শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হবে। তা নিয়ে আলোচনা করবে। ব্যবহারিক ক্লাসের মাধ্যমে রপ্ত করবে চারপাশের নিত্যনতুন অভিজ্ঞান। সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে প্রতিদিন একটু একটু করে সমৃদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তৈরি হবে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য। কিন্তু দেশের চলমান পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের শিখন-পঠন প্রক্রিয়াকে করে তুলছে প্রতিবন্ধক ও একঘেয়েমিপূর্ণ। শ্রেণীকক্ষের চলমান পাঠদান পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট নয় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) প্রকাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তাই শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পাঠদানের জন্য সৃজনশীল পদ্ধতির পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

স্বাধীনতার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার ঘটলেও তা ঠিক কতটা পরিকল্পিত উপায়ে হয়েছে, এটি নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় সংকট খানিকটা প্রকটই। গত পাঁচ দশকে দেশে কয়েক হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার অধিকাংশই বেসরকারি। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানেই মানসম্মত শিক্ষাদান নিশ্চিত করা যায়নি। উল্লেখযোগ্য সরকারি নজরদারির অভাবের বিষয়ও। তাছাড়া শিক্ষক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত।

ফিনল্যান্ডে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও চাহিদা অনুসারে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের পাঠ্যক্রম সংশোধন ও পরিমার্জন করতে পারে। দেশটির জাতীয় শিক্ষা সংস্থা স্কুল ও শিক্ষকদের জন্য স্ব-মূল্যায়ন পদ্ধতিকেও উৎসাহিত করে। এভাবে শিক্ষক যেমন তার সীমাবদ্ধতাগুলো ধরতে পারেন, স্কুলগুলোও তাদের দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং তা কাটিয়ে ওঠার জন্য জাতীয় শিক্ষা সংস্থার সহযোগিতা পায়। শিক্ষা সংস্থার সহায়তার মধ্যে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। ফিনল্যান্ড শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যায়ন পরীক্ষায় বসানোর বিষয়কে সমর্থন দেয় না, তবে শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে তা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষা নেয়া হয়। এভাবে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে আসে তখন তাদের সামনে দুটি সুযোগ দেয়া হয়—এক. সাধারণ শিক্ষা এবং দুই. কারিগরি শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো অধ্যয়ন সময়সূচি বা পাঠ পরীক্ষার সময় বেছে নিতে পারে। কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা মূলত চাকরিকেন্দ্রিক। যেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষানবিশ হিসেবে প্রশিক্ষিত করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব যোগ্যতাভিত্তিক দক্ষতার উন্নয়ন করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষাকে ভিত্তি বলা হলেও মাধ্যমিক হলো শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এখানে দুর্বলতা থেকে গেলে গোটা ব্যবস্থার ভিতই নড়বড়ে থেকে যায়। মানসম্মত পরিকল্পনার অভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে মাধ্যমিকের প্রতিষ্ঠান। নানা ক্যাটাগরিতে বিভক্ত বিদ্যালয়গুলোয় সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। যেসব অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, পরিকল্পনার অভাবে তার ফলও নিশ্চিত হচ্ছে না। দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০ হাজারের বেশি হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫০-এর কিছু বেশি। বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগের মতোই মুখস্থনির্ভর পাঠদান চলছে। শিক্ষাক্রম বিষয়েই অনেক শিক্ষকের স্বচ্ছ ধারণা নেই। কোন প্রক্রিয়ায় পাঠদান দিতে হবে, কতক্ষণ পড়াতে হবে, শিক্ষকদের এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা ও প্রশিক্ষণ না থাকায় শ্রেণীকক্ষের পাঠদান ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বরং শিক্ষকদের ওপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিশ্চিত করার একটি বড় চাপ থাকে। তাছাড়া প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং অ্যাবিলিটির জন্য আলাদা কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতিও নেই।

বিশ্ববাজারে শ্রমের চাহিদা নিত্যদিন বদলাচ্ছে। বলা হচ্ছে কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ তার জনসম্পদকে পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারেনি। বাজারের চাহিদা অনুসারে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ নেই আমাদের। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, বাজারে দক্ষ মানুষের চাহিদা বাড়ছে। শ্রম চাহিদার বদলগুলো শিক্ষার মধ্যে আসা জরুরি। সে বদলটা করতে হবে গোড়ার গলদ শোধরানোর মাধ্যমে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত আমরা যদি শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারি তাহলে একজন শিক্ষার্থীকে অযথা বই ও বিষয়বস্তুর বোঝা কাঁধে নিয়ে যেমন ভুগতে হবে না, তেমনি তার সামনে ভবিষ্যতের পথও মসৃণ মনে হবে।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পাবলিক পরীক্ষাভিত্তিক। এখানে শেখার চেয়ে পরীক্ষায় পাসই মুখ্য। পাবলিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন মাথায় রেখেই স্কুলে পড়াশোনা হয়, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বোঝা ক্রমে বাড়িয়ে তুলছে। মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সরকার শিক্ষকদের দেশে, এমনকি বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত যথাযথভাবে ক্রিয়াশীল না থাকায় শিক্ষার সামগ্রিক মানের ওপর তার প্রভাব সামান্যই রয়ে গেছে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যেমন দক্ষ করতে হবে, তেমনি সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়ে আসা জরুরি। দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও শিক্ষকতাকে উপভোগ করেন, এমন শিক্ষক ছাড়া চলমান পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তন আনা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব শর্ত যুগপত্ভাবে ক্রিয়াশীল করার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন জরুরি।