগের সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তিনি পুরো গবেষণায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কুফল ইতিহাসের নিরিখে বিচার করে দেখেছেন। যার নির্মম পরিণতি হিসেবে দেশ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনাকে চিহ্নিত করেন। এই দুরূহ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বুঝতে গিয়ে তিনি হিন্দু বা মুসলমান সম্প্রদায় এবং কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ প্রসঙ্গ প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে হাজির করেছেন।

আব্দুর রাজ্জাক তার গবেষণার ধরন নিয়ে নিজেই স্পষ্ট মন্তব্য হাজির করেছেন। ‘ভারতে রাজনৈতিক দল নিয়ে অধ্যয়ন করার মানে এর কোন কোন সম্ভাবনা ছিল, কী কী ঘটতে পারত তার বিচার করে দেখা। এজন্য তিনি ঔপনিবেশিক প্রভু থেকে ভারতীয়দের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রধান প্রক্রিয়াগুলো বৃহৎ পরিসরে পর্যালোচনা করতে চান।’ প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য প্রধানত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পটভূমি, রাজনৈতিক তত্পরতার ধরন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও চিন্তাচর্চার পরিবর্তন, আমলাতন্ত্রের ভারতীয়করণ ও রকমারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্ভব, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বভাব ইত্যাকার বিষয় বিশ্লেষণ করেন। এতে প্রত্যক্ষভাবে মার্ক্স উল্লিখিত না হলেও এর পরতে পরতে মার্ক্সবাদী দৃষ্টি হাজির আছে।

অধ্যাপক রাজ্জাকের গবেষণার মূল পাটাতন গড়ে উঠেছে উনিশ শতককে কেন্দ্র করে। শুরুর দিকে ধর্মভিত্তিক চিন্তাচর্চার উন্মেষকাল ও পরবর্তীকালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক রূপ নেয়ার পরিণতি তিনি এখানে তুলে ধরেন। এ সময়ের প্রধান আকর্ষণ ও চিন্তার সারবস্তু ধর্মীয়। হিন্দু সংস্কার বা পুনর্জাগরণ বা মুসলিম সংস্কার বা পুনর্জাগরণে পারস্পরিক কোনো আদান-প্রদান ঘটেনি। বরং তাদের মধ্যে পৃথক বিভক্ত দুটি চিন্তাধারা (compartmentalized thinking) এগিয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তত্পরতার কারণে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চাগিয়ে ওঠে।

মুসলমানদের কেন্দ্র দিল্লি। আর চিন্তার বাহন উর্দু। অন্যদিকে বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে বাংলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের চিন্তা বিকশিত হয়। তাদের একপার্শ্বিক বা একরৈখিক চিন্তা পদ্ধতির কারণে সৃজনশীল সাহিত্যেও নিজেদের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাইরে অন্য কোনো উপাদান স্থান পায়নি। তার মতে, এ কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো রচনা, যেমন আনন্দমঠ মুসলমানদের কাছে আগ্রহ সৃষ্টি করেনি। তেমনি উর্দু কবি আলতাফ হোসেন হালীর মোসাদ্দাস হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে প্রণোদনা জাগাতে পারেনি। ধর্মকে কেন্দ্র করে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক চর্চার কারণে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে দুটি বিচ্ছিন্ন সমান্তরাল গোষ্ঠী এগিয়ে গেছে। দুটি সম্প্রদায় পরস্পরকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। একই মাটির জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো ধরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটেনি। এটাই শিক্ষিত হিন্দু ও মুসলমান শ্রেণীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চরিত্র (অধ্যায়: ৫)। দেশ দুই টুকরো হওয়ার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটল? তার মতে, ১৮৭০-এর দশকে শুরু হওয়া ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৪৭ সালের ভারতের স্বাধীনতা আইন।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চাগিয়ে উঠলে কর্মী ও নেতাদের ধর্মভিত্তিক বিভাজিত দুই পাটাতনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করে। তাছাড়া ১৮৭০-এর দশকের রাজনীতি ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার উন্মেষ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতবর্ষের সব স্তরের জনসাধারণকে একই কাতারে নিয়ে আসার সামাজিক ভিতও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। গান্ধী ‘রাম রাজ্য’-কে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে ইসলামের প্রথম চার খলিফা ছিলেন মুসলিম নেতাদের কেন্দ্র।


অধ্যাপক রাজ্জাকের মতে, আমলাতন্ত্রের অংশীদার হওয়ার মুখ্যম অস্ত্র ইংরেজি শিক্ষা। ভারতবাসীরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আমলাতন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। এরাই ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিচার করতে গিয়ে তিনি দুটো বর্গ ব্যবচ্ছেদ করেন। এক. বুর্জোয়া, দুই. বিদ্বৎসমাজ। তার মতে, ভারতবর্ষের বুর্জোয়া গোষ্ঠী ইউরোপীয় পুঁজিবাদী শ্রেণীর (ক্যাপিটালিস্ট ক্লাস) অধস্তন সহযোগী হয়ে গড়ে ওঠে।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী কোন উদ্দেশ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন? রাজ্জাকের স্পষ্ট মন্তব্য: বিদেশী প্রতিযোগীদের তাড়িয়ে নিজেদের মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে তারা জাতীয়তাবাদী তত্পরতায় শরিক হয় (অধ্যায়: ৪)। পরবর্তীকালে প্রভু ও প্রজার মধ্যে মধ্যস্থতার (intermedieries) প্রয়োজনে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। আর ভারতীয়দের এ কাজে শরিক হওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়। নিখিল ভারতবর্ষে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদর থেকে বিদ্বৎসমাজ গড়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা লড়ে গেছেন—এই প্রচলিত মতের সত্যতা নিয়ে রাজ্জাক প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, ১৮৮০-এর দশক পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীদের আমলাতন্ত্র ‘বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে শক্তিশালী খুঁটি’ বলে মনে করতেন।

আব্দুর রাজ্জাকের মতে, সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরোধী দল হিসেবে বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ‘তারা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বৈষয়িক উন্নতি গ্রহণ করেছেন। সুতরাং বুদ্ধিজীবী সমাজ ও সাম্রাজ্যবাদীদের মিত্ররা ভিন্ন গোষ্ঠী নয়। তার মতে, ‘অন্য যেকোনো গোষ্ঠীর চেয়ে বুদ্ধিজীবীরাই শাসন পদ্ধতির স্পর্শকাতর দিকগুলো সম্বন্ধে শাসকদের সজাগ করে তোলে।’ ১৯২০-এর দশকে অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। কর ও খাজনা বৃদ্ধির প্রতিবাদে অসহযোগ আন্দোলনের ফলে পুরো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।’ রাজ্জাকের মতে, ‘শিক্ষিত শ্রেণীর নেতৃত্বে পরিচালিত তত্পরতা তাদের নিজেদের মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না (অধ্যায়: ৪)।’

ব্রিটিশ শাসকের ভারতীয় সহযোগীদের অবস্থা উন্নততর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তার মতে, শাসকের বন্ধু ও শত্রু একই ভ্রূণ থেকে জন্মলাভ করেছে। সুতরাং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কর্তাব্যক্তি ও শাসকের মিত্রগোষ্ঠী ভিন্ন চরিত্রের নয়।

উনিশ শতকের শুরুতে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি ভারতের মানুষ একক সমাজের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করতেন। হয় এটি একচেটিয়াভাবে হিন্দু সমাজ অথবা মুসলমান সমাজ। এই যে একই মাটির জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও দুটো সমাজে বিভক্ত হয়ে যাওয়া—এটাই পরবর্তীকালের সমস্যাগুলোর মূল কারণ। এ পর্যালোচনা অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের গবেষণার প্রধানতম যুক্তি। এর ওপর ভর করে তিনি পুরো গবেষণা দাঁড় করিয়েছেন। এই নয় যে এর ভিত্তিতে তিনি সব বিষয়ে সহজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ক্ষমতাচর্চা, রাজনৈতিক তত্পরতা, আমলাতন্ত্রের ভারতীয়করণ, দেশভাগের কারণ—একটি প্রক্রিয়া সামনে রেখে পর্যালোচনা হাজির করেছেন।

অধ্যাপক রাজ্জাকের আলোচনার আরেকটি বহুল বিশ্লেষিত বর্গ আমলাতন্ত্র। তার মতে, পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রভাব বিস্তারের জায়গা আমলাতন্ত্র। সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের মধ্য দিয়ে নিখিল ভারতবর্ষে ক্ষমতাচর্চা হয়েছে। উচ্চ মজুরির পরিবর্তে অল্প মজুরিতে শ্রম কেনার উদ্দেশ্যে অসংখ্য ভারতীয়কে নিয়োগ দেয়া হয় (অধ্যায়: ০২)। অদাপ্তরিক ইউরোপীয় ব্যক্তিদের প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। এক. ভারতের অর্থনৈতিকভাবে দ্রুতগতিতে চাগিয়ে ওঠা। দুই. পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের সামাজিক পাটাতন তৈরিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটানো (অধ্যায়: ০৩)। ভারতের ভৌগোলিক কারণে নীতিনির্ধারণ এককেন্দ্রিক ছিল না। একই সিদ্ধান্ত সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করাও অসম্ভব ছিল। এসব কারণে ক্ষমতা এক জায়গায় কুক্ষিগত করা সম্ভব হয়নি। ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে তিনি খুব বড় করে দেখেননি। তবে এর অস্তিত্ব দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের টের পাওয়া যায়, সেটি উল্লেখ করেন। তার মতে, গণমাধ্যম সমাজ পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচ্য, ফ্যাক্টর বা পরিবর্তনের নির্ধারক নয়।

শহরের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের যোগদানের মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে পরিবর্তন দেখা দেয়। শহরের শ্রমিকরাই পরিবর্তনের মূল নায়ক। তাদের সক্রিয় ভূমিকার কারণে ‘রাজনীতি আর ড্রইংরুমের কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। বিপুলসংখ্যক মানুষের তর্কের বিষয় হয়ে হাজির হলো’ (অধ্যায়: ০৪)। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পুরো সময় শ্রমিক শ্রেণী বিভিন্ন দ্বন্দ্ব্ব ও সংঘাতে লিপ্ত ছিল। এ সময় তারা রাজনৈতিক আন্দোলনে হরতাল ও বয়কট কর্মসূচি জোরদারকরণে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।

অধ্যাপক রাজ্জাকের মতে, নিখিল ভারতবর্ষে রাজনৈতিক তত্পরতা (পলিটিক্যাল মুভমেন্ট) রাজনৈতিক দল (পলিটিক্যাল পার্টিজ) হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান দরকার। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত ভারতের সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল না। একমাত্র দেশভাগের পর ভারতবর্ষ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যাত্রা করে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি থাকা জরুরি। অন্যদিকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্যও তার মানসিকতা থাকতে হবে। রাজনীতিতে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আনুগত্য ‘উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ও স্থায়ী’ হওয়া ঠিক নয়। গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আনুগত্য ও স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার মনোভাব থেকে স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠের জন্ম দেয় (অধ্যায়: ০১)।

অধ্যাপক রাজ্জাকের মতে, রাজনীতিতে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের পারস্পরিক কোনো ছাড় না দিয়ে আপসহীন শত্রুতার পরিণতি হিসেবে ভারত দুই টুকরো হলো। এক্ষেত্রে তিনি বি. পট্টভি সিতারামায়ার কংগ্রেসের অফিশিয়াল ইতিহাসখ্যাত ‘দ্য হিস্টরি অব দ্য কংগ্রেস (১৮৮৫-১৯৩৫)’ বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ভারত দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পেছনে কংগ্রেস সক্রিয় ছিল বলে উল্লেখ করেন। চল্লিশের দশকে গান্ধীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বর্তমানের ধর্মীয় উন্মাদনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের সুবিধামতো রাজ্জাকের বিশ্লেষণ ব্যবহূত হলে তার ও ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হবে। তাছাড়া আজকের দিনে বইটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে পুনরায় সাম্প্রদায়িক চিন্তা ও রাজনীতির মারাত্মক দিকগুলো পাঠকের সামনে হাজির হলো। সুতরাং উনিশ শতকের ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স হাজিরের ক্ষেত্রে বইটি একটি যুগান্তকারী গবেষণা।

 

ইফতেখারুল ইসলাম: নির্বাহী, গবেষণা ও প্রশাসন বিভাগ

জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন